Showing posts with label Kobita Abritti. Show all posts
Showing posts with label Kobita Abritti. Show all posts

দ্বার খুলে আর রাখবো না নজরুলগীতি – কাজী নজরুল ইসলাম


দ্বার খুলে আর রাখবো না
কাজী নজরুল ইসলাম


আমি দ্বার খুলে আর রাখবো না, পালিয়ে যাবে গো
জানবে সবে গো, নাম ধরে আর ডাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

এবার পূজার প্রদীপ হয়ে, জ্বলবে আমার দেবালয়ে
জ্বালিয়ে যাবে গো, আর আঁচল দিয়ে ঢাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

হার মেনেছি গো, হার দিয়ে আর বাঁধবো না
দান এনেছি গো, প্রান চেয়ে আর কাঁদবো না
হার মেনেছি গো।
পাষাণ তোমায় বন্দী করে, রাখবো আমার ঠাকুরঘরে
রইবো কাছে গো, আর অন্তরালে থাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।


রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো – ইমু ইমরান কায়েস


রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো!
ইমু ইমরান কায়েস


বনশ্রী যাবেন?
বনশ্রী তো চিনিনা চিনায়া নিয়েন,
নতুন জায়গা না গেলে আর চিনমু ক্যামনে।
খাঁটি কথা।
টিএসসির মোড় থেকে যখন রিকশা ঠিক করি
তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ঢাকা শহর, বাড়ি ফেরার তাড়া,
তাই অচিন রিকশাওয়ানাই সই।
প্রত্যেক মোড়ে ডান-বান বলতে বলতে চলার পথের অবিন্যস্ত আলসেমি,
অহেতুক সব চিন্তা-ভাবনার বিলাসিতা কেটে যাবে, যাক।
রাতের ঢাকা এখন আর খুব নিরাপদ না
চার দেয়ালে ফেরা দরকার, ঘরে ফেরা দরকার।
শাহজানপুর এসে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি কি না। বললাম, পড়ি না।
ডাক্তারি করি, রিকশাওয়ালার ফের বিনীত জিজ্ঞাসা
দেশেই থাকবেন, না বিদেশ চইলা যাবেন?
বললাম, দেশেই থাকবো, অর্ধেক জীবন শেষ,
নতুন করে আর কই যাবো।
দেশের অবস্থা তো ভালো না,
মানুষজন ভালো না, শিক্ষা নাই, সচেতনতা নাই,
থাইকা কি করবেন তার গলায় আক্ষেপ এবার!
আমি এইবার বিস্মিত হলাম,
রিকশাওয়ালার গলায় এই ধরনের সূক্ষ রুচিশীল হাহাকার তো থাকার কথা নয়,
সামথিং ইজ নট রাইট।
সত্যিকার অর্থেই নড়েচড়ে বসলাম।
আলো অন্ধকারে কেবল ঘামে ভেলা পিঠটুকু দেখা যাচ্ছে তার। ওঠার সময় চেহারা খেয়ালই করিনি।
সত্তা শার্টে লেপ্টে থাকা পিঠ থেকে কোন অ্যাবনর্মাল কিছু উদ্ধার করা গেল না।
এই দেশের মেইন সমস্যা কী ভাই জানেন?
সমস্যা তো অনেক।
ঘুষ, দুই নম্বরি, বিচার না হওয়া, প্রভাবশালীদের যা ইচ্ছা তাই করা, ধর্ম ইউজ করে হাবিজাবি কাজ করা, একে তাকে রাজাকার, একে তাকে নাস্তিক বানানো, বাজে রাজনীতি, তার মতে কোনটা কে জানে।
তাই জবাব না দিয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম, কী?
এবার ভদ্রলোকের উত্তর শুনে ভিমড়ি খেলাম-
"মেইন সমস্যা হচ্ছে কেউ বই পড়ে না।"
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি পড়েন?"
অত না, টুকটাক।
আমি আবার কবিতার বই একটু বেশি পড়ি।
বলেন কী।
বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হয় আমার।
কার কবিতার বই পড়েন?
ভদ্রলোক প্রবল মমতায় জানান,
তার পছন্দের কবি শক্তি চট্টোপধ্যায় আর ফরাসী কবি আর্তুর ব্যাবো।
খিলগাঁওয়ের গলিতে আকাশ ফুড়ে হঠাৎ একটা পাহাড় সম উঁচু জ্বিন এসে যদি পথ রোধ করে দাঁড়াতো তবু এতো চমকাতাম না। আর্তুর র‍্যাবো, শক্তি।
কি বিস্ময়! কি বিস্ময়।
ভজলোকের নাম শ্রিপান্থ শফিক।
আপনার অনুমান ঠিক আছে, শ্রিপাছ টুক বানানো।
বরিশালের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা একটা মানুষকে ওইটুকু মেলোড্রামা করতে দেয়াই যায়।
ছাত্র খারাপ ছিলেন না।
এসএসসি পরীক্ষার পর কবিতার 'ভূতে ধরলো।
আরজ আলী মাতুব্বর, সক্রেটস, স্টিফেন হকিং, শক্তি, র‍্যাবো, গিয়ম এপোলোনিয়ার, হুমায়ুন আজাদ পড়ার পর তার মনে হল 
জীবন এক আশ্চর্য গিফট।
স্কুল কলেজে পড়ে সেইটা নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
তাই আর পড়েননি! কবিতা লেখেন নিয়মিত, দুইটা বইও বেরিয়েছে।
যে জীবন তিনি যাপন করেন, তার মতে এটা প্রথা বিরোধী জীবন। একটা সেন্স অফ ফ্রিডম তো আছে!
খারাপ কী?
বাসার কাছাকাছি এসে ভদ্রলোকের সাথে কফি খেলাম এক কাপ।
কফি খেতে খেতে মনে হল, আহা জীবন!
কেউ কি ভীষণ দুঃসাহস নিয়ে জন্মায়!
আর কেউ কি করুণভাবে মাথা নত করে মেনে নেয় জাগতিক সমস্ত হিসাব।
ভদ্রলোকের প্রতি বুক ভর্তি হিংসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম!


