Showing posts with label নজরুলের শ্রেষ্ঠ কবিতা. Show all posts
Showing posts with label নজরুলের শ্রেষ্ঠ কবিতা. Show all posts

দ্বার খুলে আর রাখবো না নজরুলগীতি – কাজী নজরুল ইসলাম


দ্বার খুলে আর রাখবো না
কাজী নজরুল ইসলাম


আমি দ্বার খুলে আর রাখবো না, পালিয়ে যাবে গো
জানবে সবে গো, নাম ধরে আর ডাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

এবার পূজার প্রদীপ হয়ে, জ্বলবে আমার দেবালয়ে
জ্বালিয়ে যাবে গো, আর আঁচল দিয়ে ঢাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

হার মেনেছি গো, হার দিয়ে আর বাঁধবো না
দান এনেছি গো, প্রান চেয়ে আর কাঁদবো না
হার মেনেছি গো।
পাষাণ তোমায় বন্দী করে, রাখবো আমার ঠাকুরঘরে
রইবো কাছে গো, আর অন্তরালে থাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।


শিশু যাদুকর কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


শিশু যাদুকর
কাজী নজরুল ইসলাম


পার হয়ে কত নদী কত সে সাগর
এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর!
কোন রূপ-লোকে ছিলি রূপকথা তুই,
রূপ ধরে এলি এই মমতার ভুঁই।
নবনীতে সুকোমল লাবণি লয়ে
এলি কে রে অবনীতে দিগ্বিজয়ে।
কত সে তিমির-নদী পারায়ে এলি-
নির্মল নভে তুই চাঁদ পহেলি।
আমরার প্রজাপতি অন্যমনে
উড়ে এলি দূর কান্তার-কাননে।
পাখা ভরা মাখা তোর ফুল-ধরা ফাঁদ,
ঠোঁটে আলো চোখে কালো-কলঙ্কী চাঁদ!
কালো দিয়ে করি তোর আলো উজ্জ্বল-
কপালেতে টিপ দিয়ে নয়নে কাজল।
তারা-যুঁই এই ভুঁই আসিলি যবে,
একটি তারা কি কম পড়িল নভে?
বনে কি পড়িল কম একটি কুসুম?
ধরণীর কোলে এলি একরাশ চুম।
স্বরগের সব-কিছু চুরি করে, চোর,
পলাইয়া এলি এই পৃথিবীর ক্রোড়!
তোর নামে রহিল রে মোর স্মৃতিটুক,
তোর মাঝে রহিলাম আমি জাগরুক।


খুকি ও কাঠবেড়ালি কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


খুকি ও কাঠবেড়ালি
কাজী নজরুল ইসলাম


কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?
বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও-
ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,
খাও একা পাও যেথায় যেটুক!
বাতাবি-নেবু সকলগুলো
একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো!
তবে যে ভারি ল্যাজ উঁচিয়ে পুটুস পাটুস চাও?
ছোঁচা তুমি! তোমার সঙ্গে আড়ি আমার! যাও!

কাঠবেড়ালি! বাঁদরীমুখী! মারবো ছুঁড়ে কিল?
দেখবি তবে? রাঙাদাকে ডাকবো? দেবে ঢিল!
পেয়ারা দেবে? যা তুই ওঁচা!
তাই তোর নাকটি বোঁচা!হু
তমো-চোখী! গাপুস গুপুস
একলাই খাও হাপুস হুপুস!
পেটে তোমার পিলে হবে! কুড়ি-কুষ্টি মুখে!
হেই ভগবান! একটা পোকা যাস পেটে ওর ঢুকে!
ইস! খেয়ো না মস্তপানা ঐ সে পাকাটাও!
আমিও খুবই পেয়ারা খাই যে! একটি আমায় দাও!

কাঠবেড়ালি! তুমি আমার ছোড়দি' হবে? বৌদি হবে?
হুঁ!রাঙা দিদি? তবে একটা পেয়ারা দাও না! উঃ!
এ রাম! তুমি ন্যাংটা পুঁটো?
ফ্রকটা নেবে? জামা দুটো?
আর খেয়ো না পেয়ার তবে,
বাতাবি-নেবুও ছাড়তে হবে!
দাঁত দেখিয়ে দিচ্ছ ছুট? অ'মা দেখে যাও!
কাঠবেড়ালি! তুমি মর! তুমি কচু খাও!!


কাজী মোতাহার হোসেন এর কাছে লিখা নজরলের চিঠি


ফজিলাতুন্নেছা কে না পাওয়ার ব্যথায় বেদনা ভেজা বহিঃপ্রকাশ

১৫ জুলিয়াটোলা স্ট্রীট,
কলিকাতা
০৮-০৩-২৮
সন্ধ্যা


প্রিয় মতিহার,

পরশু বিকালে এসেছি কোলকাতা। ওপরের ঠিকানাই আছে। ওর আগেই আসবার কথা ছিলো, অসুখ বেড়ে ওঠায় আসতে পারিনি । দু-চারদিন এখানেই আছি। মনটা কেবলই পালাই পালাই করছে। কোথায় যাই, ঠিক করতে পারছিনে। হঠাৎ কোনোদিন এক জায়গায় চলে যাবো। অবশ্য দু-দশদিনের জন্য। যেখানেই যাই, আর কেউ না পাক; তুমি খবর পাবে।
বন্ধু, তুমি আমার চোখের জলের মতিহার, বাদল রাতের বুকের বন্ধু। যেদিন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর আর সবাই আমায় ভুলে যাবে, সেদিন অন্তত তোমার বুক বিঁধে ওঠবে। তোমার ওই ছোট্ট ঘরটিতে শুয়ে, যে ঘরে তুমি আমায় প্রিয়ার মত জড়িয়ে শুয়েছিলে; অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা নিয়ে যেতে পারবো। এই কী কম সৌভাগ্য আমার!!!

কেন এই কথা বলছি, শুনবে? বন্ধু আমি পেয়েছি। যার সাক্ষাত আমি নিজেই গুণতে পারবো না! এরা সবাই আমার হাসির বন্ধু, গানের বন্ধু, ফুলের সওদার খরিদ্দার এরা। এরা অনেকেই আমার আত্মীয় হয়ে উঠেছে, প্রিয় হয়ে ওঠেনি কেউ। আমার জীবনের সবচেয়ে করুণ পাতাটির লিখা তোমার কাছে লিখে গেলাম। আকাশের সবচেয়ে যে দূরের তারাটির দীপ্তি চোখের জলকণার মত ঝিলমিল করবে, মনে কর, সেই তারাটি আমি। আমার নামেই তার নামকরণ করো, কেমন!

মৃত্যু এত করে মনে করছি কেন? জানো, ওকে আজ আমার সবচেয়ে সুন্দর মনে হচ্ছে বলে! মনে হচ্ছে, জীবনে যে আমায় ফিরিয়ে দিলে, মরলে সে আমায় বরণ করে নেবে। সমস্ত বুকটা ব্যথায় দিনরাত টন টন করছে। মনে হচ্ছে সমস্ত বুকটা যেন ঐখানে এসে জমাট বেঁধে যাচ্ছে। ওর যদি মুক্তি হয়, বেঁচে যাবো। কিন্তু কী হবে, কে জানে!

তোমার চিঠি পেয়ে অবধি কেবল ভাবছি আর ভাবছি। কত কথা, কত কী!! তার কী কূল কিনারা আছে!! ভাবছি আমার ব্যথার রক্ত কে রঙিন খেলা বলে উপহাস যে করে, তিনি হয়তো দেবতা, আমার ব্যথার অশ্রুর বহু উর্ধ্বে। কিন্তু আমি মাটির নজরুল হলেও সে দেবতার কাছে অশ্রুর অঞ্জলি আর নিয়ে যাবোনা।
ফুল ধুলায় ঝরে পড়ে, পায়ে পিষ্ট হয়; তাই বলে কী ফুল এত অনাদরে ? ভুল করে সে ফুল যদি কারোর কবরীতেই ঝরে পড়ে এবং তিনি যদি সেটাকে উপদ্রপ বলে মনে করেন, তাহলে ফুলের পক্ষে প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে, এক্ষুনি কারো পায়ের তলায় পড়ে আত্মহত্যা করা!

সুন্দরের অবহেলা আমি সইতে পারিনা বন্ধু, তাই এত জ্বালা। ভিক্ষা যদি কেউ তোমার কাছে চাইতে আসে, অদৃষ্টের বিড়ম্বনায় তাহলে তাকে ভিক্ষা নাই ই দাও, কুকুর লেলিয়ে দিওনা। আঘাত করবার একটা সীমা আছে। সেটাকে অতিক্রম করলে আঘাত অসুন্দর হয়ে আসে আর তক্ষুনি তার নাম হয় অবমাননা।

ছেলেবেলা থেকেই পথে পথে মানুষ আমি। যে স্নেহে, যে প্রেমে বুক ভরে ওঠে কানায় কানায়, তা কখনো কোথাও পাইনি।
এবার চিঠির উত্তর দিতে বড্ড দেরী হয়ে গেলো। না জানি কতো উদ্বিগ্ন হয়েছ!! কী করি বন্ধু, শরীরটা এত বেশি বেয়াড়া আর হয়নি কখনো। ওষুধ খেতে প্রবৃত্তি হয় না!
আমায় সবচেয়ে অবাক করে নিষুতি রাতের তারা। তুমি হয়ত অবাক হবে, আমি আকাশের প্রায় সব তারাগুলোকে চিনি। তাদের সত্যিকারের নাম জানিনে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের নামকরণ করেছি আমার ইচ্ছে মত। সেই কতো রকম মিষ্টি মিষ্টি নাম, শুনলে তুমি হাসবে। কোন তারা কোন ঋতুতে কোনদিকে উদয় হয়, সব বলে দিতে পারি। জেলের ভিতর যখন সলিডারি সেলে বন্দি ছিলাম, তখন গরমে ঘুম হতো না। সারারাত জেগে কেবল তারার উদয় অস্ত দেখতাম। তাদের গতিপথে আমার চোখের জল বুলিয়ে দিয়ে বলতাম, বন্ধু, ওগো আমার নাম না জানা বন্ধু! আমার এই চোখের জলের পিচ্ছিল পথটি ধরে তুমি চলে যাও অস্ত পাড়ের পানে। আমি শুধু চুপটি করে দেখি। হাতে থাকতো হাতকড়া, দেয়ালের সঙ্গে বাঁধা চোখের জলের রেখা আঁকাই থাকতো মুখে, বুকে। আচ্ছা বন্ধু, ক'ফোঁটা রক্ত দিয়ে এক ফোঁটা চোখের জল হয়? তোমাদের বিজ্ঞান বলতে পারে? এখন শুধু কেবলই জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে, যার উত্তর নেই, মীমাংসা নেই -সেই সব জিজ্ঞাসা।

যেদিন আমি ওই দূরের তারার দেশে চলে যাবো, সেদিন তাকে বলো, এই চিঠি রেখে সে যেন দু'ফোঁটা চোখের অশ্রুর দর্পণ দেয়, শুধু আমার নামে। হয়ত আমি সেদিন খুশিতে উল্কা ফুল হয়ে তার নতুন খোঁপায় ঝরে পড়বো। তাঁকে বলো, বন্ধু, তাঁর কাছে আমার আর চাওয়ার কিছুই নেই। আমি পেয়েছি, তাঁকে পেয়েছি। আমার বুকের রক্তে, চোখের জলে আমি তাঁর উদ্দেশ্যে আমার শান্ত, স্নিগ্ধ অন্তরের পরিপূর্ণ চিত্তের একটি সশ্রদ্ধ নমষ্কার রেখে গেলাম। আমি যেন শুনতে পাই, সে আমায় সর্বান্তকরণে ক্ষমা করেছে। ফুলের কাঁটা ভুলে গিয়ে তার উর্ধ্বে ফুলের গন্ধই যেন সে মনে রাখে।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে আবার লিখছি। কিন্তু আর লিখতে পারছিনে ভাই। চোখের জল, কলমের কালি দুইই শুকিয়ে গেল। তোমরা কেমন আছো, জানিয়ো। তাঁর কিছু খবর দাওনা কেন ? না কী সে এতটুকুও মানা করেছে ? ঠিক সময় মতো সে ওষুধ খায়তো ?
কেবলই কীটস্ কে স্বপ্নে দেখছি। তার পাশে দাঁড়িয়ে ফেনিব্রাউন পাথরের মত। ভালোবাসা নাও।


ইতি
তোমার নজরুল।


নার্গিসকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের চিঠি


নার্গিসকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের চিঠি


কল্যাণীয়াসু,

তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি এক বারিধারায় প্লাবন নেমেছিল, তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চার। এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে।

যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো, তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা। তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করিনা –এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি, তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না। আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণ রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত-মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের সে আগুন-বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি। তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি—অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা আমার নয় । আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন— তুমি কি জান বা শুনেছ জানিনা, তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই। তোমার আজিকার রূপ কি জানিনা। আমি জানি তোমার সেই কিশোরি মুর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলেনা। পাষাণ দেবীর মতই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদিপাঠ …জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা আরতি। আজিকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ; তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব, অধিকতর বেদনা পাব, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি। দেখা? না-ই হ’ল এ ধূলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাসো, আমাকে চাও— ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমাকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও প্রেম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারেনা। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী আর কে আছে? তারই মায়াস্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে।দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয়না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনো ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তাকে সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ংবিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতক্রম করে উর্ধ্বলোকে। সেখানে গেলে পৃথিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমা সুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা যায়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনর বছর আগের কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজো অনুভব করতে পারি। তুমি কি চিয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিলো জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুন মিনতি। মনে হয় যেন কালকের কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারল না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল। সারাদিন-রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না। যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষে রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করোনা। তোমাকে লিখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশির্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখি হও, শান্তি পাও— এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই, এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।


ইতি

নিত্য শুভার্থী- নজরুল ইসলাম


কিশোরী নাহারকে লেখা নজরুলের চিঠি


কিশোরী নাহারকে লেখা নজরুলের চিঠি


আগামীকাল ১০ এপ্রিল বেগম শামসুন নাহার মাহমুদের মৃত্যুবার্ষিকী। তার জন্ম ১৯০৮ সালে। মারা যান ১০ এপ্রিল ১৯৬৪ সালে। তিনি ছিলেন এ দেশের নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবিকা। মুসলমান সমাজে নারী শিক্ষা প্রসার ও অবরোধপ্রথা রহিত করার জন্য যারা লড়েছেন তিনি তাদের অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ছাত্রী হল শামসুন নাহার হল তার নামে নামকরণ করা হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার বেশ হৃদ্যতা ছিল। শাসছুন নাহার যখন কিশোরী তখন ১১ আগস্ট ১৯২৬ সালে নজরুল তাকে একটি চিঠি লেখেন। সে চিঠিতে নজরুলের অনেক অজানা বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়া জীবনের নানা দিকও পাওয়া যাবে সে চিঠিতে। নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে প্রকাশিত ও শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘নজরুলের পত্রাবলি’ গ্রন্থ থেকে চিঠিটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো:


