Showing posts with label ধর্মীয় কবিতা. Show all posts
Showing posts with label ধর্মীয় কবিতা. Show all posts

দ্বার খুলে আর রাখবো না নজরুলগীতি – কাজী নজরুল ইসলাম


দ্বার খুলে আর রাখবো না
কাজী নজরুল ইসলাম


আমি দ্বার খুলে আর রাখবো না, পালিয়ে যাবে গো
জানবে সবে গো, নাম ধরে আর ডাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

এবার পূজার প্রদীপ হয়ে, জ্বলবে আমার দেবালয়ে
জ্বালিয়ে যাবে গো, আর আঁচল দিয়ে ঢাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

হার মেনেছি গো, হার দিয়ে আর বাঁধবো না
দান এনেছি গো, প্রান চেয়ে আর কাঁদবো না
হার মেনেছি গো।
পাষাণ তোমায় বন্দী করে, রাখবো আমার ঠাকুরঘরে
রইবো কাছে গো, আর অন্তরালে থাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায় – কাজী নজরুল ইসলাম


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
কাজী নজরুল ইসলাম


ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়,
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়।।

ধূলির ধরা বেহেশ্তে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ,
আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।।

দেখ্ আমিনা মায়ের কোলে, দোলে শিশু ইসলাম দোলে,
কচি মুখে শাহাদাতের বাণী সে শোনায়।।

আজকে যত পাপী ও তাপী, সব গুনাহের পেল মাফী,
দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী জুলুম নিল বিদায়।।

নিখিল দরুদ পড়ে লয়ে নাম, সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম,
জীন পরী ফেরেশ্তা সালাম জানায় নবীর পায়।


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায় – কাজী নজরুল ইসলাম


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
কাজী নজরুল ইসলাম


হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়,
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।।

তার ভাবে বিভোল রাঙা পায়ের তলে
পর্বত জঙ্গম টলমল টলে,
খোরমা খেজুর বাদাম জাফরানি ফুল ঝ’রে ঝ’রে যায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।।

আসমানে মেঘ চলে ছায়া দিতে,
পাহাড়ের আঁসু গলে ঝরনার পানিতে,
বিজলি চায় মালা হতে,
পূর্ণিমার চাঁদ তার মুকুট হতে চায়-
সে যে আমার কমলিওয়ালা-কমলিওয়ালা।


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ – কাজী নজরুল ইসলাম


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
কাজী নজরুল ইসলাম


হে নামাজী! আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।
দিলাম তোমার চরণ-তলে হৃদয়-জায়নামাজ।।

আমি গুনাহগার বে-খবর,
নামাজ পড়ার ন্ই অবসর।।

(তব) চরণ-ছোঁয়ায় এই পাপীরে কর সরফরাজ।
তোমার ওজুর পানি মোছ আমার পিরান দিয়ে
আমার এ ঘর হোক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে।
যে শয়তানের ফন্দিতে ভাই,
খোদায় ডাকার সময় না পাই।।
সেই শয়তান যাক দূরে,
শুনে তকবীরের আওয়াজ।


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই – কাজী নজরুল ইসলাম


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
কাজী নজরুল ইসলাম


মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে,
গোর আজাব থেকে এ গুণাহ্গার পাইবে রেহাই।
কত পরহেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত,
ঐ মস্জিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াৎ,
সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই।
কত দরবেশ ফকির রে ভাই মস্জিদের আঙিনাতে
আল্লার নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে।
আমি তাদের সাথে কেঁদে কেঁদে নাম জপতে চাই
আল্লার নাম জপতে চাই।


নামাজী, তোর নামাজ হলো যে ভুল – কাজী নজরুল ইসলাম


নামাজী, তোর নামাজ হলো রে ভুল
কাজী নজরুল ইসলাম


নামাজী, তোর নামাজ হলো যে ভুল,
মসজিদে তুই রাখলি সিজ্দা, ছাড়ি ইমানের মূল।।

জামাতে সামিল হয়ে নামাজে,
আউড়ালি মুখে সুরা কোরানের,
ভাব্ লি কি তুই পার হয়ে গেলি, পুলসেরাতের পুল।।