হঠাৎ দেখা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


হঠাৎ দেখা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার।।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে,
আলাপ করলেম শুরু --
কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার ইত্যাদি।
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
কোনোটা বা দিলেই না।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় --
কেন এ-সব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।
আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
মনে হল কম সাহস নয়;
বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,
"কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য করে বলবে তো?
আমি বললেম, "বলব।"
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
"আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।"
একটুকু রইলেম চুপ করে;
তারপর বললেম,
"রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।"
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
ও বললে, "থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।"
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;
আমি চললেম একা।

শান্তিনিকেতন, ২৪ জুন, ১৯৩৬


প্রিয় মুনা, বাকের ভাই চিঠি – ইমরুল কায়েস


প্রিয় মুনা, বাকের ভাই
ইমরুল কায়েস

প্রিয় মুনা,

কেমন আছ? আমিও ভালো আছি ইহকালে নামাজ- রোজা তেমন রাখি নাই। রমজান মাসেও লুকায়া লুকায়া চা-বিড়ি খাইছি। সুযোগ পাইলেই এরে ওরে হাল্কা মালিশ কইরা দিছি। কিন্তু আমি মরার পর তুমি নাকি দুই হাত তুইলা মরা কান্না কান্দো? যদিও এক্সেস ক্রাইং ভেরি ব্যাডা কিন্তু তোমার দোয়া বড় সাংঘাতিক। ইহকালে টর্চার কইরা আসলেও পরকালে কেউ আমারে টর্চার করতেছেনা। তুমি এতো কান্দো ক্যান মুনা? এবার একটা বিয়া করো, সংসার করো। তোমারে কইছিলাম না মাইরে ভাইটামিন আছে? মাইরে কোনো ভাইটামিন নাই মুনা। ভাইটামিন আছে প্রেমে, সংসারে।

ফাঁসি নিয়া আমার তেমন কোনো দুঃখ নাই। অন্য কাওরে খুন না করলেও, তোমার মন রে আমি খুন করছি। মাইন্ড মার্ডার বিগ মার্ডার। আগে বুঝিনাই মুনা। তোমারে স্নেহ কইরা একটা আবদার করি। এই দুনিয়া বড় উত্তম জায়গা। বাকেরের চিন্তা করার মত ফালতু কাজ এইখানে মানায় না। যহন ছিলাম তখন ছিলাম। এহন তো নাই!! না থাকা জিনিস আর কতদিন সাজায়া রাখবা মুনা? তুইলা যাওয়ার ফার্স্ট স্টেপ হইল পারডন করা, মেয়ে লোক সব পারে, কিন্তু সহজে পারডন করতে পারেনা। আমারে তুমি পারডন কইরো মুনা। 

'হাওয়া মে উড়তা যায়ে' গানটা গাইয়া, একটা লাল দোপাট্টার মতন আমারে তুমি উড়ায়া দিও মুনা।


আমি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলছি কবিতা – ফুয়াদ স্বনম


আমি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলছি
ফুয়াদ স্বনম

আমার বেশ মনে আছে, 
বাবা খুব ভোরে বেড়ুতেন আর ফিরতেন 
সবার ঘুমাবার পর। 

না প্রতিদিনই নয়, 
এই ধরুন, মাসের দশ থেকে
একুশ-বাইশ তারিখ পর্যন্ত।

বাড়িওয়ালার সামনে পড়াটা এড়াতেই 
এই ভোর পাঁচটা থেকে
বারোটা পযর্ন্ত অফিস।

বাবা বেশ রাগী ছিলেন,
আমরা বাবাকে ভয়ে কিছু প্রশ্ন করতে 
পারতাম না। পারলে, নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতাম,

"বাবা, তুমি রোজ অফিসের আগে, ছুটির পরে
সংসদ ভবনের পামট্রিগুলোর নীচে অন্ধকার
স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তায় বসে মাথা হেঁট করে কি ভাবো?

কে তোমায় সকালের নাস্তা বানিয়ে দেয়? 
লাঞ্চ করো কি কখনো?"

বাড়ি ভাড়া দেবার তারিখ উত্তীর্ণ হলেই, 
আমরা দু'ভাই গিয়ে দাঁড়াতাম
বাড়িওয়ালার সামনে করুণ মুখ করে, 
উনি গলে যেতেন।

এই হঠাৎ করুণ মুখ করার ব্যাপারটা
আমরা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছিলাম। 

মোটরবাইক পাশ কেটে বের হলেই
আমি হা করে চেয়ে থাকতাম।

একদিন বাবা বলেছিলেন,
"শুনো আব্বা, নিম্ন মধ্যবিত্তদের স্বপ্ন দেখবারও একটা 
লিমিট থাকে রে বোকা।"

জবাবে বাবা কে সেদিন চমকে দিয়ে বলেছিলাম,
"বাবা, জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলির অপূরণের
আক্ষেপ থেকে জন্ম নেয়া সুপ্ত বাসনাগুলি

যদি হঠাৎই ঘুম ভেঙে লাফ দিয়ে জেগে উঠে
হাত ধরাধরি করে হাঁটতে চায়?
সেও কি নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে অন্যায়ের সামিল হবে? 
নাকি সে বিত্তশালী হয়ে উঠবার ধৃষ্টতা?"

বলেই ভাবলাম, কি যে সব ভুলভাল
বকে ফেললাম বাবার সামনে? 
বেশী বলে ফেললাম না তো?

আমি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, 
শিক্ষা, সততা আর আদর্শই যাদের একমাত্র সম্বল, 
তাদের অন্তত বাবার মুখের ওপর
এমন বাগ্মিতা মানায় না।

গলির মুখে তিন রাস্তার মোড়ে
কার্তিক বাবুর মুদির দোকান।
তোমাকে ভয়ে কোনদিন বলিনি বাবা,

ভীষণ হাস্যোজ্জ্বল লোকটির মুখ, আষাঢ়ের
আকাশের মতো গোমড়া হয়ে যেতো
আমাদের বাকির স্লিপ ধরা হাতগুলো দেখলেই। 
একটা লজেন্সও কোনদিনও চাইতে পারিনি
বাকির খাতার কারণে।

বাকিতে মৌলিক চাহিদা মেটাতে মেটাতে 
শৈশব যে কোথায় ছুটে পালিয়েছিল, 
তা টের পেতে পেতে,
তখন আমিও আরেক বাবা হয়ে উঠছি।

চাল-ময়দার ঠোঙাগুলোকে কেটে
সেলাই করে খাতা বানাতাম, 
বছর শেষে আবার তাদের বিক্রি করে 
নতুন ক্লাসের সেকেন্ডহ্যান্ড বই কেনা।
নতুন বই কেনার কথা তো
কস্মিনকালেও ভাবতে পারিনি।

আমিষবিহীন পেঁপে ভাজি, আলুর ঝোল, 
বেগুন ভর্তা খেয়ে খেয়ে কতো 
দিন-রাত পার করেছি,
অন্য কিছুর চড়া আঁচে আমাদের 
বাজারের ব্যাগ জ্বলে যেত সেসময়।
অন্য কিছুর সামর্থ্য ছিলো না বলে।
ঈদে পরবে কদাচিৎ জুটেছে ফার্মের মুরগী।

আমাদের পিঠাপিঠি দু-ভাইয়ের জন্য 
একটিই শখের জিন্সপ্যান্ট কিনতে পেরেছিলাম 
তিনশত টাকা খরচা করে। 
তাও, একমাসের একটি টিউশুনির বেতন দিয়ে। 
মা সেটা আলমারিতে তুলে তুলে রাখতেন। 
যদি কোথাও দাওয়াত পড়ত, 
আমরা ভাগ করে নিতাম কে গায়ে হলুদে
যাবে সেটা পরে, আর বরযাত্রী কে হবে? 
এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিলো না যে, 
আমরা দু'ভাই একসাথে গিয়েছি।
উপহার কেনার সামর্থ্য কোনদিনই আমাদের ছিলো না।
তাই, আমরা শুধু বরযাত্রী বা গায়ে হলুদেই যেতাম।