স্নেহের নাহার,


কাল রাত্তিরে ফিরেছি কলকাতা হতে। চট্টগ্রাম হতে এসেই কলকাতা গেছিলাম। এসেই পড়লাম তোমার তৃতীয় চিঠি, অবশ্য তোমার ভাবীকে লেখা। আমি যেদিন তোমার প্রথম চিঠি পাই, সেদিনই তখনই কলকাতা যেতে হয় মনে করেছিলাম কলকাতা গিয়ে উত্তর দেবো। কিন্তু কলকাতার কোলাহলের মধ্যে এমনই বিস্মৃত হয়েছিলাম নিজেকে যে কিছুতেই উত্তর দেবার অবসর করে নিতে পারিনি। তাছাড়া ভাই, তুমি অত কথা জানতে চেয়েছ, শুনতে চেয়েছ, যে কলকাতার হট্টগোলের মধ্যে সে বলা যেন কিছুতেই আসত না। আমার বাণী হট্টগোলকে এখন রীতিমত ভয় করে, মূক হয়ে যায় ভীরু বাণী আমার, ওই কোলাহলের অনবকাশের মাঝে। চিঠি দিতে দেরি হল বলে তুমি রাগ করো না ভাই লক্ষ্মীটি। এবার হতে ঠিক সময়ে দেবো, দেখে নিও। কেমন? বাহারটাও না জানি কত রাগ করেছে, কী ভাবছে। আর তোমার তো কথাই নেই, ছেলেমানুষ তুমি, পড়তে না পেরে তুমি এখনো কাঁদ! বাহার যেন একটু চাপা, আর তুমি খুব অভিমানী না? কী যে করেছ তোমরা দুটি ভাই-বোনে যে এসে অবধি মনে হচ্ছে যেন কোথায় কোন নিকটতম আত্মীয়কে আমি ছেড়ে এসেছি। মনে সদাসর্বদা একটা বেদনার উদ্বেগ লেগেই রয়েছে। অদ্ভুত রহস্যভরা এই মানুষের মন! রক্তের সম্বন্ধকে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যার, সে-ই কখন পথের সম্বন্ধকে সকল হৃদয় দিয়ে অসঙ্কোচে স্বীকার করে নেয়। ঘরের সম্বন্ধটা রক্তমাংসের, দেহের, কিন্তু পথের সম্বন্ধটা হৃদয়ের অন্তরতম-জনার। তাই ঘরের যারা, তাদের আমরা শ্রদ্ধা করি, মেনে চলি, কিন্তু বাইরের আমার-জনকে ভালবাসি, তাকে না-মানার দুঃখ দিই। ঘরের টান কর্তব্যের, বাইরের টান প্রীতির মাধুর্যের। সকল মানুষের মনে সকল কালের এই বাঁধন-হারা মানুষটি ঘরের আঙিনা পেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছে। যে নীড়ে জন্মেছে এই পলাতক, সেই নীড়কেই সে অস্বীকার করেছে সর্বপ্রথম উড়তে শিখেই! আকাশ আলো কানন ফুল, এমনি সব না-চেনা জনেরা হয়ে ওঠে তার অন্তরতম। বিশেষ করে গানের পাখি যারা, তারা চিরকেলে নিরুদ্দেশ দেশের পথিক। কোকিল বাসা বাঁধে না, বৌ কথা কও;-এর বাসার উদ্দেশ্য আজও মিলল না, উহু উহু চোখ গেল; পাখির নীড়ের সন্ধান কেউ পেল না! ওদের আসা যাওয়া একটা রহস্যের মত। ওরা যেন স্বর্গের পাখি, ওদের যেন পা নেই, ধূলার পৃথিবীতে যেন ওরা বসবে না, ওরা যেন ভেসে আসা গান। তাই ওরা অজানা ব্যথার আনন্দে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দেশে বিদেশে, বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে। ওরা যেন স্বর্গের প্রতিধ্বনি টুকরা-আনন্দের উল্কাপিন্ড! সমাজ এদের নিন্দা করেছে, নীতিবাগীশ বায়স তার কুৎসিত দেহ ততোধিক কুৎসিত কণ্ঠনিয়ে এর ঘোর প্রতিবাদ করেছে, এদের শিশুদের ঠুকরে; নিকালো হিঁয়াসে; বলে তাড়িয়েছে, তবু আনন্দ দিয়েছে এই ঘর-না-মানা পতিতের দলই। নীড়-বাঁধা সামাজিক পাখিগুলি দিতে পারল না আনন্দ, আনতে পারল না স্বর্গের আভাস, সুরলোকের গান। এত কথা বললাম কেন, জান? তোমাদের যে পেয়েছি এই আনন্দটাই আমায় এই কথা কওয়াচ্ছে, গান গাওয়াচ্ছে। বাইরের পাওয়া নয়, অন্তরের পাওয়া। গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা কুসুম-ফোটা বসন্তই পাখিকে গান-গাওয়ায়, ফল-পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়। তখনো পাখি হয়ত গায়, কিন্তু ফুল যে সে ফুটতে দেখেছিল, গন্ধ সে তার পেয়েছিল গায় সে সেই আনন্দে, ফল পাকার লোলুপতায় নয়। ফুল ফুটলে পায় গান, কিন্তু ফল পাকলে পায় ক্ষিদে; আমি পরিচয় করার অনন্ত ঔৎসুক্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানুষের মাঝে, কিন্তু ফুল-ফোটা মন মেলে না ভাই, মেলে শুধু ফল-পাকার ক্ষুধাতুর মন। তোমাদের মধ্যে সেই ফুল-ফোটানো বসন্ত, গান-জাগানো আলো দেখেছি বলেই আমার এত আনন্দ, এত প্রকাশের ব্যাকুলতা। তোমাদের সাথে পরিচয় আমার কোন প্রকার স্বার্থের নয়, কোন দাবির নয়। ঢিল মেরে ফল পাড়ার অভ্যেস আমার ছেলেবেলায় ছিল, যখন ছিলাম ডাকাত, এখন আর নেই। ফুল যদি কোথাও ফোটে, আলো যদি কোথাও হাসে সেখানে আমায় গান গাওয়ায় পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম এবার চট্টলায়, তাই গেয়েছি গান। ওর মাঝে শিশিরের করুণা যেটুকু, সেটুকু আমার আর কারুর নয়। যাক, কাজের কথাগুলো বলে নিই আগে। আমায় এখনও ধরেনি, তার প্রমাণ এই চিঠি। তবে আমি ধরা দেওয়ার দিকে হয়তো এগোচ্ছি। ধরা পড়া আর ধরা দেওয়া এক নয়, তা হয়তো বোঝ। ধরা দিতে চাচ্ছি, নিজেই এগিয়ে চলেছি শত্রু-শিবিরের দিকে, এর রহস্য হয়তো বলতে পারি। এখন বলব না। অত বিপুল যে সমুদ্র, তারও জোয়ারভাটা আসে অহোরাত্রি। এই জোয়ার-ভাটা সমুদ্রেই খেলে, আর তার কাছাকাছি নদীতে; বাঁধ-বাঁধা ডোবায়, পুকুরে জোয়ার-ভাটা খেলে না। মানুষের মন সমুদ্রের চেয়েও বিপুলতর। খেলবে না তাতে জোয়ার-ভাটা! যদি না খেলে, তবে তা মানুষের মন নয়। ঐ শান-বাঁধানো ঘাট-ভরা পুকুরগুলোতে কাপড় কাঁচা চলে, ইচ্ছে হলে গলায় কলসি বেঁধে ডুবে মরাও চলে, চলে না ওতে জাহাজ, দোলে না ওতে তরঙ্গ দোলা, খেলে না ওতে জোয়ার-ভাটা; আমি একবার অন্তরের পানে ফিরে চলতে চাই, যেখানে আমার গোপন সৃষ্টি-কুঞ্জ, যেখানে আমার অনন্ত দিনের বধূ আমার জন্য বসে মালা গাঁথছে। যেমন করে সিন্ধু চলে ভাটিয়ালি টানে, তেমনি করে ফিরে যেতে চাই গান-শ্রান্ত ওড়া-ক্লান্ত আমি। আবার অকাজের কথা এসে পড়ল। পুষ্প-পাগল বনে কাজের কথা আসে না, গানের ব্যথাই আসে, আমায় দোষ দিও না। অগ্নিবীনা বেঁধে দিতে দেরি করছে দফতরি, বাঁধা হলেই অন্যান্য বই ও অগ্নিবীনা পাঠিয়ে দেবো একসাথে। ডি. এম. লাইব্রেরিকে বলে রেখেছি। আর দিন দশকের মধ্যেই হয়তো বই পাবে। আমার পাহাড়ে ও ঝর্ণাতলে তোলা ফটো একখানা করে পাঠিয়ে দিও। গ্রুপের ফটো একখানা (যাতে হেমন্তবাবু ও ছেলেরা আছে), আমি, বাহার ও অন্য কে একটি ছেলেকে নিয়ে তোলা যে ফটো তার একখানা এবং আমি ও বাহার দাঁড়িয়ে তোলা ফটোর একখানা পাঠিয়ে দিও আমায়। ফটোর সব দাম আমার বই বিক্রির টাকা হতে কেটে নিও। এখন আবার কোনদিকে উড়ব, ঠিক নেই কিছু। যদি না ধরে কোথাও হয়তো যাব, গেলে জানাব। এখন তোমার চিঠিটার উত্তর দিই। তোমার চিঠির উত্তর তোমার ভাবীই দিয়েছে শুনলাম। আরও শুনলাম, সে নাকি আমার নামে কতগুলো কী সব লিখেছে তোমার কাছে। তোমার ভাবীর কথা বিশ্বাস করো না। মেয়েরা চিরকাল তাদের স্বামীদের নির্বোধ মনে করে এসেছে। তাদের ভুল, তাদের দুর্বলতা ধরতে পারা এবং সকলকে জানানোই যেন মেয়েদের সাধনা। তুমি কিন্তু নাহার, রেগো না যেন। তুমি এখনও ওদের দলে ভিড়নি। মেয়েরা বড্ড অল্পবয়সে বেশি প্রভুত্ব করতে ভালবাসে। তাই দেখি, বিয়ে হবার এক বছর পর ষোল-সতের বছর বয়সেই মেয়েরা হয়ে ওঠে গিনি্ন। তাঁরা যেন কাজে-অকাজে, কারণে-অকারণে-স্বামী বেচারিকে বকতে পারলে বেঁচে যায়। তাই সদাসর্বদা বেচারা পুরুষের পেছনে তারা লেগে থাকে গোয়েন্দা পুলিশের মত। এই দেখ না ভাই, ছটাকখানেক কালি ঢেলে ফেলেছি চিঠি লিখতে লিখতে একটা বই-এর ওপর, এর জন্য তোমার ভাবীর কী তম্বিহ কী বকুনি। তোমার ভাবী বলে নয়, সব মেয়েই অমনি। স্ত্রীদের কাছে স্বামীরা হয়ে থাকে একেবারে বেচারাম লাহিড়ী। একটা কথা আগেই বলে রাখি, তোমার কাছে চিঠি লিখতে কোন সঙ্কোচের আড়াল রাখিনি। তুমি বালিকা এবং বোন বলে তার দরকার মনে করিনি। যদি দরকার মনে কর, আমায় মনে করিয়ে দিও। আমি এমন মনে করে চিঠি লিখিনি, যে কোন পুরুষ কোন মেয়েকে চিঠি লিখছে। কবি লিখছে চিঠি তার প্রতি শ্রদ্ধান্বিতা কাউকে, এই মনে করেই চিঠিটা নিও। চিঠি লেখার কোথাও কোন ত্রুটি দেখলে দেখিয়ে দিও। আ। আমার উচিত আদর করতে পারনি লিখেছ, আর তার কারণ দিয়েছ, পুরুষ নেই কেউ বাড়িতে এবং অসচ্ছলতা। কথাগুলোয় সৌজন্য প্রকাশ করে খুব বেশি, কিন্তু ওগুলো তোমাদের অন্তরের কথা নয়। কারণ, তোমরাই সবচেয়ে বেশি জান যে তোমরা যা আদর-যত্ন করেছ আমার, তার বেশি করতে কেউ পারে না। তোমরা তো আমার কোথাও ফাঁক রাখনি আমার শূন্যতা নিয়ে অনুযোগ করবার। তোমরা আমার মাঝে অভাবের অবকাশ তো দাওনি তোমাদের অভাবের কথা ভাববার; এ আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আমি সহজেই সহজ হতে পারি সকলের কাছে, ওটা আমার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, কিন্তু তোমাদের কাছে যতটা সহজ হয়েছি অতটা সহজ বুঝি আর কোথাও হইনি। সত্যি নাহার আমায় তোমরা আদর-যত্ন করতে পারনি বলে যদি সত্যিই কোন সঙ্কোচের কাঁটা থাকে তোমাদের মনে, তবে তা অসঙ্কোচে তুলে ফেলবে মন থেকে। অতটা হিসেব-নিকেশ করবার অবকাশ আমার মনে নেই, আমি থাকি আপনার মন নিয়ে আপনি বিভোর। মানুষের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে বলতেও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, খেই হারিয়ে ফেলি কথার। আমার গোপনতম কে যেন একেবারে নিশ্চুপ হয়ে থাকতে আদেশ করে। আর আর্থিক অসচ্ছলতার কথা লিখেছ। অর্থ দিয়ে মাড়োয়ারীকে, জমিদার মহাজনকে বা ভিখিরিকে হয়তো খুশি করা যায়, কবিকে খুশি করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের পুরস্কার কবিতাটি পড়েছ? ওতে এই কথাই আছে। কবি রাজ-দরবারে গিয়ে রাজাকে মুগ্ধ করে রাজপ্রদত্ত মণি-মাণিক্যের বদলে চাইলে রাজার গলার মালাখানি। কবি লক্ষ্মীর প্যাঁচার আরাধনা কোন কালে করেনি, সরস্বতীর শতদলেরই আরাধনা করেছ তাঁর পদ্মগন্ধে বিভোর হয়ে শুধু গুন্ গুন্ করে গান করেছে আর করেছে। লক্ষ্মীর ঝাঁপির কড়ি দিয়ে কবিকে অভিবন্দনা করলে কবি তাতে অখুশি হয়ে ওঠে। কবিকে খুশি করতে হলে দিতে হয় অমূল্য ফুলের সওগাত। সে সওগাত তোমরা দিয়েছ আমায় অঞ্জলি পুরে। কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা। কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় সুন্দর যা তাই দিয়ে। রূপার দাম আছে বলেই রূপা অত হীন; হাটে-বাজারে মুদির কাছে, বেনের কাছে ওজন হতে হতে ওর প্রাণান্ত ঘটল; রূপের দাম নেই বলেই রূপ এত দুর্মূল্য, রূপ এত সুন্দর, এত পূজার! রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে। রূপের হাটের বেচা-কেনা অদ্ভুত। যে যত অমনি যে যত বিনা দামে কিনে নিতে পারে, সে তত বড় রূপ-রসিক সেখানে। কবিকে সম্মান দিতে পারনি বলে মনে যদি করেই থাক, তবে তা মুছে ফেল। কোকিল পাপিয়াকে বাড়িতে ডেকে ঘটা করে খাওয়াতে পারনি বলে তারা তো অনুযোগ করেনি কোনদিন। সে কথা ভাবেও নি কোনদিন তারা। তারা তাই বলে তোমার বাতায়নের পাশে গান গাওয়া বন্ধ করেনি। তাছাড়া কবিকে হয়তো সম্মান করা যায় না কাব্যকে সম্মান করা যায়। তুমি হয়তো বলবে, গাছের যত্ন না নিলে ফুল দেয় না। কিন্তু সে যত্নেরও তো ত্রুটি হচ্ছে না। অনাত্মীয়কে লোকে সম্বর্ধনা করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে; বন্ধুকে গ্রহণ করে হাসি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে। উপদেশ আমি তোমায় দিইনি। যদি দিয়ে থাকি, ভুলে যেয়ো। উপদেশ দেওয়ার চাণক্য আমি নই। দিয়েছি তোমার অনাগত বিপুল সম্ভানাকে অঞ্জলি তোমার মাঝের অপ্রকাশ সুন্দরকে প্রকাশ-আলোতে আসার আহ্বান জানিয়েছি শঙ্খধ্বনি করে। উপদেশের ঢিল্ ছুঁড়ে তোমার মনে বনের পাখিকে উড়িয়ে দেবার নির্মমতা আমার নেই, এ তুমি ধ্রুব জেনো। আমি ফুল-ঝরা দিয়ে হাসাই, শাখার মার দিয়ে কাঁদাই নে। তোমায় লিখতে বলেছি, আজও বলছি লিখতে। বললেই যে লেখা আসে, তা নয়। কারুর বলা যদি আনন্দ দেয়, তবে সেই আনন্দের বেগে সৃষ্টি হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে। তোমরা আমায় বলেছ লিখতে। সে-বলা আমায় আনন্দ দিয়েছে, তাই সৃষ্টির বেদনাও জেগেছে অন্তরে। তোমাদের আলোর পরশে শিশিরের ছোঁওয়ায় আমার মনের কুঁড়ি বিকচ হয়ে উঠেছে। তাই চট্টগ্রামে লিখেছি। নইলে তোমরা বললেই লেখা আসত না। তোমার মনের সুন্দর যিনি, তিনি যদি খুশি হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই খুশিই তোমায় লিখতে বসাবে। আমার বলা তোমার সেই মনের সুন্দরকে অঞ্জলি দেওয়া। বলেছি, অঞ্জলি দিয়েছি। তিনি খুশি হয়ে উঠেছেন কিনা তুমি জান। তুমি আজও অনেকখানি বালিকা। তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস, যে আনন্দ, যে ব্যথা সৃষ্টি জাগায়, সেই উচ্ছ্বাস, সেই আনন্দ, সেই ব্যথা তোমার জীবনে আসার এখনো অনেক দেরি। তাই সৃষ্টি তোমার আজও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল না। তার জন্য অপেক্ষা করবার ধৈর্য্য অর্জন করো। তরুর শাখায় আঘাত করলে সে ফুল দেবে না, যখন দেবে সে আপনি দেবে। আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে। ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী করে রেখেছে। এত বিপুল বাহির যাদের চায়, তাদের ঘিরে রেখেছে বারো হাত লম্বা আটহাত চওড়া দেওয়াল। বাহিরের আঘাত এ দেওয়ালে বারে বারে প্রতিহত হয়ে ফিরল। এর বুঝি ভাঙন নেই অন্তর হতে মার না খেলে। তাই নারীদের বিদ্রোহিনী হতে বলি। তারা ভেতর হতে দ্বার চেপে ধরে বলছে আমরা বন্দিনী। দ্বার খোলার দুঃসাহসিকা আজ কোথায়? তাকেই চাইছেন যুগদেবতা। দ্বার ভাঙার পরুষতার নারীদের প্রয়োজন নেই, কারণ তাদের দ্বার ভিতর হতে বন্ধ, বাহির হতে নয়। তোমারও যে কী হবে বলতে পারিনে। তার কারণ তোমায় চিনলেই তো চলবে না, তোমায় চালাবার দাবি নিয়ে জন্মেছেন যারা তাদের আজও চিনিনি। আমার কেন যেন মনে হলো বাহার তোমার অভিভাবক নয়। ভুল যদি না করে থাকি, তাহলেই মঙ্গল। অভিভাবক যিনিই হন তোমার, তিনি যেন বিংশ শতাব্দীর আলোর ছোঁয়া পাননি বলেই মনে হল। তোমায় যে আজ কাঁদতে হয় বসে বসে কলেজে পড়তে যাবার জন্য, এও হয়তো সেই কারণেই। মিসেস আর এস. হোসেনের মত অভিভাবিকা পাওয়া অতি বড় ভাগ্যের কথা। তাঁকেও যখন তাঁরা স্বীকার করে নিতে পারলেন না, তখন তোমার কী হবে পড়ার, তা আমি ভাবতে পারি নে! তোমার আর বাহারের ওপর আমার দাবি আছে স্নেহ করার দাবি, ভালবাসার দাবি, কিন্তু তোমার অভিভাবকদের ওপর তো আমার দাবি নেই। তবুও ওপর-পড়া হয়ে অনেক বলেছি এবং তা হয়তো তোমার আম্মা ও নানী সাহেবাও শুনেছেন। বিরক্তও হয়েছেন হয়তো। আলোর মত, শিশিরের মত আমি তোমার অন্তরের দলগুলি খুলিয়ে দিতে পারি হয়তো, দ্বারের অর্গল খুলি কি করে? তুমি আমার সামনে আসতে পারনি বলে আমার কোনরূপ কিছু মনে হয়নি। তার কারণ, আমি তোমাকে দেখেছি এবং দেখতে চাই লেখার মধ্য দিয়ে। সেই হল সত্যিকার দেখা। মানুষ দেখার কৌতূহল আমার নেই, স্রষ্টা দেখার সাধনা আমার। সুন্দরকে দেখার তপস্য আমার। তোমার প্রকাশ দেখতে চাই আমি, তোমায় দেখতে চাইনে। সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে যে দেখেছে, সেই বড় দেখা দেখেছে। এই দেখা আর্টিস্টের দেখা, ধেয়ানীর দেখা, তপস্বীর দেখা। আমার সাধনা অরূপের সাধনা। সাত সমুদ্দুর তের নদীর পারের যে রাজকুমারীর বন্দিনী সেই রূপকথার অরূপাকে মায়া,- নিদ্রা হতে জাগাবার দুঃসাহসী রাজকুমার আমি। আমি সোনার কাঠির সন্ধান জানি যে সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বন্দিনী উঠবে জেগে, রূপার কাঠির মায়ানিদ্রা যাবে টুটে, আসবে তার আনন্দের মুক্তি। যে চোখের জল বুকের তলায় আটকে আছে, তাকে মুক্তি দেওয়ার ব্যথা-হানা আমি। মানস সরোবরের বদ্ধ জলধারাকে শুভ শঙ্খধ্বনি করে নিয়ে চলেছি কবি আমি ভগীরথের মত। আমার পনের আনা রয়েছে স্বপ্নে বিভোর, সৃষ্টির ব্যথায় ডগমগ, আর এক আনা করছে পলিটিক্স, দিচ্ছে বক্তৃতা, গড়ছে সঙ্ঘ। নদীর জল চলছে সমুদ্রের সাথে মিলতে, দুধারে গ্রাম সৃষ্টি করতে নয়। যেটুকু জল তার ব্যয় হচ্ছে দুধারের গ্রামবাসীদের জন্য, তা তার এক আনা। বাকি পনের আনা গিয়ে পড়ছে সমুদ্রে। আমার পনের আনা চলেছে আর চলেছে সৃষ্টি-দিন হতে আমার সুন্দরের উদ্দেশ্যে। আমার যত বলা আমার সেই বিপুলতরকে নিয়ে, আমার সেই প্রিয়তম, সেই সুন্দরতমকে নিয়ে। তোমাকেও বলি, তোমার তপস্যা যেন তোমার সুন্দরকে নিয়েই থাকে মগ্ন। তোমার চলা, তোমার বলা যেন হয় তোমার সুন্দরের উদ্দেশে, তাহলে তোমায় প্রয়োজনের বাঁধ দিয়ে কেউ বাঁধতে পারবে না। তোমার অন্তরতমকে ধ্যান কর তোমার বলা দিয়ে। বাধা যেন তোমার ভিতর দিক থেকে জমা না হয়ে ওঠে। এক কাজ করতে পার, নাহার? তোমার সকল কথা আমায় খুলে বলতে পার? কী তোমার ব্রত, কী তোমার সাধনা এই কথা। আমার কাছে সঙ্কোচ করো না। আমি তাহলে তোমার গতির উদ্দেশ পাব, আর সেই রকম করে তোমায় গড়ে উঠবার ইশারা দিতে পারব। আমি অনেক পথ চলেছি, পথের ইঙ্গিত হয়তো দিতে পারব। তাই বলে আমি পথ চালাব, এ ভয় করো না। বড় বড় কবির কাব্য পড়া এই জন্য দরকার যে তাতে কল্পনার জট খুলে যায়, চিন্তার বদ্ধ ধারা মুক্তি পায়। মনের মাঝে প্রকাশ করতে না পারার যে উদ্বেগ, তা সহজ হয়ে ওঠে। মাটির মাঝে যে পত্র-পুষ্পের সম্ভাবনা, তা বর্ষণের অপেক্ষা রাখে। নইলে তার সৃষ্টি-বেদনা মনের মাঝেই গুমরে মরে। আমার কাছে দামি কথা শুনতে চেয়েছ। দামি কথার জুয়েলার আমি নই। আমি ফুলের বেসাতি করি। কবি বাণীর কমল-বনের বনমালী। সে মালা গাঁথে, সে মণি-মাণিক্য বিক্রি করে না। কবি কথাকে দামি করতে পারে না, সুন্দর করতে পারে। বৌ কথা কও যে কথা কয়, কোকিল যে কথা কয় তার এক কানাকড়ি দাম নেই। ওরা দামি কথা বলতে জানে না। ওদের কথা শুধু গান। তাই বুদ্ধিমান লোক তোতাপাখি পোষে, ময়না পাখি পোষে, ওরা ওদের রোজ রাধা কেষ্ট বুলি শোনায়। আমরা যা বলি, তার মানেও নেই, দামও নেই। তোমায় বুদ্ধিমান লোকের দলের জানিনে বলে এত বকে যাচ্ছি। শুনতে যদি ভাল না লাগে জানিয়ো, সাবধান হব। আমার জীবনের ছোট-খাট কথা জানতে চেয়েছ। বড় মুশকিল কথা ভাই। আমার জীবনের যে বেদনা, যে রং তা আমার লেখায় পাবে। অবশ্য লেখার ঘটনাগুলো আমার জীবনের নয়, লেখার রহস্যটুকু আমার, ওর বেদনাটুকু আমার। ঐখানেই তো আমার সত্যিকার জীবনী লেখা রয়ে গেল। জীবনের ঘটনা দিয়ে কৌতুক অনুভব করতে পার। কিন্তু তা দিয়ে আমাকে চিনতে পারবে না। সূর্যের কিরণ আসলে সাতটা রং রামধনুতে যে রং প্রতিফলিত হয়। কিন্তু সূর্য যখন ঘোরে, তখন তাকে দেখি আমরা শুভ্র জ্যোতির্ময় রূপে। সূর্যের চলাটা প্রতারণা করে আমাদের চোখকে তার বুকের রং দেখতে দেয় না সে। কিন্তু ইন্দ্রধনু যখন দেখি, ওতেই দেখতে পাই ওর গোপন প্রাণের রং। ইন্দ্রধনু যেন সূর্যের লেখা কাব্য। মানুষের জীবনই মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রতারণা করে। রাধা ভালবেসেছিল কৃষ্ণকে নয়, কৃষ্ণের বাঁশিকে। তোমরাও ঠিক ভালবাস আমাকে নয় আমার সুরকে, আমার কাব্যকে। সে তো তোমাদের সামনেই রয়েছে। আবার আমায় নিয়ে কেন টানাটানি, ভাই? সূর্যের কিরণ আলো দেয়, কিন্তু সূর্য নিজে হচ্ছে দগ্ধ দিবানিশি। ওর কাছে যেতে যে চায় সেও হয় দগ্ধীভূত। আলো সওয়া যায়, শিখা সওয়া যায় না। আমি জ্বলছি শিখার মতো, আপনার আনন্দে আপনি জ্বলছি, কাছে এলে তা দেয় দাহ, দূর হতে দেয় আলো। তোমাদের কাছে ছিলাম যে-আমি, সেই-আমি আর চিঠির-আমি কি এক? তোমরা কবিকে জানতে চাও, না নজরুল ইসলামকে জানতে চাও, তা আগে জানিও; তাহলে আমি এর পরের চিঠিতে একটু একটু করে জানাব তার কথা। চাঁদ জোছনা দেয়, কথা কয় না বহু চকোর-চকোরীর সাধ্য-সাধনাতেও না। ফুল মধু দেয়, গন্ধ দেয়, কথা কয় না বহু ভ্রমরার সাধ্য সাধনাতেও না। বাঁশি কাঁদে, যখন গুণীর মুখে তার মুখে চুমোচুমি হয়; বাকি সময়টুকু সে এক কোণে নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকে। একই ঝড়ের বাঁশ ভাগ্যদোষে বা গুণে কেউ হয়ে ওঠে লাঠি, কেউ হয় বাঁশি। বীণা কত কাঁদে, কথা কয় গুণীর কোলে শুয়ে, বাকি সময়টুকু তার খোলের মধ্যে আপনাকে হারিয়ে সে নিষ্পন্দিত হয়ে থাকে। গানের পাখি, তাকে গানের কথাই জিজ্ঞাসা কর, নীড়ের কথা জিজ্ঞাসা করো না। নিজেই বলতে পারবে না যে, কোথায় ছিল তার নীড়। জন্ম নিয়ে গান শিখে উড়ে যাবার পর নীড়টার মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস আর তার কাছে নেই। নীড়ের পাখি তখন বনের পাখি হয়ে ওঠে। গুরুদেব বলেছেন, ফসল কেটে নেবার পর মাঠটার মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস আর নেই। তবু সেই অপ্রয়োজনের যদি প্রয়োজন অনুভব করে তোমাদের কৌতুক, তবে জানিয়ো। চিঠি লিখছি আর গাচ্ছি একটা নতুন লেখা গানের দুটো চরণ:


"হে ক্ষণিকের অতিথি,
এলে প্রভাতে কারো চাহিয়া
ঝরা শেফালির পথ বাহিয়া।
কোন্ অমরার বিরহি
নীরে চাহনি ফিরে,
কার বিষাদের শিশির-
নীরে এলে নাহিয়া।"

কবির আসা ঐ শেফালির পথ বেয়ে আসা। কার বিষাদের শিশির-জলে নেয়ে আসে তা সে জানে না। তার নিজের কাছেই সে একটা বিপুল রহস্য। আমার লেখা কবিতাগুলো চেয়েছ। হাসি পাচ্ছে খুব কিন্তু। কী ছেলে-মানুষ তোমরা দুটি ভাই বোন। যে-খন্তা নিয়ে মাটি খোঁড়ে মালী, সেটারও যে দরকার পড়ে ফুলবিলাসীর, এ আমার জানা ছিল না। যে পাতার কোলে ফুল ফোটে, সে-পাতা কেউ চায় না, এই আমি জানতাম। মালা গাঁথা হবার পর ফুল-রাখা পদ্ম-পাতাটার কোন দরকার থাকে, এও একটা খুব মজার কথা, না? যাক্, চেয়েছো দেবো। তবে এ পল্লব শুকিয়ে উঠবে দুদিন পরে, থাকবে যা তা ফুলের গন্ধ। তাছাড়া অত কবিতাই বা লিখব কোত্থেকে যে খাতা ভর্তি করে দেবো। বসন্ত তো সব সময় আসে না। শাখার রিক্ততাকে যে ধিক্কার দেয়, সে অসহিষ্ণু; ফুল ফোটার জন্যে অপেক্ষা করতে জানে যে, সে-ই ফুল পায়। যে অসহিষ্ণু চলে যায়, সে তো পায় না ফুল, তার ডালা চিরশূন্য রয়ে যায়। তোমাদের ছায়া-ঢাকা, পাখি-ডাকা দেশ, তোমাদের সিন্ধু পর্বত গিরিদরী-বন আমায় গান গাইয়েছিল। তোমাদের শোনার আকাঙ্ক্ষা আমায় গান গাইয়েছিল। রূপের দেশ ছাড়িয়ে এসেছি এখন রূপেয়ার দেশে, এখানে কি গান জাগে? বীণাপাণির রূপের কমল এখানকার বাস্তবতার কঠোর ছোঁয়ায় রূপার কমল হয়ে উঠেছে। কমলবনের বীণাপাণী ঢুকেছেন এখানের মাড়োয়ারী মহলে। ছাড়া যেদিন পাবেন, আসবেন তিনি আমার হৃদকমলে। সেদিনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই আমার। আমার কবিতার উৎস-মুখের সন্ধান চেয়েছ। তার সন্ধান যতটুকু জানি নিজে দেখিয়ে দেবো। আর কিছু লিখবার অবসর নেই আজ। মানস-কমলের গন্ধ পাচ্ছি যেন, কেমন যেন নেশা ধরছে; বোধ হয় বীণাপাণি তার চরণ রেখেছেন এসে আমার অন্তর-শতদলে। এখন চললাম ভাই। চিঠি দিও আমার আশীস্ নাও।


ইতি,
তোমার নুরুদা


পুনশ্চ,
তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়ে এসেছি, সে সব ভুলে যেও। তোমার আম্মা ও নানী সাহেবার পাক কদমানে হাজার হাজার আদাব জানাবে আমার। শামসুদ্দিন ও অন্যান্য ছেলেদেরে স্নেহাশিস জানাবে। তুমি কি বই পড়লে এর মধ্যে বা পড়ছ, কি কি লিখলে, সব জানাবে। তোমার লেখাগুলো আমায় আজই পাঠিয়ে দেবে চিঠি দিতে দেরি করো না। কালিকলম পেয়েছ বোধ হয়। তোমায় পাঠানো হয়েছে। তোমার লেখা চায় তারা। নুরুদা...


ঈশ্বর কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ঈশ্বর
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
                          হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়-
তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘ প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
                          উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।


নারী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


নারী
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই-
              আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
              বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
              অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
              বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
              অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
              নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
              তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
              অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
              ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
              এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
              নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
              তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল,
              অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
              জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
              সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
              পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ!
              দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
              পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
              শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
              নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
              নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
              ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
              নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
              নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
              যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
              নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
              জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
              জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
              মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
              কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
              কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
              কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
              বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
              কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
              প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
              রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
              রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

পুরুষ হৃদয়-হীন,
              মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
              ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
              বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
              খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
              লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
              নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
              দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
              অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
              বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!

তিনি নর-অবতার-
              পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
              পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
              নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
সে যুগ হয়েছে বাসি,
              যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
              বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
              কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
              নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
              আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
যুগের ধর্ম এই-
              পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

শোনো মর্ত্যের জীব!
              অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
              স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
              করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
              আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
              আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
              চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
              মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
              যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
              দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

ধরার দুলালী মেয়ে,
              ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
              কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
              ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
              সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
              মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
              ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
              আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
              পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
              লুটায়ে পড়িবে ও চরন-তলে দলিত যমের সাথে!
              এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
              যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
সেদিন সুদূর নয়-
              যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!


মানুষ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


গাহি সাম্যের গান-
                মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্‌ ।
                নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
                সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- 
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
                ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’
                স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
                দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
                জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
                ডাকিল পান’, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন!’
                সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
                তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
                ভুখারী ফুকারি’ কয়,
                ‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
                মসজিদে কাল শির্‌নী আছিল,-অঢেল গোস–র”টি
                বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি,
                এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্‌
                বলে, ‘বাবা, আমি ভূখা-ফাকা আমি আজ নিয়ে সাত দিন!’
                তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা-‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
                ভূখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
                ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা
                সোজা পথ দেখ!’ গোস–র”টি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
                ভুখারী ফিরিয়া চলে, চলিতে চলিতে বলে-
                ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
                আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে বন্ধ করনি প্রভু।
                তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
                মোল্লা-পুর”ত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
                কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
                ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
                খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
                সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
                তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
                ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
                ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন’ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
                যাহারা আনিল গ্রন’-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
                পূজিছে গ্রন’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
                মানুষ এনেছে গ্রন’;-গ্রন’ আনেনি মানুষ কোনো।
                আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
                কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
                আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
                তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
                আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
                কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
                হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
                আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
                হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
                কে জানে কাহার অন- ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
                কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
                হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!
                অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উ”চ নহে,
                আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
                তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন’ ভজনালয়
                ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
                হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
                জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
                যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
                আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
                ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
                ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
                আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
                তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
                রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
                হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
                দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
                যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
                তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।
                দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
                তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
                তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
                দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
                কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!

                বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
                নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
                মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
                তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
                তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
                তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!
তোমারি কামনা-রাণী
                যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।


পাপ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


পাপ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই!-
                   যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।
                   এ পাপ-মুলুকে পাপ করেনি করেনিক’ কে আছে পুরুষ-নারী?
                   আমরা ত ছার; পাপে পঙ্কিল পাপীদের কাণ্ডারী! 
                   তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,
                   দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল!
                   আদম হইতে শুরু ক’রে এই নজরুল তক্‌ সবে
                   কম-বেশী ক’রে পাপের ছুরিতে পুণ্য করেছে জবেহ্‌ !
বিশ্ব পাপস্থান
                   অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্‌!
থর্মান্ধরা শোনো,
                   অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!
                   পাপের পঙ্কে পুণ্য-পদ্ম, ফুলে ফুলে হেথা পাপ!
                   সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ।
                   এদের এড়াতে না পারিয়া যত অবতার আদি কেহ
                  পুণ্যে দিলেন আত্মা ও প্রাণ, পাপেরে দিলেন দেহ।
বন্ধু, কহিনি মিছে,
                  ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব হ’তে ধ’রে ক্রমে নেমে এস নীচে-
                  মানুষের কথা ছেড়ে দাও, যত ধ্যানী মুনি ঋষি যোগী
                  আত্মা তাঁদের ত্যাগী তপস্বী, দেহ তাঁহাদের ভোগী!
এ-দুনিয়া পাপশালা,
                  ধর্ম-গাধার পৃষ্ঠে এখানে শূণ্য-ছালা!

হেথা সবে সম পাপী,
                  আপন পাপের বাট্‌খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!
                  জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
                  টুপি প’রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।
                  পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?
                  পুলিশী পোশাক পরিয়া হ’য়েছ পাপের আসামী গুম।

বন্ধু, একটা মজার গল্প শোনো,
                 একদা অপাপ ফেরেশতা সব স্বর্গ-সভায় কোনো
                 এই আলোচনা করিতে আছিল বিধির নিয়মে দুষি,’
                 দিন রাত নাই এত পূজা করি, এত ক’রে তাঁরে তুষি,
                 তবু তিনি যেন খুশি নন্‌-তাঁর যত স্নেহ দয়া ঝরে
                 পাপ-আসক্ত কাদা ও মাটির মানুষ জাতির’ পরে!
                 শুনিলেন সব অন্তর্যামী, হাসিয়া সবারে ক’ন,-
                 মলিন ধুলার সন-ান ওরা বড় দুর্বল মন,
                 ফুলে ফুলে সেথা ভুলের বেদনা-নয়নে , অধরে শাপ,
                 চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ!
                সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রেনীতে চন্দ্রহার,
                চরণে লাক্ষা, ঠোটে তাম্বুল, দেখে ম’রে আছে মার!
                প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান,
                বুকে বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।

                দেবদুত সব বলে, ‘প্রভু, মোরা দেখিব কেমন ধরা,
                কেমনে সেখানে ফুল ফোটে যার শিয়রে মৃত্যু-জরা!’
                কহিলেন বিভু-‘তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ যে দুইজন
                যাক্‌ পৃথিবীতে, দেখুক কি ঘোর ধরণীর প্রলোভন!’
                ‘হারুত’ ‘মারুত’ ফেরেশতাদের গৌরব রবি-শশী
                ধরার ধুলার অংশী হইল মানবের গৃহে পশি’।
                কায়ায় কায়ায় মায়া বুলে হেথা ছায়ায় ছায়ায় ফাঁদ,
                কমল-দীঘিতে সাতশ’ হয়েছে এই আকাশের চাঁদ!
                শব্দ গন্ধ বর্ণ হেথায় পেতেছে অরূপ-ফাঁসী,
               ঘাটে ঘাটে হেথা ঘট-ভরা হাসি, মাঠে মাঠে কাঁদে বাঁশী!
               দুদিনে আতশী ফেরেশতা প্রাণ- ভিজিল মাটির রসে,
               শফরী-চোখের চটুল চাতুরী বুকে দাগ কেটে বসে।
               ঘাঘরী ঝলকি’ গাগরী ছলকি’ নাগরী ‘জোহরা’ যায়-
               স্বর্গের দূত মজিল সে-রূপে,  বিকাইল রাঙা পা’য়!
               অধর-আনার-রসে ডুবে গেল দোজখের নার-ভীতি,
               মাটির সোরাহী মস-ানা হ’ল আঙ্গুরী খুনে তিতি’!
               কোথা ভেসে গেল-সংযম-বাঁধ, বারণের বেড়া টুটে,
               প্রাণ ভ’রে পিয়ে মাটির মদিরা ওষ্ঠ-পুষ্প-পুটে।
               বেহেশ্‌তে সব ফেরেশ্‌তাদের বিধাতা কহেন হাসি’-
              ‘হার”ত মার”তে কি ক’রেছে দেখ ধরণী সর্বনাশী!’
               নয়না এখানে যাদু জানে সখা এক আঁখি-ইশারায়
               লক্ষ যুগের মহা-তপস্যা কোথায় উবিয়া যায়।
সুন্দরী বসুমতী
              চিরযৌবনা, দেবতা ইহার শিব নয়-কাম রতি!


বারাঙ্গনা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


বারাঙ্গনা
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
না-ই হ’লে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;
তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি;
আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে,
তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে।-
স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী-পুত্র হ’ল মহাবীর দ্রোণ,
কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন.
কানীন-পুত্র কর্ণ হইল দান-বীর মহারথী
স্বর্গ হইতে পতিতা গঙ্গা শিবেরে পেলেন পতি,
শান-নু রাজা নিবেদিল প্রেম পুনঃ সেই গঙ্গায়-
তাঁদেরি পুত্র অমর ভীষ্ম, কৃষ্ণ প্রণমে যায়!
মুনি হ’ল শুনি সত্যকাম সে জারজ জবালা-শিশু,
বিস্ময়কর জন্ম যাঁহার-মহাপ্রেমিক সে যিশু!- 
কেহ নহে হেথা পাপ-পঙ্কিল, কেহ সে ঘৃণ্য নহে,
ফুটিছে অযুত বিমল কমল কামনা-কালীয়-দহে!
শোনো মানুষের বাণী,
জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক’ কোনো গ্লানি!
পাপ করিয়াছি বলিয়া কি নাই পুণ্যেরও অধিকার?
শত পাপ করি’ হয়নি ক্ষুন্ন দেবত্ব দেবতার।
অহল্যা যদি মুক্তি লভে, মা, মেরী হ’তে পারে দেবী,
তোমরাও কেন হবে না পূজ্যা বিমল সত্য সেবি’?
তব সন্তানে জারজ বলিয়া কোন্‌ গোঁড়া পাড়ে গালি,
তাহাদের আমি এই দু’টো কথা জিজ্ঞাসা করি খালি-
দেবতা গো জিজ্ঞাসি-
দেড় শত কোটি সন্তান এই বিশ্বের অধিবাসী-
কয়জন পিতা-মাতা ইহাদের হ’য়ে নিষ্কাম ব্রতী
পুত্রকন্যা কামনা করিল? কয়জন সৎ-সতী?
ক’জন করিল তপস্যা ভাই সন্তান-লাভ তরে?
কার পাপে কোটি দুধের বা”চা আঁতুড়ে জন্মে’ মরে?
সেরেফ্‌ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,
সেই কামানার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!
শুন ধর্মের চাঁই-
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!


সাম্যবাদী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সাম্যবাদী

কাজী নজরুল ইসলাম.....মরুভাস্কর


আদি উপসনালয়-
উঠিল আবার নতুন করিয়া- ভুত প্রেত সমুদয়
তিন শত ষাট বিগ্রহ আর আমুর্তি নতুন করি'
বসিল সোনার বেদীতে রে হায় আল্লার ঘর ভরি'।

সহিতে না পারি' এ দৃশ্য, এই স্রষ্টার অপমান,
ধেয়ানে মুক্তি-পথ খোঁজে নবী, কাঁদিয়া ওঠে পরান।
"খদিজারে কন- আল্লাতালার কসম, কা'বার ঐ
"লাৎ""ওজ্জার" করিবনা পূজা, জানিনা আল্লা বই।
নিজ হাতে যারে করিল সৃষ্টি খড় আর মাটি দিয়া
কোন নির্বোধে পূজিবে তাহারে হায় স্রষ্টা বলিয়া।"
সাধবী পতিব্রতা খদিজাও কহেন স্বামীর সনে--
"দূর কর ঐ লাত-মানাতেরে, পূজে যাজা সব -জনে।
তব শুভ-বরে একেশ্বর সে জ্যোতির্ময়ের দিশা।
পাইয়াছি প্রভু, কাটিয়া গিয়াছে আমার আঁধার নিশা।"

ক্রমে ক্রমে সব কোরেশ জানিল; মোহাম্মদ আমীন
করে নাকো পূজা কা'বার ভূতেরে ভাবিয়া তাদেরে হীন।


আনোয়ার কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আনোয়ার
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


[স্থান– প্রহরী–বেষ্টিত অন্ধকার কারাগৃহ, কনস্ট্যান্টিনোপ্‌ল্‌। কাল–অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি।]

[চারিদিকে নিস্তব্ধ নির্বাক। সেই মৌনা নিশীথিনীকে ব্যথা দিতেছিল শুধু কাফ্রি-সাস্ত্রীর পায়চারির বিশ্রী খট্‌খট্ শব্দ। ঐ জিন্দানখানায় মহাবাহু আনোয়ারের জাতীয়-সৈন্যদলের সহকারী এক তরুণ সেনানী বন্দী। তাহার কুঞ্চিত দীর্ঘ কেশ, ডাগর চোখ, সুন্দর গঠন– সমস্ত-কিছুতে যেন একটা ব্যথিত-বিদ্রোহের তিক্ত-ক্রন্দন ছলছল করিতেছিল। তরুণ প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে চিন্তার রেখাপাতে তাহাকে তাহার বয়স অপেক্ষা অনেকটা বেশি বয়স্ক বোধ হইতেছিল।

সেইদিনই ধামা-ধরা সরকারের কোর্ট-মার্শালের বিচারে নির্দ্ধারিত হইয়া গিয়াছে যে, পরদিন নিশিভোরে তরুণ সেনানীকে তোপের মুখে উড়াইয়া দেওয়া হইবে।

আজ হতভাগ্যের সেই মুক্তি-নিশীথ, জীবনের সেই শেষরাত্রি। তাহার হাতে, পায়ে, কটিদেশে, গর্দানে উৎপীড়নের লৌহ-শৃঙ্খল। শৃঙ্খল-ভারাতুর তরুণ সেনানী স্বপ্নে তাহার 'মা'-কে দেখিতেছিল। সহসা চীৎকার করিয়া সে জাগিয়া উঠল। তাহার পর চারিদিকে কাতর নয়নে একবার চাহিয়া দেখিল, কোথাও কেহ নাই। শুধু হিমানি-সিক্ত বায়ু হা হা স্বরে কাঁদিয়া গেল, 'হায় মাতৃহারা!'

স্বদেশবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা স্মরণ করিয়া তরুণ সেনানী ব্যর্থ-রোষে নিজের বাম বাহু নিজে দংশন করিয়া ক্ষত-বিক্ষত করিতে লাগিল। কারাগৃহের লৌহ-শলাকায় তাহার শৃঙ্খলিত দেহভার বারেবারে নিপতিত হইয়া কারা-গৃহ কাঁপাইয়া তুলিতেছিল।

এখন তাহার অস্ত্র-গুরু আনোয়ারকে মনে পড়িল। তরুণ বন্দী চীৎকার করিয়া উঠিল, 'আনোয়ার!'–]


আনোয়ার!      আনোয়ার!
দিলাওয়ার তুমি, জোর তলওয়ার হানো, আর
নেস্ত-ও-নাবুদ করো, মারো যত জানোয়ার!
আনোয়ার! আফসোস্!
বখতেরই সাফ্ দোষ,
রক্তেরও নাই ভাই আর সে যে তাপ জোশ,
ভেঙে গেছে শম্‌শের–পড়ে আছে খাপ কোষ!
আনোয়ার! আফসোস্!

আনোয়ার! আনোয়ার!
সব যদি সুম্‌সাম, তুমি কেন কাঁদো আর?
দুনিয়াতে মুসলিম আজ পোষা জানোয়ার!
আনোয়ার! আর না!–
দিল্ কাঁপে কার না?
তল্‌ওয়ারে তেজ নাই! –তুচ্ছ স্মার্ণা,
ঐ কাঁপে থরথর মদিনার দ্বার না?
আনোয়ার! আর না!

আনোয়ার! আনোয়ার!
বুক ফেড়ে আমাদের কলিজাটা টানো, আর
খুন করো –খুন করো ভীরু যত জানোয়ার!
আলোয়ার! জিঞ্জির–
পরা মোরা খিঞ্জির!
শৃঙ্খলে বাজে শোনো রোণা রিণ-ঝিণ্ কির,–
নিবু নিবু ফোয়ারা বহ্নির ফিন্‌কির!
গর্দানে জিঞ্জির!

আনোয়ার! আনোয়ার!
দুর্বল্ এ গিদ্‌ধড়ে কেন তড়্‌পানো আর?
জোরওয়ার শের কই? জের্‌বার জানোয়ার!
আনোয়ার! মুশ্‌কিল
জাগা কঞ্জুশ্-দিল,
ঘিরে আসে দাবানল তবু নাই হুঁশ তিল!
ভাই আজ শয়তান ভাই-এ মারে ঘুষ কিল!
আনোয়ার! মুশ্‌কিল!