আজ মিলন তীর্থে বাঁধ রে কাতার মনের জায়নামাজে,
সেই আরফাতে তোর নুয়ে দে দিল না ফরমানি লাজে।।

ওজু করে শেষে তৌবার নীরে, তহরিম বাঁধ ভীতু নত শিরে,
বন্দেগী তোর হবে রে কবুল, কিয়ামতে পাবি কূল।।


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ – কাজী নজরুল ইসলাম


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
কাজী নজরুল ইসলাম


ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্ আসমানি তাগিদ।।

তোর সোনা-দানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ্।
দে জাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ্।।

আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে।
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।।

আজ ভুলে যা তোর দোস্ত ও দুশমন হাত মিলাও হাতে।
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।।

ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরিতে র্শিনি তৌহিদের।
তোর দাওয়াত কবুল করবে হজরত হয় মনে উম্মীদ।।


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি – কাজী নজরুল ইসলাম


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি
কাজী নজরুল ইসলাম


নতুন চাঁদরে তকবীর শোন কয় ডেকে ঐ মুয়াজ্জনি —
আসমানে ফরে ঈদুজ্জোহার চাঁদ উঠছেে মুসলমেনি।।

এলো স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদুজ্জোহার এই সে চাঁদ,
তোরা ভোগরে পাত্র ফলে রে ছুঁড়ে ত্যাগরে তরে হৃদয় বাঁধ।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।
প্রাণরে যা তোর প্রয়িতম আজকে সে সব আন,
খোদারই রাহে আজ তাহাদরে কর রে কোরবান।
কি হবে ঐ বনরে পশু খোদারে দিয়ে,
তোর কাম- ক্রোধাদি মনরে পশু জবেহ কর নিয়ে।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।
বিলিয়ে দেওয়ার খুশরি শরিনি তশ্‌তরিতে আন,
পর রে তোরা সবাই ত্যাগের রঙিন পরিহান।
মোদরে যা কছিু প্রয়ি বিলাব সবে,
নবীর উম্মত তবে সকলে কবে।
কোরবানি দে তোরা, কোরবানি দে।


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম – কাজী নজরুল ইসলাম


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
কাজী নজরুল ইসলাম


তৌহীদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম,
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।
ঐ নাম জপিলেই বুঝতে পারি খোদাই কালাম,
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।

ঐ নামেরই রশি ধ’রে যাই আল্লাহ্ পথে,
ঐ নামেরই ভেলায় চ’ড়ে ভাসি নূরের স্রোতে,
ঐ নামেরই বাতি জ্বেলে’দেখি লোহ আরশ-ধামে
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।

ঐ নামের দামন ধ’রে আছি , আমার কিসের ভয়
ঐ নামের গুণে পাব আমি খোদার পরিচয়,
তাঁর কদম মোবারক যে আমার বেহেশতী তাঞ্জাম
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম ।


সুধাংশু! এবার তুই পালা কবিতা – আলমগীর হুসেন


সুধাংশু! এবার তুই পালা
আলমগীর হুসেন


পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু
সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে
এবার যে তোর পালানোর বেলা
জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা।

জানি তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু
দাঁড়িয়ে হাহাকারের ছোঁয়ায় জড়ানো শ্মশানসম বাস্তুভিটায়
সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো, আমাদের ছেলেবেলা
কিন্তু এবার যে তোর পালানোর বেলা, এবার তুই পালা।

আমি জানি নির্বাক দাঁড়িয়ে তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু
সেই একপাল বন্ধুগুলো ­ রামী, শেপু, কাকলী আরও অনেকে
প্রাণময় কোলাহলে কাটিয়েছি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বেলা
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।

আমি বুঝি তোর শঙ্কা আগামী বিরহ বেদনার বন্ধু সুধাংশু
আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা আত্মার সম্পর্ক ­-
এই বাস্তুভিটার সাথে আর একঝাঁক বন্ধুর ভালবাসা প্রাণঢালা।
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।

কোথায় সেই কল-কাকলীতে মুখরিত সবুজ সুন্দর কাপালী-ভিটাটি বন্ধু সুধাংশু
দু’টি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর চির-দুঃখীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আজ সেই কাপালী ভিটায়।
কোথায় সেই রামী, শেপু, কাকলী আরও সেই প্রিয় বন্ধুগুলা
ওরা যে সবাই পালিয়েছে, এবার তোর পালা।