আমি একজন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
যাদের, কোনো চাহিদা থাকতে নেই।
আমাদের মা তবু খুব সুখী ছিলেন, 
কারণ ক্ষুধা লাগলেও, আমরা ভাতের মাড়
লবণ ছিটিয়ে খেতে পারতাম।
তখনও, মাছের কাঁটা বেছে খেতে শিখিনি। 
মা-ও সেকথা জানতেন,
দুষতেন দারিদ্রতাকে। 
আমি দিব্যি পটলের তরকারি দিয়ে
আয়েশ করে খেয়ে ওঠার ভান করাটা
শিখে নিয়েছিলাম।
স্কুলের টিফিনের জন্য
জেদ করেছি কিনা 
ঢের সন্দেহ আছে!
স্কুলের মাইনে দেবার সাত তারিখ পার হলেই 
ঝন্টু স্যার দাঁড় করিয়ে রাখতেন 
এক পিরিয়ড প্রতিদিন, 
জানলে বাবা যদি কষ্ট পায়! 
তাই বলা হয়নি সেকথা কোনদিনই। 
প্রায়ই হাঁটু ছিলে দগদগে ক্ষত নিয়ে
ফিরতাম ফুটবল খেলে।
গভীর রাতে আমরা ঘুমিয়ে পড়লে, বাবা এসে
কেরোসিন লাগিয়ে দিতেন আন্টিসেপটিক হিসেবে। 
ঝরঝর করে পানি পড়তো
তখন তার চোখ বেয়ে। 
কেন বাবা! কেন ফেলতে? 
আমার হাঁটুর ক্ষত, এই যে রক্তাক্ত চামড়া ছেঁড়া,
কেন যে তার চোখের পুকুরটাকে
আন্দোলিত করে যেত, সে সময় বুঝতে পারিনি।

অন্যদের দেয়া সেকেন্ড হ্যান্ড জামাতেই
নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখেছিলাম। 
তবে, আমাদের মাঝে ছিলো
পদ্ম পুকুরের মতো ভীষণ লজ্জা। 
কলেজে, ক্যাম্পাসে বা আত্মীয় স্বজনদের কাছে
আমাদের অবস্থান ছিলো সুদৃঢ় ও মর্যদা সম্পন্ন। 
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিলো না
আমাদের ভেতরের দৈন্যদশা।
কারণ, শিশুবেলা থেকেই
আমাদের দুটো শিক্ষা দেয়া হয়-
এক, আমরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। 
আর দুই, আমরা সম্ভ্রান্ত পরিবারকে ধারণ করি।
আমাদের বুক, পেট, তল পেট, উদর,
বৃহদান্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র সব ক্ষুধার তাড়নায়
ফেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও, 
আমাদের মুখে সবসময়
চাঁদের হাসি লেপ্টে থাকবে।
আমাদের মুখে সবসময়ই
চাঁদের হাসি লেপ্টে থাকতো।। 


বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – দর্পণ কবীর


বসন্ত নয় অবহেলা
দর্পণ কবীর


বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিলো অবহেলা
ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত!
দরজা খুলে দেখি আমাকে ভালোবেসে এসেছে অবহেলা
মধ্য দুপুরের তির্যক রোদের মতো
অনেকটা নির্লজ্জভাবে আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা
আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম
আমার দীনদশায় কারো করুণা বা আর্তিব পেখম ছড়িয়ে আছে কি না
ছিলো না
বৃষ্টিহীন জনপদে খড়খড়ে রোদ যেমন দস্যুর মতো অদমনীয়
তেমনি অবহেলাও আমাকে আগলে রেখেছিলো নির্মোহ নিঃসংকোচিত

আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভোঁ-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম
তখন দেখি আমার সামনে কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা
উপেক্ষার সঙ্গেও একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের কোলাহল মুখর আনন্দ সভায়
কি মিলেছিলো?
ঠোঁট উল্টানো ভৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো এক তাল অবজ্ঞা
তাও সয়ে গিয়েছিলো একটা সময়
ধরেই নিয়েছিলাম আমার কোনো কালেই হবে না রাবেন্দ্রিক প্রেম
তোমাদের জয়গানে করতালিতে নতজানু থেকে
ছিলো আমার চাপা আক্ষেপ লজ্জা
বুঝে গিয়েছিলাম জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে ছোঁবে না
জয়নুলের রঙ নিয়ে কল্পনার বেসাতি
হারানো দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা
বা ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হলো, এ নিয়ে কৌতূহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনো

এত কিছু নেই জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবো, সেই অমিত শক্তিও আমার ছিলো না
মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে আমার কিছুই ছিলো না
শুধু ছিলো অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা

হ্যাঁ, একবার তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা চোখে 
তাকিয়েছিলে আমার দিকে
তাচ্ছিল্য নয়, একটু মায়াই যেন ছিলো
হতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত ছিলো তোমার দৃষ্টিতে
ওইটুকুই আমার যা পাওয়া
আমি ঝড়ে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে
উপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়ে
ও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমি
এ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী

অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম
এই অবহেলা তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষা কাচের দেওয়াল, অবজ্ঞা কুচকুচে অন্ধকার
এর কিছুই থাকবে না একটি বসন্তের ফুঁৎকারে
একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে নেবো
এমন ভাবাবেগও ছিলো আকাশের কার্নিশে লেপ্টে থাকা পেঁজা মেঘের মতো
ঐ মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে নামেনি
তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনো থামেনি

অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি অনেক কিছু বদলে গেছে সেকি!
কোথায় হারালো কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন করা অবহেলা
স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে ফেলা উপেক্ষা
আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার অবজ্ঞা
ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক, তবে এখনো পোড় খাওয়া দিন বড্ড রঙিন

আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন অশ্রুকণা
আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে ঝড়ে পড়ছে নক্ষত্র
এমনকি তুমি যে সম্রাজ্ঞীর বেশের আড়ালের মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছো লাবণ্যময় পাষাণ, পাথর
এটাও দেখতে পাই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে

আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেতো কবিতার রূপ
সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরুপ।


ইতি অপু কবিতা – পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু কবিতা
পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু, কোনো সাধারণ কবিতা নয়। এই চিঠি কবিতা বা পত্র কবিতাটি পাঠক সমাজে সাড়া জাগানো একটি জনপ্রিয় কবিতা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী অপূর্ব সৃষ্টি অপুর মর্ম বেদনার ছবি, পৃথ্বীরাজ চৌধুরী তাঁর সুনিপুণ কলমের ছোঁয়ায় আমাদের উপহার দিয়েছেন।