আনোয়ার! আনোয়ার!
বেইমান মোরা, নাই জান আধ-খানও আর।
কোথা খোঁজো মুস্‌লিম? –শুধু বুনো জানোয়ার!
আনোয়ার! সব শেষ!–
দেহে খুন অবশেষ!–
ঝুটা তেরি তলওয়ার ছিন্ লিয়া যব্ দেশ !
আওরত সম ছি ছি ক্রদন রব পেশ ! !
আনোয়ার ! সব শেষ !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্তানো আর !
আজো যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার !
আনোয়ার ! –কেউ নাই !
হাথিয়ার? –সেও নাই !
দরিয়াও থম্‌থম্ নাই তাতে ঢেউ, ছাই !
জিঞ্জির গলে আজ বেদুঈন-দে'ও ভাই !
আনোয়ার ! কেউ নাই !

আনোয়ার ! আনোয়ার !
যে বলে সে মুস্‌লিম– জিভ্ ধরে টানো তার !
বেইমান জানে শুধু জানটা বাঁচানো সার !
আনোয়ার ! ধিক্কার !
কাঁধে ঝুলি ভিক্ষার–
তল্ওয়ারে শুরু যার স্বধীনতা শিক্ষার!
যারা ছিল দুর্দম আজ তারা দিক্‌দার!
আনোয়ার! ধিক্কার!

    আনোয়ার ! আনোয়ার!
দুনিয়াটা খুনিয়ার, তবে কেন মনো আর
রুধিরের লোহু আঁখি? –শয়তানি জানো সার!
আনোয়ার ! পঞ্জায়
বৃথা লোকে সম্‌ঝায়,

ব্যথা-হত বিদ্রোহী দিল্‌ নাচে ঝন্‌ঝায়,
খুন-খেগো তল্‌ওয়ার আজ শুধু রণ্ চায়,
আনোয়ার ! পঞ্জায়!
আনোয়ার ! আনোয়ার!
পাশা তুমি নাশা হও মুসলিম-জানোয়ার,
ঘরে যত দুশ্‌মন, পরে কেন হানো মার?–
আনোয়ার ! এসো ভাই!
আজ সব শেষও যাই!–
ইস্‌লামও ডুবে গেল, মুক্ত স্বদেশও নাই!-
তেগ ত্যাজি বরিয়াছি ভিখারির বেশও তাই!
আনোয়ার ! এসো ভাই!!


[সহসা কাফ্রি সাস্ত্রীর ভীম চ্যালেঞ্জ্ প্রলয়-ডম্বরু-ধ্বনির মতো হুঙ্কার দিয়া উঠিল– 'এয়্ নৌজওয়ান, হুঁশিয়ার!' অধীর ক্ষোভে তিক্ত রোষে তরুণের দেহের রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিল! তাহার কটিদেশের, গর্দানের, পায়ের শৃঙ্খল খানখান হইয়া টুটিয়া গেল, শুধু হাতের শৃঙ্খল টুটিল না। সে সিংহ-শাবকের মতো গর্জন করিয়া উঠিল–]

এয়্ খোদা! এয়্ আলি! লাও মেরি তলোয়ার!


[সহসা তাহার ক্লান্ত আঁখির চাওয়ায় তুরস্কের বন্দিনী মাতৃ-মূর্তি ভাসিয়া উঠিল। ঐ মাতৃমূর্তির পার্শ্বেই তাহার মায়েরও শৃঙ্খলিত ভিখারিনি বেশ। তাঁদের দুইজনেরই চোখের কোণে দুই বিন্দু করিয়া করুণ অশ্রু। অভিমানী পুত্র অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া লইয়া কাঁদিয়া উঠিল–]


ও কে? ও কে ছল আর?   
না-মা, মরা জানকে এ মিছে তর্‌সানো আর!
আনোয়ার ! আনোয়ার!!


[কাপুরুষ প্রহরীর ভীম প্রহরণ বিনিদ্র বন্দী তরুণ সেনানীর পৃষ্ঠের উপর পড়িল। অন্ধ কারাগারের বন্ধ রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাহারই আর্ত প্রতিধ্বনি গুমরিয়া ফিরিতে লাগিল-'আঃ-আঃ-আঃ!'

আজ নিখিল বন্দী-গৃহে গৃহে ঐ মাতৃমুক্তিকামী তরুণেরই অতৃপ্ত কাঁদন ফরিয়াদ করিয়া ফিরিতেছে। যেদিন এ ক্রন্দন থামিবে, সেদিন সে-কোন্ অচিন্ দেশে থাকিয়া গভীর তৃপ্তির হাসি হাসিব জানি না! তখন হয়তো হারা-মা-আমার আমায় 'তারার পানে চেয়ে চেয়ে' ডাকবেন। আমিও হয়তো আবার আসিব। মা কি আমায় তখন নূতন নামে ডাকিবেন? আমার প্রিয়জন কি আমায় নূতন বাহুর ডোরে বাঁধিবে? আমার চোখ জলে ভরিয়া উঠিতেছে, আর কেন যেন মনে হইতেছে, 'আসিবে সেদিন আসিবে!']


মোহর্‌রম কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মোহর্‌রম
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


নীল সিয়া আসমা লালে লাল দুনিয়া,–
‘আম্মা ! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া’।
কাঁদে কোন্ ক্রদসী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে !
রুদ্র মাতম্ ওঠে দুনিয়া দামেশকে–
‘জয়নালে পরাল এ খুনিয়ারা বেশ কে?
‘হায় হায় হোসেনা’ ওঠে রোল ঝন্‌ঝায়,
তল্‌ওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পঞ্জায়!
উন্‌মাদ ‘দুলদুল্’ ছুটে ফেরে মদিনায়,
আলি-জাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়!
মা ফাতেমা আস্‌মানে কাঁদে খুলি কেশপাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের শ্বেতবাস!
রণে যায় কাসিম্ ঐ দু’ঘড়ির নওশা,
মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা!
‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা–
‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেলো সকিনা!’
কাঁদে কে রে কোলে করে কাসিমের কাটা-শির?
খান্‌খান্ খুন হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর!
কেঁদে গেছে থামি হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,
বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র!
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
‘আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা!’
নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,
কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার!
দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্‌মনও ‘সাব্বাস’!
দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,
হাঁকে বীর ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা!’
মা’র থনে দুধ নাই, বাচ্চারা তড়্‌পায়!
জিভ চুষে কচি জান থাকে কিরে ধড়্‌টায়?
দাউদাউ জ্বলে শিরে কারবালা-ভাস্কর,
কাঁদে বানু–’পানি দাও, মরে জাদু আস্‌গর!’
কলিজা কাবাব সম ভুনে মরু-রোদ্দুর,
খাঁ খাঁ করে কার্‌বালা, নাই পানি খর্জুর,
পেল না তো পানি শিশু পিয়ে গেল কাঁচা খুন,
ডাকে মাতা, –পানি দেবো ফিরে আয় বাছা শুন্!
পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে!
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল,
‘দাদা! তেরি হর্ কিয়া বর্‌বাদ্ পয়মাল!’
হাইদরি-হাঁক হাঁকি দুল্‌দুল্-আস্‌ওয়ার
শম্‌শের চম্‌কায় দুশমনে ত্রাস্‌বার!
খসে পড়ে হাত হতে শত্রুর তরবার,
ভাসে চোখে কিয়ামতে আল্লার দরবার।
নিঃশেষ দুশ্‌মন্; ওকে রণ-শ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মুছে আঁখি-প্রান্ত?
কোথা বাবা আস্‌গর্? শোকে বুক-ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসনের ফেটে যায় পাঁজরা!
ধুঁকে ম’লো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম্‌জাত্‌রা!
অঞ্জলি হতে পানি পড়ে গেল ঝর্-ঝর্
লুটে ভূমে মহাবাহু খঞ্জর-জর্জর!
হল্‌কুমে হানে তেগ ও কে বসে ছাতিতে?–
আফ্‌তাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে!
আস্‌মান ভরে গেল গোধূলিতে দুপরে,
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে!
বেটাদের লোহু-রাঙা পিরাহান-হাতে, আহ্–
‘আরশের পায়া ধরে কাঁদে মাতা ফাতেমা,
‘এয়্ খোদা বদ্‌লাতে বেটাদের রক্তের
মার্জনা করো গোনা পাপী কম্‌বখ্‌তের!’
কত মোহর্‌রম্ এল্ গেল চলে বহু কাল–
ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লোহু লাল!
মুস্‌লিম্! তোরা আজ জয়নাল আবেদিন,
‘ওয়া হোসেনা-ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!
ফিরে এল আজ সেই মোহর্‌রম মাহিনা,–
ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!
উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ্ আরবির,
দুনিয়াতে নত নয় মুস্‌লিম কারো শির;–
তবে শোনো ঐ শোনো বাজে কোথা দামামা,
শম্‌শের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!
বেজেছে নাকাড়া, হাঁকে নকিবের তূর্য,
হুশিয়ার ইস্‌লাম, ডুবে তব সূর্য!
জাগো ওঠো মুস্‌লিম, হাঁকো হাইদরি হাঁক।
শহীদের দিনে সব-লালে-লাল হয়ে যাক!
নওশার সাজ নাও খুন-খচা আস্তিন,
ময়দানে লুটাতে রে লাশ এই খাস দিন।
হাসানের মতো পি’ব পিয়ালা সে জহরের,
হোসেনের মতো নিব বুকে ছুরি কহরের;
আস্‌গর সম দিব বাচ্চারে কোর্‌বান,
জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান!
সকিনার শ্বেতবাস দেব মাতা কন্যায়,
কাসিমের মতো দেবো জান রুধি অন্যায়!
মোহর্‌রম্! কারবালা! কাঁদো ‘হায় হোসেনা!’
দেখো মরু-সূর্যে এ খুন যেন শোষে না!


কোরবানি কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কোরবানি
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
        দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন!
             ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,–
             আজিকার এ খুন কোর্‌বানির!
             দুম্বা-শির      রুম্-বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি। রহমান কি রুদ্র নন?
             বাস্‍! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর 'খুন দে, জান দে, শির দে বৎস' শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             খঞ্জর মারো গর্দানেই,
              পঞ্জরে আজি দরদ নেই,
              মর্দানি'ই পর্দা নেই
ডর্‌তা নেই আজ খুন্-খারাবিতে রক্ত-লুব্ধ মন!
              খুনে খেল্‌ব খুন্-মাতন!
দুনো উন্মাদনাতে সত্য মুক্তি আন্‌তে যুঝ্‌র রণ।
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             চড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার
             মুস্‌লিমে সারা দুনিয়াটার।
             'জুল্‌ফেকার' খুল্‌বে তার
দু'ধারী ধার্‌ শেরে-খোদার রক্তে-পূত-বদন!
             খনে আজকে রুধ্‌ব মন!
ওরে শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
             আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,
             'আজাদি' মেলে না পস্তানোয়!
             দস্তা নয় সে     সস্তা নয়!
হত্যা নয় কি মৃত্যুও? তবে রক্ত-লুব্ধ কোন্
             কাঁদে-শক্তি-দুঃস্থ শোন্–

'এয়্‌ ইব্‌রাহিম্ আজ কোর্‌বানি কর শ্রেষ্ঠ পুত্রধন!'
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           এ তো নহে লোহু তরবারের
           ঘাতক জালিম জোর্‌বারের!
           কোরবানের জোর-জানের
খুন এ যে, এতে গোর্দা ঢের রে, এ ত্যাগে 'বুদ্ধ' মন!
           এতে    মা রাখে পুত্র পণ্!
তাই জননী হাজেরা বেটারে পরাল বলির পূত বসন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           এই দিনই 'মীনা'-ময়দানে
           পুত্র-স্নেহের গর্দানে
           ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইব্‌রাহিম্ সে আপনা রুদ্র পণ!
           ছি ছি! কেঁপো না ক্ষুদ্র মন!
আজ জল্লাদ নয়, প্রহলাদ সম মোল্লা খুন-বদন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           দ্যাখ্ কেঁপেছে 'আরশ' আস্‌মানে,
           মন-খুনি কি রে রাশ মানে?
           ত্রাস প্রাণে?-তবে রাস্তা নে‍!
প্রলয়- বিষাণ কিয়ামতে তবে বাজাবে কোন্ বোধন?
সেকি সৃষ্টি-সংশোধন?
ওরে তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্!–
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           মুস্‌লিম-রণ-ডঙ্কা সে,
           খুন্ দেখে করে শঙ্কা কে?
           টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি গড়া ভীম কারা লড়ব রণ-মরণ!
           ঢালে বাজ্‌বে ঝন্-ঝনন!
ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।

ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্‌বোধন।
           জোর চাই আর যাচ্‌না নয়
           কোরবানি-দিন আজ না ওই?
           বাজ্‌না কই? সাজ্‌না কই?
কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধরণ?
           বল্– 'যুঝ্‌ব জান্ ভি পণ!'
ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ!
আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্বোধন।