তুই কি জানিস বন্ধু সুধাংশু
তোর বিদায়ে ভীষণ ব্যথা পাবে আমার ঐ ছ’বছরের অবুঝ বোনটি ‘নেহা’
কাটাবে কত সন্ধ্যা অধীর প্রত্যাশায়, সুধাংশু ভাইকে জড়িয়ে ধরবেঃ কোথায় চকলেটগুলা?
তবুও তোকে পালাতে হবে যে, এবার তুই পালা।

আরও জানি বন্ধু সুধাংশু
তোর ষোড়শী বোনটি ‘মিলা’ দুষ্টামির ছলে আর বলতে পারবে নাঃ আলমদা তুমি এত কৃপণ কেন?
চলো মেলায় নিয়ে, কিনে দিতে হবে সুন্দর একটি মালা।
তথাপি তোকে পালাতে যে হবে, এবার তুই পালা।

তোকে যে বলা হয় নি বন্ধু সুধাংশু
মিলা’র সহপাঠী আমার ভাইটি ‘রিপন’ বলছিল সেদিনঃ ভাইয়া মিলা’টা যা সুন্দর হয়েছে না!
বলে দিয়েছি ওকে, সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে, তোর মতো গর্দভটি ওর দিকে তাকাবে না।
তোর হাতে যে সময় নেই বন্ধু, এবার তুই পালা।

মিলাকে যে বিশ্ব জয় করতেই হবে বন্ধু সুধাংশু
অসাধারণ সুন্দরী মেধাবী মিলার জন্য এক ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারীর জীবন ­
হবে মানবতার জন্য এক অমার্জনীয় ব্যর্থতা।
তাই আমার কাতর মিনতি বন্ধু, এখনই তুই পালা।


ঈশ্বর কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ঈশ্বর
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
                          হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়-
তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘ প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
                          উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।


সাম্যবাদী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সাম্যবাদী

কাজী নজরুল ইসলাম.....মরুভাস্কর


আদি উপসনালয়-
উঠিল আবার নতুন করিয়া- ভুত প্রেত সমুদয়
তিন শত ষাট বিগ্রহ আর আমুর্তি নতুন করি'
বসিল সোনার বেদীতে রে হায় আল্লার ঘর ভরি'।

সহিতে না পারি' এ দৃশ্য, এই স্রষ্টার অপমান,
ধেয়ানে মুক্তি-পথ খোঁজে নবী, কাঁদিয়া ওঠে পরান।
"খদিজারে কন- আল্লাতালার কসম, কা'বার ঐ
"লাৎ""ওজ্জার" করিবনা পূজা, জানিনা আল্লা বই।
নিজ হাতে যারে করিল সৃষ্টি খড় আর মাটি দিয়া
কোন নির্বোধে পূজিবে তাহারে হায় স্রষ্টা বলিয়া।"
সাধবী পতিব্রতা খদিজাও কহেন স্বামীর সনে--
"দূর কর ঐ লাত-মানাতেরে, পূজে যাজা সব -জনে।
তব শুভ-বরে একেশ্বর সে জ্যোতির্ময়ের দিশা।
পাইয়াছি প্রভু, কাটিয়া গিয়াছে আমার আঁধার নিশা।"

ক্রমে ক্রমে সব কোরেশ জানিল; মোহাম্মদ আমীন
করে নাকো পূজা কা'বার ভূতেরে ভাবিয়া তাদেরে হীন।