পুলু, কেমন আছিস, ভালো?
বড় তারাতারি নিভে যাচ্ছে এই কলমের আলো।
মাঘ কুয়াশার চেয়েও ঝাপসা হচ্ছে অক্ষর,
কোথা দিয়ে কেটে গেলোরে এতগুলো বছর?
যেন রেলের চাকায় বেঁধেছিলো কেউ দিনঘড়িটার কাটা,
অনেক কষ্টে জোগার করেছি তোর ঠিকানাটা!
এই দেখ! পরিচয়টাই দেয়া হয়নি কথায় কথায়!
চিনতে পারছিস? রোল ফরটি-সিক্স, অপূর্ব কুমার রায়।
তোর সাথে শেষ দেখা, নাগপুর কোলীয়ারী।
তারপর জানিস? খুলনা গিয়েছিলাম অপর্ণাদের বাড়ি।
খুলনাতো এখন বাংলাদেশ।ওখানে কে থাকে,
আমি ছাড়া তোকে এখনো কেউ পুলু বলে ডাকে?
কাজল এখন বিয়ে করেছে, চাকরি করছে কোলকাতায়।
সেসব যাক, এবার আসি যেজন্য চিঠি সেই কথায়।
জানিনা, কোত্থেকে শুরু করব, ঠিক কোন দুঃখ ভোগ?
তোর সাথে প্রায় ত্রিশ বছর পরেতো যোগাযোগ!
তুই বলবি আমার দোষ, রাখিসনি কেন যোগাযোগ?
যোগ আর যোগ রাখব কোথায়, আয়ূষ্কালে শুধুই বিয়োগ!
ছ’য়ে দিদি, দ’শে বাবা, সতেরতে গেলেন মা!
আর বাইশ বছর ফাগুন মাস, যেদিন গেলো অপর্ণা!
আর শুধু ওরাই নাকি? কয়লার ট্রেন, দুঃখ পুকুর,
গরুর গাড়িটাও ছেড়ে দিয়েছে কাঁশফুলে ঢাকা নিশ্চিন্তপুর!
বাবার উপর টান বলতে, খুব রোগা আর পলকা দড়ি।
রোগা দড়ি হেটে নামতো কাঁশিঘাটের চৌষট্টি সিঁড়ি।
বাবার আর লেখা হলোনা গ্রাম জাগানো মহৎ পালা!
দীর্ঘশ্বাসে চাপা সংলাপ, শুধু শুনতে পেলো গণেশ মহোলা।
এখন মাঝেমাঝে স্বপ্নে আসেন,
হরিহর পালা গিতিকার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন,
“ঐ যায় শবযাত্রা আমার!
হরিধ্বণি দাও হে সবে, দুহাতে ওড়াও বিণ্ণী খৈ,
বাঁশের মাচায় শুয়ে চলেছেন, না লিখতে পারা আমার বই।”
ফিরে এলাম দেশের বাড়ি, ঘুরলো আবার রেলের চাকা।
সম্বল বলতে গলার পৈতে, মা-র জমানো ছত্রিশ টাকা।
পল্লীবাড়ি একি আছে, ধোয়াটে মাঠ, কাঁশের বন।
নতুন একটা শব্দ শিখলাম, স্যারের কাছে, “এম্বিশন।”
লিভিংস্টোন পড়ছি যখন কবে যাবো আফ্রিকায়?
দেবতাকে অভুক্ত রেখে, এই পূরুতের ছেলে জলপানি পায়!
মাকে ছেড়ে, পল্লী ছেড়ে, পূরুতের ছেলে দূর পালালো,
দুর বলতে কোলকাতা, তেতলা বাড়ি, ইলেক্ট্রিক আলো।
অখিল বাবুর রোয়্যাল প্রেসে সারারাত জেগে কাজ করতাম।
নতুন বইএর মোলাট দেখলেই ইচ্ছে হত, লেখি বাবার নাম।
একদিন একটা চিঠি এলো, মায়ের নাম লেখা তাতে,
মা লিখছেন ভাঙ্গা ছন্দে, মা লিখছেন কবিতাতে।
“অপু, আমার মাথার উপর উড়ছে জানিস, রাতের আকাশ।
কদিন পরেই গণেশ পূজো, তোরা কলেজে ছুটি কি পাশ?
চারা গাছটা পুতে গেছিলি, কদিন হলো দেইনি জল,
গণেশ পুজোয় না এলেও তুই অঘ্র্যাণ মাসে আসবি বল?
কদিন ধরেই জ্বরটা আসছে, বলা হয়নি কথায় কথায়,
তোর তেতলা জানালা থেকে গ্রামের রাতটা দেখা যায়!
অপু, আমার মাথার উপর আকাশ ভাঙছে, উহ্! কি কালো!
পাঠাবিরে জোঁনাকি ঘুম, পাঠাবিরে ইলেক্ট্রিক আলো?”
সেই থেকে-তো শ্বশানের কাঠ, গারহস্তে আমার হলো অক্ষয়।
যারা চলে যায়, কে বল্লো শুধু তাদেরি শব দাহ হয়?
প্রথমে প্রথমে পুড়ে যেতাম, নতুন বিয়োগ চড়া আঁচে!
দেখ, সন্তাপ কথাটাতেও তাপ কথাটা লুকিয়ে আছে!
একদিন তখন হবিষ্যি চলছে, এটো ছিটিয়ে ডাকছি কাক।
হঠাৎ মনে হলো, একি করছি, আমি-না হিমাদ্রী নন্দন মৈণাক!!!
সেই থেকেতো পালানো শুরু, থাকতে দেবে বৃক্ষবন?
তোমার সবুজ পাতার ভিরে রাখবে আমায়, রাখবে গোপন?
গাছ দেখলেই ভয় করেযে, চিতা কাঠ বড্ড ভয়!
শরীর জুরালো হঠাৎ করে, হঠাৎ শরীরে সূর্যোদয়!
মা, অপর্ণা মুছে গেলো এদের মুখের টুকিটাকি।
বলেই ফেল্লো অপর্ণার ছবি, হা করে দেখছো! আমি নতুন নাকি?
পুলু, একটা সত্যি কথা, এবার তবে বলি তোকে,
আমি মরে যাচ্ছি যন্ত্রণাতে, আমি মরে যাচ্ছি বিচ্ছেদ শোকে!
দিদি, বাবা, মা, অপর্ণা এরা না। কার কথা বলছি জানিস?
একটু ভালো করে মনে করে দেখ, তুইও ওদের খুব কাছ থেকে চিনিস।
মনে পরে সেই খুলনা যাওয়া পদ্মা নদী, ছবির সেট?
হঠাৎ তুই ডাকলি আমায়, হাতটা দে-না এডিয়েট।
হে, ঐ গল্পের পাতা, আমার অপ্রকাশিত প্রথম বই।
গল্পের শুরুটা তুইও জানিস, গল্পের শেষটা গেলো কই?!
সেদিন গল্পে ঝিঁঝি ডাকছিলো, মাথার উপর বৃক্ষছাতা।
সূর্যোদয়কে সামনে পেয়ে, উড়িয়েছিলাম গল্পের পাতা।
ওরা কি সব ওখানেই আছে? চালে ডালে পাতা সংসার।
সংসার না বৈরাগ্য? কি জীবণ হয় ছেড়া পাতার?
এসব আমার জানা দরকার। এসব আমার জানা প্রয়োজন।
ব্যার্থ লেখক অপূর্ব রায়ের ওরাই হলো আত্মা স্বজন।
ওরা আমার সাথে বাসে ওঠে, আমার সাথে অফিস করে।
শুধু পেছন ফিরে দেখতে গেলেই, ওরা বৃক্ষ বনে লুকিয়ে পরে!
আর যখন ঘুমিয়ে পরি, ওরা স্বপ্নে আসে অহরহ।
আসলে শুধু ছেড়ে এসেছিতো, কখনো ওদের করিনি দাহ।
এখন আমার মায়ের বয়স, সন্ধে হলেই আসে জ্বর।
বাবা বসে জল শেক দেয়। বলে অপু, লেখাটা শেষ কর।
পশ্চিমের টিকেট কেটেছি ভোর হলেই রওনা হব।
খেলনা, মুখোশ, কলের গাড়ি; ওদের জন্য কি কি নেব?
গল্পটা যদি জিজ্ঞেস করে, এতদিন পর তুমি এদিকে?
আমি তাহলে সেদিনের সেই অবাক করা সূর্য ডেকে,
সব অধিকার ছেড়ে দেব।
লেখক, পিতা সব সবলেখক শর্ত বিনীময়ে ফিরে পাবে ওরা শৈশব।
গোপন বলতে নিজের কাছে একটা নাম রাখবো শুধু, একটা নাম রাখবো শুধু,
পিতা নয় লেখক নয় স্বার্থ নয় শুধু বন্ধু।
চল্লাম পুলু, জানাবো তোকে কি দেখলাম ছেড়া পাতায়।
ভালো থাকিস বইটা ছাপিস।

