Showing posts with label রূপক কবিতা. Show all posts
Showing posts with label রূপক কবিতা. Show all posts

রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো – ইমু ইমরান কায়েস


রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো!
ইমু ইমরান কায়েস


বনশ্রী যাবেন?
বনশ্রী তো চিনিনা চিনায়া নিয়েন,
নতুন জায়গা না গেলে আর চিনমু ক্যামনে।
খাঁটি কথা।
টিএসসির মোড় থেকে যখন রিকশা ঠিক করি
তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ঢাকা শহর, বাড়ি ফেরার তাড়া,
তাই অচিন রিকশাওয়ানাই সই।
প্রত্যেক মোড়ে ডান-বান বলতে বলতে চলার পথের অবিন্যস্ত আলসেমি,
অহেতুক সব চিন্তা-ভাবনার বিলাসিতা কেটে যাবে, যাক।
রাতের ঢাকা এখন আর খুব নিরাপদ না
চার দেয়ালে ফেরা দরকার, ঘরে ফেরা দরকার।
শাহজানপুর এসে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি কি না। বললাম, পড়ি না।
ডাক্তারি করি, রিকশাওয়ালার ফের বিনীত জিজ্ঞাসা
দেশেই থাকবেন, না বিদেশ চইলা যাবেন?
বললাম, দেশেই থাকবো, অর্ধেক জীবন শেষ,
নতুন করে আর কই যাবো।
দেশের অবস্থা তো ভালো না,
মানুষজন ভালো না, শিক্ষা নাই, সচেতনতা নাই,
থাইকা কি করবেন তার গলায় আক্ষেপ এবার!
আমি এইবার বিস্মিত হলাম,
রিকশাওয়ালার গলায় এই ধরনের সূক্ষ রুচিশীল হাহাকার তো থাকার কথা নয়,
সামথিং ইজ নট রাইট।
সত্যিকার অর্থেই নড়েচড়ে বসলাম।
আলো অন্ধকারে কেবল ঘামে ভেলা পিঠটুকু দেখা যাচ্ছে তার। ওঠার সময় চেহারা খেয়ালই করিনি।
সত্তা শার্টে লেপ্টে থাকা পিঠ থেকে কোন অ্যাবনর্মাল কিছু উদ্ধার করা গেল না।
এই দেশের মেইন সমস্যা কী ভাই জানেন?
সমস্যা তো অনেক।
ঘুষ, দুই নম্বরি, বিচার না হওয়া, প্রভাবশালীদের যা ইচ্ছা তাই করা, ধর্ম ইউজ করে হাবিজাবি কাজ করা, একে তাকে রাজাকার, একে তাকে নাস্তিক বানানো, বাজে রাজনীতি, তার মতে কোনটা কে জানে।
তাই জবাব না দিয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম, কী?
এবার ভদ্রলোকের উত্তর শুনে ভিমড়ি খেলাম-
"মেইন সমস্যা হচ্ছে কেউ বই পড়ে না।"
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি পড়েন?"
অত না, টুকটাক।
আমি আবার কবিতার বই একটু বেশি পড়ি।
বলেন কী।
বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হয় আমার।
কার কবিতার বই পড়েন?
ভদ্রলোক প্রবল মমতায় জানান,
তার পছন্দের কবি শক্তি চট্টোপধ্যায় আর ফরাসী কবি আর্তুর ব্যাবো।
খিলগাঁওয়ের গলিতে আকাশ ফুড়ে হঠাৎ একটা পাহাড় সম উঁচু জ্বিন এসে যদি পথ রোধ করে দাঁড়াতো তবু এতো চমকাতাম না। আর্তুর র‍্যাবো, শক্তি।
কি বিস্ময়! কি বিস্ময়।
ভজলোকের নাম শ্রিপান্থ শফিক।
আপনার অনুমান ঠিক আছে, শ্রিপাছ টুক বানানো।
বরিশালের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা একটা মানুষকে ওইটুকু মেলোড্রামা করতে দেয়াই যায়।
ছাত্র খারাপ ছিলেন না।
এসএসসি পরীক্ষার পর কবিতার 'ভূতে ধরলো।
আরজ আলী মাতুব্বর, সক্রেটস, স্টিফেন হকিং, শক্তি, র‍্যাবো, গিয়ম এপোলোনিয়ার, হুমায়ুন আজাদ পড়ার পর তার মনে হল 
জীবন এক আশ্চর্য গিফট।
স্কুল কলেজে পড়ে সেইটা নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
তাই আর পড়েননি! কবিতা লেখেন নিয়মিত, দুইটা বইও বেরিয়েছে।
যে জীবন তিনি যাপন করেন, তার মতে এটা প্রথা বিরোধী জীবন। একটা সেন্স অফ ফ্রিডম তো আছে!
খারাপ কী?
বাসার কাছাকাছি এসে ভদ্রলোকের সাথে কফি খেলাম এক কাপ।
কফি খেতে খেতে মনে হল, আহা জীবন!
কেউ কি ভীষণ দুঃসাহস নিয়ে জন্মায়!
আর কেউ কি করুণভাবে মাথা নত করে মেনে নেয় জাগতিক সমস্ত হিসাব।
ভদ্রলোকের প্রতি বুক ভর্তি হিংসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম!