শাত-ইল-আরব কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


শাত-ইল-আরব
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


শাতিল্ আরব! শাতিল্ আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহীদের লোহু, দিলিরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর।
              যুঝেছে এখানে তুর্কি-সেনানী,
              য়ুনানি, মিস্‌রি, আর্‌বি, কেনানি–
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ্‌ বেদুঈন্‌দের চাঙ্গা শির!
                                               নাঙ্গা-শির্–
শম্‌শের হাতে, আঁসু-আঁখে হেথা মূর্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল্ আরব! শাতিল্ আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর। 
              'কুত-আমারা'র রক্তে ভরিয়া
              দজ্‌লা এনেছে লোহুর দরিয়া;
              উগারি সে খুন তোমাতে দজ্‌লা নাচে ভৈরব 'মস্তানি'র।
                                               এস্তা-নীর
গর্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত, –'শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখির!'
দজ্‌লা-ফোরাত-বাহিনী শাতিল! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।   
              বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা
              ইরাক আজমে করেছ ধন্যা;–
              বীর-প্রসূ দেশ হলো বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দমির!
                                               মর্দ বীর
সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির।

শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব্! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!
              দুশ্‌মন্-লোহু ঈর্ষায়-নীল
              তব তরঙ্গে করে ঝিলমিল্,
বাঁকে বাঁকে রোষে মোচড় খেয়েছ পিয়ে নীল খুন পিণ্ডারির!
                                               জিন্দা বীর

'জুলফিকার' আর 'হায়দরি' হাঁক হেথা আজো হজরত্ আলীর-
শাতিল্-আরব!-শাতিল্-আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।
              ললাটে তোমার ভাস্বর টীকা
              বস্‌রা-গুলের বহ্নিতে লিখা–
এ যে বসোরার খুন-খারাবি গো রক্ত-গোলাব-মঞ্জরীর!
                                               খঞ্জরীর
খঞ্জরে ঝরে খর্জুর সম হেথা লাখো দেশ-ভক্ত-শির!
শাতিল্-আরব! শাতিল্-আরব!! পূত যুগে তোমার তীর।
              ইরাক-বাহিনী! এ যে গো কাহিনী,–
              কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী
তোমারও দুঃখে 'জননী আমার!' বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর!
                                               রক্ত-ক্ষীর–
পরাধীনা! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দু-ফোঁটা ভক্ত-বীর।
শহীদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজ নোয়ায় শির!


খেয়া-পারের তরণী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


খেয়া-পারের তরণী
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


যাত্রীরা রাত্তিরে হতে এল খেয়া পার,
বজ্রেরি তূর্যে এ গর্জেছে কে আবার?
প্রলয়েরি আহ্বান ধ্বনিল কে বিষাণে!
ঝন্‌ঝা ও ঘন দেয়া স্বনিল রে ঈশানে!

নাচে পাপ-সিন্ধুতে তুঙ্গ তরঙ্গ!
মৃত্যুর মহানিশা রুদ্র উলঙ্গ!
নিঃশেষে নিশাচর গ্রাসে মহাবিশ্বে,
ত্রাসে কাঁপে তরণীর পাপী যত নিঃস্বে।

তমসাবৃতা ঘোরা ‘কিয়ামত’ রাত্রি,
খেয়া-পারে আশা নাই ডুবিল রে যাত্রী!
দমকি দমকি দেয়া হাঁকে কাঁপে দামিনী,
শিঙ্গার হুঙ্কারে থরথর যামিনী!

লঙ্ঘি এ সিন্ধুরে প্রলয়ের নৃত্যে
ওগো কার তরী ধায় নির্ভীক চিত্তে–
অবহেলি জলধির ভৈরব গর্জন
প্রলয়ের ডঙ্কার ওঙ্কার তর্জন!

পুণ্য-পথের এ যে যাত্রীরা নিষ্পাপ,
ধর্মেরি বর্মে সু-রক্ষিত দিল্ সাফ!
নহে এরা শঙ্কিত বজ্র নিপাতেও
কাণ্ডারী আহ্‌মদ তরী ভরা পাথেয়।

আবুবকর উস্‌মান উমর আলি হায়দর
দাঁড়ি যে এ তরণীর, নাই ওরে নাই ডর!
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা,
দাঁড়ি-মুখে সারি-গান –লা-শরিক আল্লাহ!

‘শাফায়ত’-পাল-বাঁধা তরণীর মাস্তুল,
‘জান্নাত্’ হতে ফেলে হুরি রাশ্ রাশ্ ফুল।
শিরে নত স্নেহ-আঁখি মঙ্গল দাত্রী,
গাও জোরে সারি-গান ও-পারের যাত্রী।
বৃথা ত্রাসে প্রলয়ের সিন্ধু ও দেয়া-ভার,
ঐ হলো পুণ্যের যাত্রীরা খেয়া পার।


কামাল পাশা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কামাল পাশা
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


[তখন শরৎ-সন্ধ্যা। আস্মানের আঙিনা তখন কার্বালা ময়দানের মতো খুনখারাবির রঙে রঙিন। সেদিনকার মহা-আহবে গ্রীক-সৈন্য সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইহা গিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশ সৈন্যই রণস্থলে হত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। বাকি সব প্রাণপণে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতেছে। তুরস্কের জাতীয় সৈন্যদলের কাণ্ডারী বিশ্বত্রাস মহাবাহু কামাল-পাশা মহাহর্ষে রণস্থল হইতে তাম্বুতে ফিরিতেছেন। বিজয়োন্মত্ত সৈন্যদল মহাকল্লোলে অম্বর-ধরণী কাঁপাইয়া তুলিতেছে। তাহাদের প্রত্যেকের বুকে পিঠে দুই জন করিয়া নিহত বা আহত সৈন্য বাঁধা। যাহারা ফিরিতেছে তাহাদেরও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোলাগুলির আঘাতে, বেয়নটের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত, পোষাক-পরিচ্ছদ ছিন্নভিন্ন, পা হইতে মাথা পর্যন্ত রক্তরঞ্জিত। তাহাদের কিন্তু সে দিকে ভ্রূক্ষেপও নাই। উদ্দাম বিজয়োন্মাদনার নেশায় মৃত্যু-কাতর রণক্লান্তি ভুলিয়া গিয়া তাহারা যেন খেপিয়া উঠিয়াছে। ভাঙা সঙ্গীনের আগায় রক্ত-ফেজ উড়াইয়া ভাঙা-খাটিয়া-আদি-দ্বারা-নির্মিত এক অভিনব চৌদলে কামালকে বসাইয়া বিষম হল্লা করিতে করিতে তাহারা মার্চ করিতেছে। ভূমিকম্পের সময় সাগর কল্লোলের মতো তাহাদের বিপুল বিজয়ধ্বনি আকাশে-বাতাসে যেন কেমন একটা ভীতি-কম্পনের সৃজন করিতেছে। বহু দূর হইতে সে রণ-তাণ্ডব নৃত্যের ও প্রবল ভেরী-তূরীর ঘন রোল শোনা যাইতেছে। অত্যধিক আনন্দে অনেকেরই ঘন ঘন রোমাঞ্চ হইতেছিল। অনেকেরই চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেছিল।]

[সৈন্য-বাহিনী দাঁড়াইয়া। হাবিলদার-মেজর তাহাদের মার্চ করাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল।

বিজয়োন্মত্ত সৈন্যগণ গাইতেছিল,–]


ঐ খেপেছে পাগ্লি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই।
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মাজর মার্চের হুকুম করিল,-কুইক্ মার্চ!]

লেফ্ট! রাইট! লেফ্ট!!
লেফ্ট! রাইট! লেফ্ট!!

[সৈন্যগণ গাহিতে গাহিতে মার্চ করিতে লাগিল]

ঐ খেপেছে পাগ্লি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- লেফ্ট্! রাইট!]

সাব্বাস্ ভাই! সাব্বাস্ দিই, সাব্বাস্ তোর শম্শেরে।
পাঠিয়ে দিলি দুশ্মনে সব যম-ঘর একদম্-সে রে!
বল্ দেখি ভাই বল্ হাঁ রে,
দুনিয়ার কে ডর্ করে না তুর্কির তেজ তলোয়ারে?

[লেফট্! রাইট! লেফ্ট্!]

খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
বুজ্দিল্ ঐ দুশ্মন্ সব বিল্কুল্ সাফ হো গিয়া!
খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!
দস্যুগুলোয় সাম্লাতে যে এমনি দামাল কামাল চাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো  কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- সাবাস সিপাই! লেফ্ট্! রাইট্! লেফ্ট!]

শির হতে এই পাঁও-তক্ ভাই লাল-লালে-লাল খুন মেখে
রণ-ভিতুদের শান্তি-বাণী শুন্বে কে?
পিণ্ডারিদের খুন-রঙিন
নোখ-ভাঙা এই নীল সঙিন
তৈয়ার হেয়্ হর্দম ভাই ফাড়্তে যিগর্ শত্রুদের!
হিংসুক-দল! জোর তুলেছি শোধ্ তাদের!
সাবাস্ জোয়ান! সাবাস্!
ক্ষীণজীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্–
এম্নি করে রে–
এমনি জোরে রে–
ক্ষীণজীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্!–
ঐ চেয়ে দ্যাখ্ আসমানে আজ রক্ত-রবির আভাস!–
সাবাস্ জোয়ান! সাবাস্!!

[লেফট্! রাইট! লেফ্ট্]

হিংসুটে ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ, আমরা মোটেই হইনি জের !
পরের মুলুক লুট করে খায় ডাকাত তারা ডাকাত !
তাই তাদের তারে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত !
কি বলো ভাই শ্যাঙাত?
হুর্রো হো !
হুর্রো হো ! !
দনুজ দলে দল্তে দাদা এম্নি দামাল কামাল চাই !
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার মেজর: রাইট্ হুইল্! লেফ্টা রাইট্! লেফ্ট্!
      সৈন্যগণ ডানদিকে মোড় ফিরিল।]

আজাদ মানুষ বন্দী করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,
কুল্ মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখালে ক'দিন বেশ,
মোদের হাতে তুর্কি-নাচন নাচ্লে তাধিন্ তাধিন্ শেষ!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!
বদ্-নসিবের বরাত খারাব বরাদ্দ তাই কর্লে কি না আল্লায়,
পিশাচগুলো পড়্ল এসে পেল্লায় এই পাগলাদেরই পাল্লায়!
এই পাগলাদেরই পাল্লায়!!
হুর্রো হো!
হুর্রো–
ওদের  কল্লা দেখে আল্লা ডরায়, হল্লা শুধু হল্লা,
ওদের    হল্লা শুধু হল্লা,
এক মুর্গির জোর গায়ে নেই, ধর্তে আসেন তুর্কি-তাজি
মর্দ গাজি মোল্লা!
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
হেসে   নাড়িই ছেড়ে বা!
হা হা   হাঃ! হাঃ! হাঃ!

[হাবিলদার-মেজর-সাবাস সিপাই! লেফ্ট্ রাইট্! লেফ্ট্!
সাবাস সিপাই! ফের বল ভাই!]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই!
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো  কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- লেফ্ট্ হুইল্! য়্যাজ্ য়ু ওয়্যার্!- রাইট হুইল!– লেফ্ট্! রাইট! লেফট্!]
[সৈন্যদের আঁখির সামনে অস্ত-রবির আশ্চর্য রঙের খেলা ভাসিয়া উঠিল।]

দেখ্চ কি দোস্ত অমন করে? হৌ হৌ হৌ!
সত্যি তো ভাই!– সন্ধেটা আজ দেখতে যেন সৈনিকেরই বৌ!
শহীদ সেনার টুক্টুকে বৌ লাল-পিরাহান-পরা,
স্বামীর খুনের ছোপ-দেওয়া, তায় ডগডগে আন্কোরা!–
না না না,–কল্জে যেন টুকরো-করে-কাটা
হাজার তরুণ শহীদ বীরের,–শিউরে উঠে গা'টা!
আস্মানের ঐ সিং-দরজায় টাঙিয়েছে কোন্ কসাই!
দেখতে পেলে এক্ষুনি গে এই ছোরাটা কল্জেতে তার বসাই!
মুণ্ডুটা তার খসাই!
গোস্বাতে আর পাইনে ভেবে কি যে করি দশাই!

[হাবিলদার-মেজর-সাবাস সিপাই! লেফ্ট্! রাইট্! লেফ্ট্!]
[ঢালু পার্বত্য পথ, সৈন্যগণ বুকের পিঠের নিহত ও আহত সৈন্যদের ধরিয়া সন্তর্পণে নামিল।]

আহা কচি ভাইরা আমার রে!
এমন কাঁচা জানগুলো খান্ খান্ করেছে কোন্ সে চামার রে?
আহা কচি ভাইরা আমার রে! !

[সাম্নে উপত্যকা। হাবিলদার মেজর :– লেফ্ট্ ফর্ম! সৈন্য- বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল!
হাবিলদার মেজর :-ফর্ওয়ার্ড ! লেফ্ট্ ! রাইট্ ! লেফ্ট্ !]