– ইতি অপু।


আমার কোনো বন্ধু নেই কবিতা – সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই
সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।
সত্যি বলতে আমার কোনো বন্ধু নেই।
বন্ধু বলতে জেনেছি যাদের, তারা কেবল পথ চলতে সঙ্গী ছিলো।
দূরের পথে ট্রেনে যেমন থাকে, পাশের সিটে। গল্প হয়, দু পেয়ালা লেবু চায়ের দাম মেটাতে 'আমি দিচ্ছি, আমি দিচ্ছি' যুদ্ধ হয়। সিগারেটের বাড়িয়ে দেয়া টুকরো ফুঁকে, 'এই যে নিন ফোন নম্বর, এদিকটাতে আবার এলে ফোন করবেন', বলা শেষে অচেনা এক স্টেশনে উধাও হয়।
এই যে আমি পথ হাঁটছি, রোজ ঘাটছি বুকের ভেতর কষ্ট, ক্লেদ,
এই যে আমি ক্লান্ত ভীষণ, বুকের ভেতর জমছে কেবল দুঃখের মেদ,
তবুও আমার নিজের কোনো বৃক্ষ নেই।
প্রবল দহন দিনের শেষে, যার ছায়াতে জিরোবো ভেবে ফিরে আসার ইচ্ছে হয়,
তেমন একটা ছায়ার মতন, আগলে রাখা মায়ার মতন আমার কোনো বন্ধু নেই।

একলা দুপুর উপুড় হলে বিষাদ ঢালা নদীর মতন,
একলা মানুষ ফানুশ হলে, নিরুদ্দেশ এক বোধির মতন,
হাতের মুঠোয় হাত রাখবার একটা কোনো মানুষ নেই।

আমার কোনো বন্ধু নেই।
আমি কেবল কোলাহলে ভিড়ের ভেতর হারিয়ে যাই,
ভুল মানুষে, যত্নে জমা ফুলগুলো সব বাড়িয়ে যাই,
হাওয়ায় ভাসা দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভেবে,
নির্বাসনের একটা জীবন মাড়িয়ে যাই।

আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায় – কাজী নজরুল ইসলাম


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
কাজী নজরুল ইসলাম


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়,
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়।।

ধূলির ধরা বেহেশ্তে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ,
আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।।

দেখ্ আমিনা মায়ের কোলে, দোলে শিশু ইসলাম দোলে,
কচি মুখে শাহাদাতের বাণী সে শোনায়।।

আজকে যত পাপী ও তাপী, সব গুনাহের পেল মাফী,
দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী জুলুম নিল বিদায়।।

নিখিল দরুদ পড়ে লয়ে নাম, সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম,
জীন পরী ফেরেশ্তা সালাম জানায় নবীর পায়।


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায় – কাজী নজরুল ইসলাম


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
কাজী নজরুল ইসলাম


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়,
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।।

তার ভাবে বিভোল রাঙা পায়ের তলে
পর্বত জঙ্গম টলমল টলে,
খোরমা খেজুর বাদাম জাফরানি ফুল ঝ’রে ঝ’রে যায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।।

আসমানে মেঘ চলে ছায়া দিতে,
পাহাড়ের আঁসু গলে ঝরনার পানিতে,
বিজলি চায় মালা হতে,
পূর্ণিমার চাঁদ তার মুকুট হতে চায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ – কাজী নজরুল ইসলাম


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
কাজী নজরুল ইসলাম


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।
দিলাম তোমার চরণ-তলে হৃদয়-জায়নামাজ।।

আমি গুনাহগার বে-খবর,
নামাজ পড়ার ন্ই অবসর।।

(তব) চরণ-ছোঁয়ায় এই পাপীরে কর সরফরাজ।
তোমার ওজুর পানি মোছ আমার পিরান দিয়ে
আমার এ ঘর হোক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে।
যে শয়তানের ফন্দিতে ভাই,
খোদায় ডাকার সময় না পাই।।
সেই শয়তান যাক দূরে,
শুনে তকবীরের আওয়াজ।


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই – কাজী নজরুল ইসলাম


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
কাজী নজরুল ইসলাম


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে,
গোর আজাব থেকে এ গুণাহ্গার পাইবে রেহাই।
কত পরহেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত,
ঐ মস্জিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াৎ,
সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই।
কত দরবেশ ফকির রে ভাই মস্জিদের আঙিনাতে
আল্লার নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে।
আমি তাদের সাথে কেঁদে কেঁদে নাম জপতে চাই
আল্লার নাম জপতে চাই।


নামাজী, তোর নামাজ হলো যে ভুল – কাজী নজরুল ইসলাম


নামাজী, তোর নামাজ হলো রে ভুল
কাজী নজরুল ইসলাম


নামাজী, তোর নামাজ হলো যে ভুল,
মসজিদে তুই রাখলি সিজ্দা, ছাড়ি ইমানের মূল।।

জামাতে সামিল হয়ে নামাজে,
আউড়ালি মুখে সুরা কোরানের,
ভাব্ লি কি তুই পার হয়ে গেলি, পুলসেরাতের পুল।।