খুকির সম্পত্তি কবিতা – জসীমউদ্দীন


খুকির সম্পত্তি
জসীমউদদীন


শিউলি নামের খুকির সনে আলাপ আমার অনেক দিনের থেকে
হাসিখুশি মিষ্টমিশি অনেক কথা কই যে তারে ডেকে।
সেদিন তার কইনু 'খুকি- কী কী জিনিস কওতো তোমার আছে?
সগৌরবে বলল, অনেক-অনেক কিছু আছে তাহার কাছে;
সাতটা ভাঙা পেন্সিল আর নীল বরণের ভাঙা দু-খান কাঁচ,
মারবেল আছে তিন-চারটে, কড়ি আছে গণ্ডা ছ কি পাঁচ।
ডলি পুতুল, মিনি পুতুল, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল আর-
পুঁতির মালা, রঙিন ঝিনুক, আরও অনেক খেলনা আছে তার।
আছে তাহার পাতার বাঁশি, টিনের উনুন, শোলার পাখির ছা
সাতটা আছে ঝুমঝুমি তার আর আছে তার একটি খেলার মা।


আকাশে অনেক মুখ কবিতা – শামসুর রাহমান


আকাশে অনেক মুখ
শামসুর রাহমান


এ কেমন সন্ধ্যা ঘিরে ধরেছে আমার
প্রিয় এই শহরকে আজ। চতুর্দিকে
গুঁড়িয়ে পড়ছে ঘরবাড়ি। নরনারী, শিশুদের
বুকফাটা কান্নায় কাঁপছে পথঘাট, গাছপালা।

এই তো নিজেকে আমি ইট, পাথরের
স্তূপ থেকে আহত শরীর তুলে দেখি আশেপাশে,
সবদিকে অগণিত লাশ, কোনও কোনও
স্থানে ভাঙা পুতুল-জড়ানো হাতে নিষ্প্রাণ বালিকা।

আমাদের ছোট ঘরবাড়ি খুঁজে খুঁজে
আখেরে অধিকতর ক্লান্ত শরীরে অজানা
জায়গায় ভগ্নস্তূপে বসে পড়ি। হঠাৎ সমুখে
একটি ধূসর খাতা দেখে দ্রুত হাতে তুলে দিই।

আবিষ্কৃত খাতার প্রথম দুটি পাতা
গায়েব হলেও অবশিষ্ট বেশ কটি পাতা জুড়ে
রয়েছে কবিতা, সত্যি বলতে কী, কতিপয় পদ্য
পড়তেই উদ্ভাসিত প্রকৃত কবির পরিচয়।

কখন যে রাত ওর কোমল শরীর
নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে, অদূরে গাছের
পাতাময় ডাল থেকে পাখির নিঝুম গান ঝরে
জ্যোৎস্নার ধরনে। ভেসে ওঠে আকাশে অনেক মুখ।


কামাল পাশা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কামাল পাশা
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