মোহর্‌রম কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মোহর্‌রম
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,–
‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’।
কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !
রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া দামেশকে–
‘জয়নালে পরাল এ খুনিয়ারা বেশ কে?
‘হায় হায় হোসেনা’ ওঠে রোল ঝন্‌ঝায়,
তল্‌ওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পঞ্জায়!
উন্‌মাদ ‘দুলদুল্’ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আলি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়!
মা ফাতেমা আস্‌মানে কাঁদে খুলি কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস!
রণে যায় কাসিম্ ঐ দু’ঘড়ির নওশা,
মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা!
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা–
‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেলো সকিনা!’
কাঁদে কে রে কোলে করে কাসিমের কাটা-শির?
খান্‌খান্ খুন হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর!
কেঁদে গেছে থামি হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র!
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
‘আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!’
নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার!
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্‌মনও ‘সাব্বাস’!
দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা!’
মা’র থনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্‌পায়!
জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়্‌টায়?
দাউদাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু–’পানি দাও, মরে জাদু আস্‌গর!’
কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,
খাঁ খাঁ করে কার্‌বালা, নাই পানি খর্জুর,
পেল না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা, –পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!
পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে!
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
‘দাদা! তেরি হর্ কিয়া বর্‌বাদ্ পয়মাল!’
হাইদরি-হাঁক হাঁকি দুল্‌দুল্-আস্‌ওয়ার
শম্‌শের চম্‌কায় দুশমনে ত্রাস্‌বার!
খসে পড়ে হাত হতে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার।
নিঃশেষ দুশ্‌মন্; ওকে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মুছে আঁখি-প্রান্ত?
কোথা বাবা আস্‌গর্? শোকে বুক-ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসনের ফেটে যায় পাঁজরা!
ধুঁকে ম’লো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্‌জাত্‌রা!
অঞ্জলি হতে পানি পড়ে গেল ঝর্-ঝর্
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর!
হল্‌কুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে?–
আফ্‌তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে!
আস্‌মান ভরে গেল গোধূলিতে দুপরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে!
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্–
‘আরশের পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা,
‘এয়্ খোদা বদ্‌লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জনা করো গোনা পাপী কম্‌বখ্‌তের!’
কত মোহর্‌রম্ এল্ গেল চলে বহু কাল–
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুস্‌লিম্! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,
‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজ সেই মোহর্‌রম মাহিনা,–
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!
উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবির,
দুনিয়াতে নত নয় মুস্‌লিম কারো শির;–
তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,
শম্‌শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য,
হুশিয়ার ইস্‌লাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো ওঠো মুস্‌লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।
শহীদের দিনে সব-লালে-লাল হয়ে যাক!
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস দিন।
হাসানের মতো পি’ব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের;
আস্‌গর সম দিব বাচ্চারে কোর্‌বান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান!
সকিনার শ্বেতবাস দেব মাতা কন্যায়,
কাসিমের মতো দেবো জান রুধি অন্যায়!
মোহর্‌রম্! কারবালা! কাঁদো ‘হায় হোসেনা!’
দেখো মরু-সূর্যে এ খুন যেন শোষে না!


কোরবানি কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কোরবানি
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
        দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন!
             ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,–
             আজিকার এ খুন কোর্‌বানির!
             দুম্বা-শির      রুম্-বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি। রহমান কি রুদ্র নন?
             বাস্‍! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর 'খুন দে, জান দে, শির দে বৎস' শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             খঞ্জর মারো গর্দানেই,
              পঞ্জরে আজি দরদ নেই,
              মর্দানি'ই পর্দা নেই
ডর্‌তা নেই আজ খুন্-খারাবিতে রক্ত-লুব্ধ মন!
              খুনে খেল্‌ব খুন্-মাতন!
দুনো উন্মাদনাতে সত্য মুক্তি আন্‌তে যুঝ্‌র রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             চড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
             মুস্‌লিমে সারা দুনিয়াটার।
             'জুল্‌ফেকার' খুল্‌বে তার
দু'ধারী ধার্‌ শেরে-খোদার রক্তে-পূত-বদন!
             খনে আজকে রুধ্‌ব মন!
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
             'আজাদি' মেলে না পস্তানোয়!
             দস্তা নয় সে     সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্ত-লুব্ধ কোন্
             কাঁদে-শক্তি-দুঃস্থ শোন্–