আজ মিলন তীর্থে বাঁধ রে কাতার মনের জায়নামাজে,
সেই আরফাতে তোর নুয়ে দে দিল না ফরমানি লাজে।।

ওজু করে শেষে তৌবার নীরে, তহরিম বাঁধ ভীতু নত শিরে,
বন্দেগী তোর হবে রে কবুল, কিয়ামতে পাবি কূল।।


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ – কাজী নজরুল ইসলাম


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
কাজী নজরুল ইসলাম


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ।।

তোর সোনা-দানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ্।
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ্।।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে।
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে।
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।।

ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে র্শিনি তৌহিদের।
তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ।।


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি – কাজী নজরুল ইসলাম


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি
কাজী নজরুল ইসলাম


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি —
আসমানে ফরে ঈদুজ্জোহার চাঁদ উঠছেে মুসলমেনি।।

এলো স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদুজ্জোহার এই সে চাঁদ,
তোরা ভোগরে পাত্র ফলে রে ছুঁড়ে ত্যাগরে তরে হৃদয় বাঁধ।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।
প্রাণরে যা তোর প্রয়িতম আজকে সে সব আন,
খোদারই রাহে আজ তাহাদরে কর রে কোরবান।
কি হবে ঐ বনরে পশু খোদারে দিয়ে,
তোর কাম- ক্রোধাদি মনরে পশু জবেহ কর নিয়ে।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।
বিলিয়ে দেওয়ার খুশরি শরিনি তশ্‌তরিতে আন,
পর রে তোরা সবাই ত্যাগের রঙিন পরিহান।
মোদরে যা কছিু প্রয়ি বিলাব সবে,
নবীর উম্মত তবে সকলে কবে।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম – কাজী নজরুল ইসলাম


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
কাজী নজরুল ইসলাম


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম,
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।
ঐ নাম জপিলেই বুঝতে পারি খোদাই কালাম,
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।

ঐ নামেরই রশি ধ’রে যাই আল্লাহ্ পথে,
ঐ নামেরই ভেলায় চ’ড়ে ভাসি নূরের স্রোতে,
ঐ নামেরই বাতি জ্বেলে’দেখি লোহ আরশ-ধামে
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।

ঐ নামের দামন ধ’রে আছি , আমার কিসের ভয়
ঐ নামের গুণে পাব আমি খোদার পরিচয়,
তাঁর কদম মোবারক যে আমার বেহেশতী তাঞ্জাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।


মিথ্যাবাদী মা কবিতা – আদিত্য অনীক


মিথ্যাবাদী মা
আদিত্য অনীক


এতটা দিন পেরিয়ে আজো মায়ের জন্য কাঁদি,
কারণ আমার মা যে ছিল ভীষণ মিথ্যাবাদী।
বাবা যেদিন মারা গেল আমরা হলাম একা,
সেদিন থেকেই বাঁক নিয়েছে মায়ের কপাল রেখা।
মা বলতো বাবা নাকি তারার ভিড়ে আছে,
লেখাপড়া করি যদি নেমে আসবে কাছে।
তারায় তারায় বাবা খুঁজি তারার ছড়াছড়ি,
আমার মায়ের মিথ্যে বলার প্রথম হাতে খড়ি।

পাড়া পড়শী বলল এসে এই বয়সেই রাড়ি!
একা একা এতটা পথ কেমনে দেবে পাড়ি?
ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে কর আবার,
মা বলল, ওসব শোনে ঘেন্না লাগে আমার।
একা কোথায় খোকন আছে, বিয়ের কী দরকার?
ওটা ছিল আমার মায়ের চরম মিথ্যাচার।

রাত্রি জাগে সেলাই মেশিন, চোখের কোণে কালি,
নতুন জামায় ঘর ভরে যায় মায়ের জামায় তালি।
ঢুলু ঢুলু ঘুমের চোখে সুই ফুটে মা'র হাতে,
আমি বলি শোও তো এবার কী কাজ অত রাতে?
মা বলত ঘুম আসে না শুয়ে কী লাভ বল?
ওটা ছিল আমার মায়ের মিথ্যা কথার ছল।

স্কুল থেকে নিতে আসা গাড়ি ঘোড়ার চাপে,
আমার জন্য দাঁড়ানো মা কড়া রোদের তাপে।
ঘামে মায়ের দম ফেটে যায়, দু'চোখ ভরা ঝিম,
ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে আমায় দিত আইসক্রিম।
মায়ের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলতাম একটু নাও,
মলিন হেসে মা বলত, খাও তো বাবা খাও।
আমার আবার গলা ব্যথা, ঠাণ্ডা খাওয়া মানা,
ওটা ছিল আমার মায়ের নিঠুর মিথ্যা-পনা।

বড় হয়ে চাকরি নিয়ে বড় শহর আসি,
টুকটুকে বউ ঘরে আমার বউকে ভালবাসি।
পশ এলাকায় বাসা নিয়ে ডেকোরেটর ধরে,
সাজিয়ে নিলাম মনের মত অত্যাধুনিক করে।
মা তখনো মফঃস্বল কুশিয়ারার ঢালে,
লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে সন্ধ্যাবাতি জ্বালে।
নিয়ন বাতির ঢাকা শহর আলোয় ঝলমলো,
মাকে বলি গঞ্জ ছেড়ে এবার ঢাকা চলো।
মা বলত এই তো ভালো, খোলা মেলা হাওয়া,
কেন আবার তোদের ওই ভিড়ের মধ্যে যাওয়া?
বদ্ধ ঘরে থাকলে আমার হাঁপানি ভাব হয়,
ওটা ছিল আমার মায়ের মিথ্যা অভিনয়।

তারপর আমি আরো বড়, স্টেটস এ অভিবাসী,
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ সুনাম রাশি রাশি।
দায়িত্বশীল পদে আমার কাজের অন্ত নাই,
মায়ের খবর নিব এমন সময় কমই পাই।
মা বিছানায় একলা পড়া খবর এলো শেষে,
এমন অসুখ হয়েছে যার চিকিৎসা নেই দেশে।
উড়ে গেলাম মায়ের কাছে অনেক দূরের পথ,
পায়ে পড়ে বলি মাকে এবার ফিরাও মত।
একা একা গঞ্জে পড়ে কী সুখ তোমার বল?
আমার সংগে এবার তুমি এমেরিকা চল।
এসব অসুখ এমেরিকায় কোন ব্যাপার নয়,
সাত দিনের চিকিৎসাতেই সমূল নিরাময়।
কষ্ট হাসি মুখে এনে বলল আমার মা,
প্লেনে আমার চড়া বারণ তুই কি জানিস না?
আমার কিছু হয় নি তেমন ভাবিস অযথা,
ওটাই ছিল আমার মায়ের শেষ মিথ্যাকথা।
ক'দিন পরেই মারা গেল নিঠুর মিথ্যাবাদী,
মিথ্যাবাদী মায়ের জন্য আজো আমি কাঁদি।