আস্মানের ঐ আঙরাখা
খুন-খারাবির রঙ মাখা
কি খুবসুরৎ বাঃ রে বা !
জোর বাজা ভাই কাহারবা!
হোক্ না ভাই এ কারবালা ময়দান–
আমরা যে গাই সাচ্চারই জয়-গান !
হোক্ না এ তোর কার্বালা ময়দান ! !
হুর্রো হো !
হুর্রো–

[সাম্নে উপত্যকা– হঠাৎ যেন পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে। হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিতে লাগিল।
হুকুম দিয়া গেল– 'মার্ক্ টাইম্।' সৈন্যরা এক স্থানেই দাঁড়াইয়া পা আছড়াইতে লাগিল–]

দ্রাম্! দ্রাম্! দ্রাম!
লেফ্ট্! রাইট! লেফ্ট!
দ্রাম্! দ্রাম্! দ্রাম্!
আস্মানে ঐ ভাস্মান যে মস্ত দুটো রঙের তাল,
একটা নিবিড় নীল-সিয়া আর একটা খুবই গভীর লাল,–
বুঝ্লে ভাই! ঐ নীল সিয়াটা শত্রুদের!
দেখ্তে নারে কারুর ভালো,
তাইতে কালো রক্ত-ধারার বইছে শিরায় স্রোত ওদের।
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
গৃধ্নু ওরা, লুব্ধ ওদের লক্ষ্য অসুর বল–
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সার জেনেছে সত্য যাহা হত্যা তারই!
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সৈনিকের এই গৈরিকে ভাই–
জোর অপমান করলে ওরাই,
তাই তো ওদের মুখ কালো আজ, খুন যেন নীল জল!–
ওরা হিংস্র পশুর দল!
ওরা হিংস্র পশুর দল!!

[হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিয়া ফিরিয়া অর্ডার দিল-ফর্ওয়ার্ড! লেফ্ট্ হুইল্–
সৈন্যগণ আবার চলিতে লাগিল-লেফ্ট্ রাইট্! লেফ্ট্!]

সাচ্চা ছিল সৈন্য যারা শহীদ হলো মরে।
তোদের মতন পিঠ ফেরেনি প্রাণটা হাতে করে,–
ওরা শহীদ হলো মরে!
পিট্নি খেয়ে পিঠ যে তোদের ঢিট হয়েছে! কেমন!
পৃষ্ঠে তোদের বর্শা বেঁধা, বীর সে তোরা এমন!
মুর্দারা সব যুদ্ধে আসিস্! যা যা!
খুন দেখেছিস্ বীরের? হা দেখ্ টক্টকে লাল কেমন গরম তাজা!
মুর্দারা সব যা যা!!

[বলিয়াই কটিদেশ হইতে ছোরা খুলিয়া হাতের রক্ত লইয়া দেখাইল]

ত্রঁরাই বলেন হবেন রাজা!
আরে যা যা! উচিত সাজা
তাই দিয়েছে শক্ত ছেলে কামাল ভাই!

[হাবিলদার মেজর;- সাবাস সিপাই!]

এই তো চাই! এই তো চাই!
থাক্লে স্বাধীন সবাই আছি, নেই তো নাই, নেই তো নাই!
এই তো চাই!!

[কতকগুলি লোক অশ্রুপূর্ণ নয়নে এই দৃশ্য দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছিল।
         তাহাদের দেখিয়া সৈন্যগণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল।]

মার্ দিয়া ভাই মার্ দিয়া!
দুশ্মন্ সব হার্ গিয়া!
কিল্লা ফতে হো দিয়া।
পর্ওয়া নেহি, যা নে দো ভাই যো গিয়া!
কিল্লা ফতে হো গিয়া!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!

[হাবিলদার-মেজর;-সাবাস জোয়ান! লেফ্ট্! রাইট্!]

জোর্সে চলো পা মিলিয়ে,
গা হিলিয়ে,
এম্নি করে হাত দুলিয়ে!
দাদ্রা তালে 'এক দুই তিন' পা মিলিয়ে
ঢেউএর মত যাই!
আজ স্বাধীন এ দেশ! আজাদ মোরা বেহেশ্তও না চাই!
আর বেহেশ্তও না চাই!!

[হাবিলদার-মেজর:- সাবাস সিপাই! ফের বল ভাই!]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল তাই!
কামাল ! তু নে কামাল কিয়া ভাই !
হো হো কামাল ! তু নে কামাল কিয়া ভাই ! !

[সৈন্যদল এক নগরের পার্শ্ব দিয়া চলিতে লাগিল। নগর-বাসিনীরা ঝরকা হইতে মুখ বাড়াইয়া এই মহান
দৃশ্য দেখিতেছিল; তাহদের চোখ-মুখ আনন্দাশ্রুতে আপ্লুত। আজ বধূর মুখের বোরকা খসিয়া পড়িয়াছে।
ফুল ছড়াইয়া হাত দুলাইয়া তাহারা বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতেছিল। সৈন্যগণ চীৎকার করিয়া উঠিল।]

ঐ শুনেছিস্? ঝর্কাতে সব বল্ছে ডেকে বৌ-দলে,
'কে বীর তুমি? কে চলেছ চৌদলে?'
চিনিস্নে কি? এমন বোকা বোনগুলি সব!– কামাল এ যে কামাল!
পাগলি মায়ের দামাল ছেলে! ভাই যে তোদের!
তা না হলে কার হবে আর রৌশন্ এমন জামাল?
কামাল এ যে কামাল!!
উড়িয়ে দেবো পুড়িয়ে দেবো ঘর-বাড়ি সব সামাল!
ঘর-বাড়ি সব সামাল!!
আজ আমাদের খুন ছুটেছে, হোশ টুটেছে,
ডগ্মগিয়ে জোশ উঠেছে!
সাম্নে থেকে পালাও!
শোহরত দাও নওরাতি আজ! হর্ ঘরে দীপ জ্বালাও!
সাম্নে থেকে পালাও!
যাও ঘরে দীপ জ্বালাও!!

[হাবিলদার-মেজর:- লেফ্ট্ ফর্ম্! লেফ্ট্! রাইট! লেফ্ট্!-ফরওয়ার্ড্!]

[বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল। পার্শ্বেই পরিখার সারি। পরিখা-ভর্তি নিহত সৈন্যের
দল পচিতেছে এবং কতকগুলি অ-সামরিক নগরবাসী তাহা ডিঙাইয়া ডিঙাইয়া চলিতেছে।]

ইস্! দেখেছিস! ঐ কারা ভাই সাম্লে চলেন পা,
ফস্কে মরা আধ-মরাদের মাড়িয়ে ফেলেন বা!
ও তাই শিউরে ওঠে গা!
 হাঃ হাঃ হাঃ!
মরল যে সে মরেই গেছে,
বাঁচ্ল যারা রইল বেঁচে!
এই তো জানি সোজা হিসাব! দুঃখ কি তার আঁ?
মরায় দেখে ডরায় এরা! ভয় কি মরায়? বাঃ!
হাঃ হাঃ হাঃ!

[সম্মুখে সঙ্কীর্ণ ভগ্ন সেতু। হাবিলদার-মেজর অর্ডার দিল-'ফর্ম্ ইন্টু সিঙ্গল্ লাইন'। এক একজন করিয়া
বুকের পিঠের নিহত ও আহত ভাইদের চাপিয়া ধরিয়া অতি সন্তর্পণে 'স্লো মার্চ' করিয়া পার হইতে লাগিল।]

সত্যি কিন্তু ভাই!
যখন মোদের বক্ষে-বাঁধা ভাইগুলির এই মুখের পানে চাই–
কেমন সে এক ব্যথায় তখন প্রাণটা কাঁদে যে সে!
কে যেন দুই বজ্র-হাতে চেপে ধরে কল্জেখানা পেষে!
নিজের হাজার ঘায়েল জখম ভুলে তখন ডুক্রে কেন কেঁদেও ফেলি শেষে!
কে যেন ভাই কল্জেখানা পেষে!!
ঘুমোও পিঠে, ঘুমোও বুকে, ভাইটি আমার, আহা!
বুক যে ভরে হাহাকারে যতই তোরে সাব্বাস দিই,
যতই বলি বাহা!
লক্ষ্মীমণি ভাইটি আমার, আহা!!
ঘুমোও ঘুমোও মরণ-পরের ভাইটি আমার, আহা!!
অস্ত-পারের দেশ পারায়ে বহুৎ সে দূর তোদের ঘরের রাহা!
ঘুমোও এখন ঘুমোও ঘুমোও ভাইটি ছোট আহা!
মরণ-বধূর লাল রাঙা বর! ঘুমো!
আহা, এমন চাঁদমুখে তোর কেউ দিল না চুমো!

হতভাগা রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে
না জানি কোন্ ফুট্তে-চাওয়া মানুষ-কুঁড়ির হিয়ায়!
তরুণ জীবন এম্নি গেল, একটি রাতও পেলিনে রে বুকে কোনো প্রিয়ায়!
অরুণ খুনের তরুণ শহীদ! হতভাগ্য রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে!
তাই যত আজ লিখ্নে-ওয়ালা তোদের মরণ ফুর্তি-সে জোর লেখে!
এক লাইনে দশ হাজারের মৃত্যু-কথা! হাসি রকম দেখে!
মরলে কুকুর ওদের, ওরা শহীদ-গাথার বই লেখে!
খবর বেরোয় দৈনিকে,
আর   একটি কথায় দুঃখ জানান, 'জোর মরেছে দশটা হাজার সৈনিকে!'
আঁখির পাতা ভিজল কি না কোনো কালো চোখের,
জান্ল না হায় এ-জীবনে ঐ সে তরুণ দশটি হাজার লোকের!
পচে মরিস পরিখাতে, মা-বোনেরাও শুনে বলে 'বাহা'!
সৈনিকেরই সত্যিকারের ব্যথার ব্যথী কেউ কি রে নেই? আহা!–
আয় ভাই তোর বৌ এল ঐ সন্ধ্যা মেয়ে রক্ত-চেলি পরে,
আঁধার-শাড়ি পরবে এখন পশ্বে যে তোর গোরের বাসর-ঘরে!–
ভাবতে নারি, গোরের মাটি করবে মাটি এ মুখ কেমন করে–
সোনা মানিক ভাইটি আমার ওরে!
বিদায়-বেলায় আরেকটিবার দিয়ে যা ভাই চুমো!
অনাদরের ভাইটি আমার! মাটির মায়ের কোলে এবার ঘুমো!!

[নিহত সৈন্যদের নামাইয়া রাখিয়া দিয়া সেতু পার হইয়া আবার জোরে মার্চ
করিতে করিতে তাহাদের রক্ত গরম হইয়া উঠিল।]

ঠিক বলেছ দোস্ত তুমি!
      চোস্ত কথা! আয় দেখি–তোর হস্ত চুমি!
      মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের?
আব্-জম্-জম্ আনলে এরা, আপনি পিয়ে কল্সি বিষের!
      কে মরেছে? কান্না কিসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপ্নারি জান শেষ করেছে!
বেশ করেছে!!
শহীদ ওরাই শহীদ!
বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে খুন ওদেরি লোহিত!
শহীদ ওরাই শহীদ!!

[এইবার তাহাদের তাম্বু দেখা গেল। মহাবীর আনোয়ার পাশা বহু সৈন্যসামন্ত ও সৈনিকদের
আত্মীয়-স্বজন লইয়া বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন দেখিয়া সৈন্যগণ আনন্দে
আত্মহারা হইয়া 'ডবল মার্চ' করিতে লাগিল]

হুর্রো হো!
হুর্রো হো!!
ভাই-বেরাদর পালাও এখন! দূর্ রহো! দূর্ রহো!!
হুর্রো হো! হুর্রো হো!

[কামাল পাশাকে কোলে করিয়া নাচিতে লাগিল]

    হৌ হৌ হৌ! কামাল জিতা রও!
            কামাল জিতা রও!
    ও কে আসে? আনোয়ার ভাই?–
    আনোয়ার ভাই! জানোয়ার সব সাফ!!
    জোর নাচো ভাই! হর্দম্ দাও লাফ!
            আজ জানোয়ার সব সাফ!
    হুর্রো হো! হুর্রো হো!!
সব-কুছ আব্ দূর্ রহো! – হুর্রো হো! হুর্রো হো!!
রণ জিতে জোর মন মেতেছে!-সালাম সবায় সালাম!–
                              নাচ্না থামা রে!
জখ্মি ঘায়েল ভাইকে আগে আস্তে নামা রে!
               নাচ্না থামা রে!–

            [আহতদেরে নামাইতে নামাইতে]

     কে ভাই? হাঁ হাঁ, সালাম!
–ঐ শোন্ শোন্ সিপাহ্-সালার কামাল ভাই-এর কামাল।

              [সেনাপতির অর্ডার আসিল]

  'সাবাস! থামো! হো! হো!
   সাবাস! হল্ট্! এক! দো!'

[এক নিমিষে সমস্ত কল-রোল নিস্তব্ধ হইয়া গেল। তখনো কি তারায় তারায় যেন ঐ বিজয়
গীতির হারা-সুর বাজিয়া বাজিয়া ক্রমে ক্ষীণ হইতে ক্ষীণ হইয়া মিলিয়া গেল–]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই!
    অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই!
              কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই।
    হো হো,     কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!!