'এয়্‌ ইব্‌রাহিম্ আজ কোর্‌বানি কর শ্রেষ্ঠ পুত্রধন!'
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           এ তো নহে লোহু তরবারের
           ঘাতক জালিম জোর্‌বারের!
           কোরবানের জোর-জানের
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে, এ ত্যাগে 'বুদ্ধ' মন!
           এতে    মা রাখে পুত্র পণ্!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরাল বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           এই দিনই 'মীনা'-ময়দানে
           পুত্র-স্নেহের গর্দানে
           ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইব্‌রাহিম্ সে আপনা রুদ্র পণ!
           ছি ছি! কেঁপো না ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয়, প্রহলাদ সম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           দ্যাখ্ কেঁপেছে 'আরশ' আস্‌মানে,
           মন-খুনি কি রে রাশ মানে?
           ত্রাস প্রাণে?-তবে রাস্তা নে‍!
প্রলয়- বিষাণ কিয়ামতে তবে বাজাবে কোন্ বোধন?
সেকি সৃষ্টি-সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!–
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           মুস্‌লিম-রণ-ডঙ্কা সে,
           খুন্ দেখে করে শঙ্কা কে?
           টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা লড়ব রণ-মরণ!
           ঢালে বাজ্‌বে ঝন্-ঝনন!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           জোর চাই আর যাচ্‌না নয়
           কোরবানি-দিন আজ না ওই?
           বাজ্‌না কই? সাজ্‌না কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ?
           বল্– 'যুঝ্‌ব জান্ ভি পণ!'
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ!
আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্বোধন।


খেয়া-পারের তরণী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


খেয়া-পারের তরণী
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


যাত্রীরা রাত্তিরে হতে এল খেয়া পার,
বজ্রেরি তূর্যে এ গর্জেছে কে আবার?
প্রলয়েরি আহ্বান ধ্বনিল কে বিষাণে!
ঝন্‌ঝা ও ঘন দেয়া স্বনিল রে ঈশানে!

নাচে পাপ-সিন্ধুতে তুঙ্গ তরঙ্গ!
মৃত্যুর মহানিশা রুদ্র উলঙ্গ!
নিঃশেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে,
ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নিঃস্বে।

তমসাবৃতা ঘোরা ‘কিয়ামত’ রাত্রি,
খেয়া-পারে আশা নাই ডুবিল রে যাত্রী!
দমকি দমকি দেয়া হাঁকে কাঁপে দামিনী,
শিঙ্গার হুঙ্কারে থরথর যামিনী!

লঙ্ঘি এ সিন্ধুরে প্রলয়ের নৃত্যে
ওগো কার তরী ধায় নির্ভীক চিত্তে–
অবহেলি জলধির ভৈরব গর্জন
প্রলয়ের ডঙ্কার ওঙ্কার তর্জন!

পুণ্য-পথের এ যে যাত্রীরা নিষ্পাপ,
ধর্মেরি বর্মে সু-রক্ষিত দিল্ সাফ!
নহে এরা শঙ্কিত বজ্র নিপাতেও
কাণ্ডারী আহ্‌মদ তরী ভরা পাথেয়।

আবুবকর উস্‌মান উমর আলি হায়দর
দাঁড়ি যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ডর!
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা,
দাঁড়ি-মুখে সারি-গান –লা-শরিক আল্লাহ!

‘শাফায়ত’-পাল-বাঁধা তরণীর মাস্তুল,
‘জান্নাত্’ হতে ফেলে হুরি রাশ্ রাশ্ ফুল।
শিরে নত স্নেহ-আঁখি মঙ্গল দাত্রী,
গাও জোরে সারি-গান ও-পারের যাত্রী।
বৃথা ত্রাসে প্রলয়ের সিন্ধু ও দেয়া-ভার,
ঐ হলো পুণ্যের যাত্রীরা খেয়া পার।


মুনাজাত কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মুনাজাত
কাজী নজরুল ইসলাম

আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে 
                   বাঁচাও প্রভু উদার। 
হে প্রভু! শেখাও - নীচতার চেয়ে 
                      নীচ পাপ নাহি আর। 

যদি শতেক জন্ম পাপে হই পাপী, 
                               যুগ-যুগান্ত নরকেও যাপি, 
     জানি জানি প্রভু, তারও আছে ক্ষমা- 
                         ক্ষমা নাহি নীচতার।। 

ক্ষুদ্র করো না হে প্রভু আমার 
                     হৃদয়ের পরিসর, 
যেন সম ঠাঁই পায় 
                   শত্রু-মিত্র-পর। 

নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো 
    অন্যের সুখে সুখ পাই আরো, 
     কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী
                      ক্ষুদ্র আত্মা তার।।


উমর ফারুক কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


উমর ফারুক

কাজী নজরুল ইসলাম


তিমির রাত্রি - 'এশা'র আযান শুনি দূর মসজিদে। 
প্রিয়-হারা কার কান্নার মতো এ-বুকে আসিয়ে বিঁধে! 