সবাইকে মা দিবসের শুভেচ্ছা...
১২, মে

চেতনায় লারমা কবিতা – Palash Chakma Jumma


চেতনায় লারমা
Palash Chakma Jumma


ওই যে বনে দেখো ডাকছে পাখি
শোষকের শৃংখল ভাঙ্গবে বলে,
শত রক্ত জবা ফুল ফুটছে দেখো
তোমার দেখানো পথে হাঁটবে বলে।।

তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি শিখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম,
তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি দেখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।।

জুম পাহাড়ে তুমি জ্বালিয়ে ছিলে
বিপ্লবী চেতনার জীবন প্রদীপ,
অধিকার হারা মানুষের হৃদয়ে
বেঁচে থাকার আশার প্রদীপ।।

তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি শিখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম,
তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি দেখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।।

পাহাড়ের বাজে, ঝর্ণার গর্জনে
আজও তোমার আহ্বান শুনি,
জোনাকিরা আজও জ্বলছে আঁধারে
মুক্তির আলো ফোটাবে বলে।।

তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি শিখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম,
তাই লারমা তুমি হৃদয়ে চির অম্লান
তুমি দেখিয়ে ছিলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।।


বেকারের চিঠি – মণিভূষণ ভট্টাচার্য | Bekarer Chithi kobita


বেকারের চিঠি
মণিভূষণ ভট্টাচার্য 


আমার বয়স যে বছর একুশ পূর্ণ হলো –
ভোট দিলাম।
দ্বিতীয়বার যখন চটের পর্দা-ঢাকা খোপরিতে ঢুকে
প্রগতিশীল প্রতীক চিহ্নে ছাপ মারছি তখন আমি ছাব্বিশ।

ঊনত্রিশ বছর বয়সেও বিশ্বের নিঃস্বতম গণতন্ত্র রক্ষার জন্য
আমার প্রাণ আকুল হয়ে উঠেছিলো।
কিন্তু এ বছর ভোটের দিন সারাদুপুর তক্তপোষে শুয়ে
বেড়ার ফোকর দিয়ে পতাকা-ওড়ানো রিকসার যাতায়াত দেখেছি
কিন্তু ভোট দিতে যাই নি।
 
না, আমি ভোট বয়কট করিনি
ভোট আমাকে বয়কট করেছে।

কারণ আমার বয়স একত্রিশ।
তিরিশের পর সরকারি চাকরি পাওয়া যায় না।
যে সরকার আমাকে চাকরি দেবে না –
সেই সরকার গঠনের জন্য
গায়ে আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘোর –
এরকম আশা করা যায় না।
বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অবশ্য বয়স পাঁচ বছর শিথিলযোগ্য,
কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিশেষ কারণ

বিশেষভাবেই অনুপস্থিত।
অগত্যা সরকারি চাকরি পাবার একটাই উপায় আছে
সার্টিফিকেট জাল করে বয়স কমিয়ে ফেলা।
কিন্তু হে নন্দিত নেতৃবৃন্দ, যদিও আমার চোখের উপর
আপনাদের অনির্বচনীয় লীলাময় জীবন খোলা আছে
তবু জালিয়াৎ হতে পারবো না –
আমার বাবা সৎ ছিলেন।
 
এই গঞ্জের বাজারে, ন্যাড়া ছাতিমতলায়, কাঁচাপাকা চুলে,
পুরু কাচের চশমা চোখে যে বৃদ্ধটি কুঁজো হয়ে
মান্ধাতার আমলের টাইপরাইটারে
আমার এবং আমার মতো শত শত চাকরিপ্রার্থী এবং
ভোটদাতা অর্থাৎ আপনাদের পরমান্নদাতা যুবকের
হাজার হাজার দরখাস্ত টাইপ ক’রে দিতেন –
একদিন ভরদুপুরে তার বুকের বাঁদিকের লজঝড়ে টাইপমেশিনটা
বিগড়ে গেল।
সেই ফাঁকা জায়গায় আমি কলা নিয়ে বসে পড়লাম।
কার্বাইডে পাকানো চালানী মর্তমান কলার রঙ
যদিও বোম্বাই-অভিনেত্রীর চটককেও হার মানায়,
তবু খেতে অতিশয় অখাদ্য, ফলে আমাকে ডাবের সঙ্গে
ভাব জমাতে হোলো।
 
পা ফাক করে দাঁড়িয়ে ধুতি-পাঞ্জাবী শার্ট-প্যান্ট যখন
সরু নল দিয়ে চোঁ চোঁ করে সুমিষ্ট জল টেনে নিতো,
তাদের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে আমি এই গঞ্জের
ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষের মর্মান্তিক মহিমাকে স্পর্শ করতাম।
ডাবের খোলাটি ছুঁড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে, ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে
দেখতাম, অধিকাংশ অমেরুদণ্ডী বুদ্ধিজীবীদের মতোই,
ভিতরে শাঁস আছে কিনা।
 
তারপর চিরুনী ব্লাউজ ধূপকাঠি তরমুজ চাল
হোসিয়ারী মাল এবং ধূর্ত নেতা পূর্তমন্ত্রী হবার জন্য
যত বড় স্বপ্ন দেখে ঠিক সেই আয়তনের মিষ্টি কুমড়ো
অর্থাৎ একের পর এক বহুমুখী বাণিজ্য বিস্তারে আমি
বিড়লাকেও ছাড়িয়ে গেলাম, কিন্তু বেড়ালের ভাগ্যে
শিকে ছিড়লো না। ফলে প্রায় বিনা চিকিৎসায়
মা মারা গেলেন।
 
আমাদের এখানে গত কুড়ি বছরে আধখানা হাসপাতাল
হয়েছে, বাকি আধখানা আর হবে না, কারণ প্রধান রাজনৈতিক
দলের নেতারা অধিকাংশই ডাক্তার এবং তাদের
নার্সিং হোম আছে।
 
রোজ ভোর চারটেয় উঠে আমি যখন বস্তির
গণতান্ত্রিক খাটা পায়খানায় লাইন দিতাম,
মা নিজের – হাতে – দেওয়া ঘুঁটে জ্বালিয়ে চা করে দিতেন।
সেই স্যাঁতসেতে অন্ধকারে ধোঁয়াটে আগুনের সামনে
বসে-থাকা মা- কে আমার ভারতবর্ষ বলে মনে হোতো।
দিদির মৃতদেহ দড়ি কেটে নামাবার পর থেকে
মা একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।
যার সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়েছিলো সে গরীব ছিলো এবং
ভালো ছিলো। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে মহানও করেনি বা
খ্রীষ্ট্রের সম্মানও দেয় নি – এক চোরাকারবারি
শ্রমিকনেতার আড়কাঠিতে পরিণত করেছিলো। সে সেই
নেতাকে মহিলা সরবরাহ করতো –
সেই নেতার সঙ্গে মন্ত্রীর যোগাযোগ ছিলো,
মন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের যোগ ছিলো,
কেন্দ্রের সঙ্গে পরিধির যোগ ছিলো,
পরিধির সঙ্গে ব্যাস এবং ব্যাসের সঙ্গে
ব্যাসার্ধের সংযোগ ছিলো এবং এইসব সূক্ষ্ম যোগাযোগগুলি
একসঙ্গে গিঁট লেগে একটা মোটা নাইলনের দড়ি হয়ে
দিদির গলায় ফাঁস লাগিয়েছিলো।
 