[তখন শরৎ-সন্ধ্যা। আস্মানের আঙিনা তখন কার্বালা ময়দানের মতো খুনখারাবির রঙে রঙিন। সেদিনকার মহা-আহবে গ্রীক-সৈন্য সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হইহা গিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশ সৈন্যই রণস্থলে হত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। বাকি সব প্রাণপণে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিতেছে। তুরস্কের জাতীয় সৈন্যদলের কাণ্ডারী বিশ্বত্রাস মহাবাহু কামাল-পাশা মহাহর্ষে রণস্থল হইতে তাম্বুতে ফিরিতেছেন। বিজয়োন্মত্ত সৈন্যদল মহাকল্লোলে অম্বর-ধরণী কাঁপাইয়া তুলিতেছে। তাহাদের প্রত্যেকের বুকে পিঠে দুই জন করিয়া নিহত বা আহত সৈন্য বাঁধা। যাহারা ফিরিতেছে তাহাদেরও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গোলাগুলির আঘাতে, বেয়নটের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত, পোষাক-পরিচ্ছদ ছিন্নভিন্ন, পা হইতে মাথা পর্যন্ত রক্তরঞ্জিত। তাহাদের কিন্তু সে দিকে ভ্রূক্ষেপও নাই। উদ্দাম বিজয়োন্মাদনার নেশায় মৃত্যু-কাতর রণক্লান্তি ভুলিয়া গিয়া তাহারা যেন খেপিয়া উঠিয়াছে। ভাঙা সঙ্গীনের আগায় রক্ত-ফেজ উড়াইয়া ভাঙা-খাটিয়া-আদি-দ্বারা-নির্মিত এক অভিনব চৌদলে কামালকে বসাইয়া বিষম হল্লা করিতে করিতে তাহারা মার্চ করিতেছে। ভূমিকম্পের সময় সাগর কল্লোলের মতো তাহাদের বিপুল বিজয়ধ্বনি আকাশে-বাতাসে যেন কেমন একটা ভীতি-কম্পনের সৃজন করিতেছে। বহু দূর হইতে সে রণ-তাণ্ডব নৃত্যের ও প্রবল ভেরী-তূরীর ঘন রোল শোনা যাইতেছে। অত্যধিক আনন্দে অনেকেরই ঘন ঘন রোমাঞ্চ হইতেছিল। অনেকেরই চোখ দিয়া অশ্রু গড়াইয়া পড়িতেছিল।]

[সৈন্য-বাহিনী দাঁড়াইয়া। হাবিলদার-মেজর তাহাদের মার্চ করাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল।

বিজয়োন্মত্ত সৈন্যগণ গাইতেছিল,–]


ঐ খেপেছে পাগ্লি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই।
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মাজর মার্চের হুকুম করিল,-কুইক্ মার্চ!]

লেফ্ট! রাইট! লেফ্ট!!
লেফ্ট! রাইট! লেফ্ট!!

[সৈন্যগণ গাহিতে গাহিতে মার্চ করিতে লাগিল]

ঐ খেপেছে পাগ্লি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- লেফ্ট্! রাইট!]

সাব্বাস্ ভাই! সাব্বাস্ দিই, সাব্বাস্ তোর শম্শেরে।
পাঠিয়ে দিলি দুশ্মনে সব যম-ঘর একদম্-সে রে!
বল্ দেখি ভাই বল্ হাঁ রে,
দুনিয়ার কে ডর্ করে না তুর্কির তেজ তলোয়ারে?

[লেফট্! রাইট! লেফ্ট্!]

খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
বুজ্দিল্ ঐ দুশ্মন্ সব বিল্কুল্ সাফ হো গিয়া!
খুব কিয়া ভাই খুব কিয়া!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!
দস্যুগুলোয় সাম্লাতে যে এমনি দামাল কামাল চাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো  কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- সাবাস সিপাই! লেফ্ট্! রাইট্! লেফ্ট!]

শির হতে এই পাঁও-তক্ ভাই লাল-লালে-লাল খুন মেখে
রণ-ভিতুদের শান্তি-বাণী শুন্বে কে?
পিণ্ডারিদের খুন-রঙিন
নোখ-ভাঙা এই নীল সঙিন
তৈয়ার হেয়্ হর্দম ভাই ফাড়্তে যিগর্ শত্রুদের!
হিংসুক-দল! জোর তুলেছি শোধ্ তাদের!
সাবাস্ জোয়ান! সাবাস্!
ক্ষীণজীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্–
এম্নি করে রে–
এমনি জোরে রে–
ক্ষীণজীবি ঐ জীবগুলোকে পায়ের তলেই দাবাস্!–
ঐ চেয়ে দ্যাখ্ আসমানে আজ রক্ত-রবির আভাস!–
সাবাস্ জোয়ান! সাবাস্!!

[লেফট্! রাইট! লেফ্ট্]

হিংসুটে ঐ জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ, আমরা মোটেই হইনি জের !
পরের মুলুক লুট করে খায় ডাকাত তারা ডাকাত !
তাই তাদের তারে বরাদ্দ ভাই আঘাত শুধু আঘাত !
কি বলো ভাই শ্যাঙাত?
হুর্রো হো !
হুর্রো হো ! !
দনুজ দলে দল্তে দাদা এম্নি দামাল কামাল চাই !
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার মেজর: রাইট্ হুইল্! লেফ্টা রাইট্! লেফ্ট্!
      সৈন্যগণ ডানদিকে মোড় ফিরিল।]