                     আমির-উল-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন। 
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি, 
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী? 
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান? 
মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্ববান? 

                     আবার লুটায়ে পড়ি। 
'সেদিন গিয়াছে' - শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি। 
উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু! 
আহ্বান নয় - রূপ ধরে এস - গ্রাসে অন্ধতা-রাহু! 
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন! 
সত্যের আলো  নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ। 
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের 
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের 
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি 
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি! 

ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি? 
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি। 
আজ বুঝি - কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর- 
'মোরপরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।' 

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি 
খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি 
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক' নুয়ে, 
ঊর্ধ্বের যারা - পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে। 
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ 
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ। 
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে, 
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে। 

                     হেরি পশ্চাতে চাহি- 
তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি 
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি 
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি। 
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে- 
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে! 
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন 
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন 
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো 'খবুজ' রুটি 
একটি  মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি। 
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি 
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি! 
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে, 
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে। 
কিছুদূর যেতে উঠ হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, 'ভাই 
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই 
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে, 
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।' 

                     ...ভৃত্য দস্ত চুমি 
কাঁদিয়া কহিল, 'উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি? 
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি 
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?' 

                     খলিফা হাসিয়া বলে, 
'তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে। 
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, 'উমর! ওরে 
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।' 
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই। 
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই। 
আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা। 
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা। 

ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী' বিশ্ববীণা।
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, 'জয় জয়  হে মানব।'

তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান, 
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা, 
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না। 

মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি, 
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা - সেদিন সে বিভাবরী 
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে 
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুদাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে 

কাঁদিতেছে আর দুখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়, 
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকুলে চায়। 
শুনিয়া সকল - কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে 
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে, 
বলিলে, 'এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের 'পরে, 
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে'। 
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা, 
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা! 
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার? 
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার 
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি' - চলিলে নিশীথ রাতে 
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে! 

                     এত যে কোমল প্রাণ, 
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক' অপমান! 
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে 
মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্রে তোমার চোখের পরে! 
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি- 
'অপরাধ করে তোরি মতো স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।' 

                     আবু শাহমার গোরে 
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে। 
খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে, 
'কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে, 
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে, 
রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে। 
হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট! 
অপমান তব করিব না আজ করিয়া  নান্দী পাঠ, 
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই 
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই। 

                                          (সংক্ষেপিত)


এক আল্লাহ জিন্দাবাদ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


এক আল্লাহ জিন্দাবাদ

কাজী নজরুল ইসলাম


উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ; 
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ। 
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ, 
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ। 

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই; 
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই! 
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে, 
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে। 

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে, 
ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে। 
মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী, 
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি। 

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী, 
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী। 
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি। 
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি। 

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার, 
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার! 
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব 
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব। 

হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়, 
কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়। 
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি; 
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি। 

তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে, 
নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে। 
সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়, 
আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়। 

যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই, 
উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই। 
ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মেরা আল্লার রাজ্য চাই, 
দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই। 

মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের, 
শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে-- শখ ওদের! 
আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ, 
নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ। 

পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো, 
এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো। 
সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে, 
তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে। 

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল 
তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল। 
ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়, 
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়! 

তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা, 
এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা। 
ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ, 
পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ। 

বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে, 
হবে দুলদুল - আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে। 
আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন, 
তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন। 

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান 
সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান! 
ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে - ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ, 
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - "এক আল্লাহ জিন্দাবাদ"।