চাকরি আমার হতো।
জেলার সব ছাত্রদের মধ্যে আমি যদি মাতৃভাষায়
প্রথম না হয়ে আপনাদের পিতৃভাষা অর্থাৎ
ইংরেজিতে প্রথম হতাম, হয়তো আমার বরাত
খুলে যেতো। অথবা আমার বন্ধুরা –
যারা ঠিক ঠিক জায়গায় তেল সরবরাহে
আরব রাষ্ট্রগুলিকেও হার মানিয়েছে –
আমি যদি তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
নামতে পারতাম তাহলে আমার গলায়
বাদামের ঝুড়ির বদলে নেকটাই ঝুলতো।
 
গর্তে-ঢুকে-যাওয়া ফ্যাকাসে হলুদ রঙের দুটো চোখের
শূন্য দৃষ্টি এবং একটা অকেজো টাইপ মেশিন ছাড়া
বাবা আমার জন্য আর কিছু রেখে যেতে পারেন নি।
এ বছর জীবনের সর্বশেষ ভোটটি দিয়ে মা চলে গেলেন। ভারতবর্ষ পড়ে রইলো।
 
আমার আর কোনো দায় নেই।
যেহেতু আজকের দর্শন আগামীকালের সংস্কার মাত্র
এখন যদি আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাই।
বন্ধুরা বলবে, ‘পালিয়ে গেল’।
বিদেশি টাকায় পুষ্ট যে সব তথাকথিত
জনসেবা প্রতিষ্ঠান আছে – তাতে যদি
ভাতের জন্য ঢুকে পড়ি –
তারা বলবে, ‘ব্যাটা গুপ্তচর’।
যদি আত্মহত্যা করি –
তাহলে, ‘কাপুরুষ’।
আর যদি সোজাসুজি প্রতিবাদ করি –
তাহলে আপনারা, রাজনৈতিক নৈশ প্রহরীরা
কালো টাকার কুমিরদের অন্ধকার পাড়ায় গিয়ে
মাঝরাতে ‘নকশাল’ ‘নকশাল’ ব’লে
ঘেউ ঘেউ করে তাদের জাগিয়ে দেবেন
এমন কি অবস্থা তেমন তেমন বেগতিক দেখলে
আপনাদের সঙ্গে রাশিয়া আমেরিকাও যোগ দেবে।
 
এতদিন চাকরি খুঁজেছি। পাই নি।
এবার ভাবছি আমরাই আপনাদের চাকরি দেবো।
 
আমরা যারা বেকার আধাবেকার ভবঘুরে
বাউন্ডুলে ভিখিরি –
যাদের জমি নেই কিন্তু জমিতে খাটে –
বাড়ি বানায় কিন্তু বাড়ি নেই –
যারা শহরে আলো জ্বালে কিন্তু যাদের কুপিতে তেল নেই –
যারা কারখানা বানায়, কিন্তু কারখানা যাদের
আস্তাকুঁড়ে চালান করে দেয়
যারা কোনোদিন একটা ভালো জামা পরেনি,
সরবত খায় নি,
বেড়াতে গিয়ে পর্বতমালার স্তব্ধ নিরাসক্তি ও মহত্ত্বকে
স্পর্শ করেনি,
যারা জন্মায় আর খাটে, খাটে আর মরে,
যারা পিপড়ের মতো পোকামাকড়ের মতো
শীত-রাত্রির ঝরাপাতার মতো –
সেইসব নিরক্ষর নগণ্য কুঁজো অবজ্ঞাত করুণ
যাদের দেখার জন্য এবং ঠকাবার জন্য আপনারা
বিরাট মঞ্চে উঠে দাঁড়ান –
যারা আগামীদিনের ভারতবর্ষের, গোটা পৃথিবীর এবং
সৌরজগতের মালিক – আমি তাদেরই একজন হয়ে
এই জংশনে স্টেশনে বাদাম বেচে যাচ্ছি।
কশাইয়ের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের মতো জীবন আমাদের –
যে-কোনো মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি – আবার
এই আঙুলের কেন্দ্রীভূত চাপে খোলা ফাটিয়ে বের করে আনা যায়
রাজনৈতিক ক্ষমতার পুষ্টিকর তৈলবীজ, আর সমস্ত শুকনো খোসা
বাতাসে উড়ে যায়, বাতাসের সঙ্গে আকাশ স্পর্শ করে
মানুষের অনন্ত ঘৃণার আগুন –
সেই আগুনের পাশে বসে আছেন আমার মা,
 
আমার দেশজননী।
 
না, ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনলেই আপনাদের মতো
আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসে না।


তোমারে পেয়ে গেলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতো কবিতা – প্রীতম কে পাল


তোমারে পেয়ে গেলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতো কবিতা
প্রীতম কে পাল


তােমারে পেয়ে গেলে শালার বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতাে।
সব কথা তােমারে বলা লাগতাে, লিখার মতােন কিছু পাইতাম না।

দুপুরে হয়তাে তােমারে পাইতাম কিন্তু ছারখার করা দুপুর পাইতাম না।
বিকালে হয়তাে তােমার লগে হাঁটা লাগতাে, বিকালের বিষাদ পাইতাম না।
সারারাত তােমার সাথে ফুসফুস করে কথা বলা লাগতাে, রাত আমারে....আর পাইতাে না।
তােমারে পেয়ে গেলে আর আক্ষেপ করার মতাে কিছু থাকতাে না,
আক্ষেপের অভাবে ফাঁকা ফাঁকা লাগতাে।
তােমার দিকে তাকাইলে তােমার চোখে ডুবে যাইতাম, পিঙ্ক ফ্লয়েডে আর ডুবা হইতাে না।
তােমার ভালােবাসা পেয়ে গেলে হয়তাে চায়ের কাপের ভালােবাসা একটু কম কম লাগতাে।
তােমারে পেয়ে গেলে তােমারে না পাওয়ার কষ্ট আর পাওয়া হইতো না তখন ছোটখাটো কষ্ট শালা জ্বালায়ে মারতো।
কাছ থেকে তোমার সৌন্দর্য দেখে ফেললে হয়তো নর্দান লাইটের টর্চলাইট মনে হইতো। 
তোমার চুমু পেয়ে গেলে হয়তো খাবার দাবার সব তিতা তিতা লাগতো, চিকন শরীরে আরো অপুষ্টিতে ভুগতাম।
তোমারে পেয়ে গেলে আর কোনো কিছুর পরোয়া করতাম না তখন জগৎ সংসার ছাড়খার হইয়া যাইতে পারতো।
তাই তোমারে পেয়ে গেলে আসলেই....আসলেই শালার বিরাট সমস্যা হইয়া যাইতো।