আজাদ মানুষ বন্দী করে, অধীন করে স্বাধীন দেশ,
কুল্ মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখালে ক'দিন বেশ,
মোদের হাতে তুর্কি-নাচন নাচ্লে তাধিন্ তাধিন্ শেষ!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!
বদ্-নসিবের বরাত খারাব বরাদ্দ তাই কর্লে কি না আল্লায়,
পিশাচগুলো পড়্ল এসে পেল্লায় এই পাগলাদেরই পাল্লায়!
এই পাগলাদেরই পাল্লায়!!
হুর্রো হো!
হুর্রো–
ওদের  কল্লা দেখে আল্লা ডরায়, হল্লা শুধু হল্লা,
ওদের    হল্লা শুধু হল্লা,
এক মুর্গির জোর গায়ে নেই, ধর্তে আসেন তুর্কি-তাজি
মর্দ গাজি মোল্লা!
হাঃ! হাঃ! হাঃ!
হেসে   নাড়িই ছেড়ে বা!
হা হা   হাঃ! হাঃ! হাঃ!

[হাবিলদার-মেজর-সাবাস সিপাই! লেফ্ট্ রাইট্! লেফ্ট্!
সাবাস সিপাই! ফের বল ভাই!]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই!
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই!
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো  কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

[হাবিলদার-মেজর;- লেফ্ট্ হুইল্! য়্যাজ্ য়ু ওয়্যার্!- রাইট হুইল!– লেফ্ট্! রাইট! লেফট্!]
[সৈন্যদের আঁখির সামনে অস্ত-রবির আশ্চর্য রঙের খেলা ভাসিয়া উঠিল।]

দেখ্চ কি দোস্ত অমন করে? হৌ হৌ হৌ!
সত্যি তো ভাই!– সন্ধেটা আজ দেখতে যেন সৈনিকেরই বৌ!
শহীদ সেনার টুক্টুকে বৌ লাল-পিরাহান-পরা,
স্বামীর খুনের ছোপ-দেওয়া, তায় ডগডগে আন্কোরা!–
না না না,–কল্জে যেন টুকরো-করে-কাটা
হাজার তরুণ শহীদ বীরের,–শিউরে উঠে গা'টা!
আস্মানের ঐ সিং-দরজায় টাঙিয়েছে কোন্ কসাই!
দেখতে পেলে এক্ষুনি গে এই ছোরাটা কল্জেতে তার বসাই!
মুণ্ডুটা তার খসাই!
গোস্বাতে আর পাইনে ভেবে কি যে করি দশাই!

[হাবিলদার-মেজর-সাবাস সিপাই! লেফ্ট্! রাইট্! লেফ্ট্!]
[ঢালু পার্বত্য পথ, সৈন্যগণ বুকের পিঠের নিহত ও আহত সৈন্যদের ধরিয়া সন্তর্পণে নামিল।]

আহা কচি ভাইরা আমার রে!
এমন কাঁচা জানগুলো খান্ খান্ করেছে কোন্ সে চামার রে?
আহা কচি ভাইরা আমার রে! !

[সাম্নে উপত্যকা। হাবিলদার মেজর :– লেফ্ট্ ফর্ম! সৈন্য- বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল!
হাবিলদার মেজর :-ফর্ওয়ার্ড ! লেফ্ট্ ! রাইট্ ! লেফ্ট্ !]

আস্মানের ঐ আঙরাখা
খুন-খারাবির রঙ মাখা
কি খুবসুরৎ বাঃ রে বা !
জোর বাজা ভাই কাহারবা!
হোক্ না ভাই এ কারবালা ময়দান–
আমরা যে গাই সাচ্চারই জয়-গান !
হোক্ না এ তোর কার্বালা ময়দান ! !
হুর্রো হো !
হুর্রো–

[সাম্নে উপত্যকা– হঠাৎ যেন পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে। হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিতে লাগিল।
হুকুম দিয়া গেল– 'মার্ক্ টাইম্।' সৈন্যরা এক স্থানেই দাঁড়াইয়া পা আছড়াইতে লাগিল–]

দ্রাম্! দ্রাম্! দ্রাম!
লেফ্ট্! রাইট! লেফ্ট!
দ্রাম্! দ্রাম্! দ্রাম্!
আস্মানে ঐ ভাস্মান যে মস্ত দুটো রঙের তাল,
একটা নিবিড় নীল-সিয়া আর একটা খুবই গভীর লাল,–
বুঝ্লে ভাই! ঐ নীল সিয়াটা শত্রুদের!
দেখ্তে নারে কারুর ভালো,
তাইতে কালো রক্ত-ধারার বইছে শিরায় স্রোত ওদের।
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
গৃধ্নু ওরা, লুব্ধ ওদের লক্ষ্য অসুর বল–
হিংস্র ওরা হিংস্র পশুর দল!
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সার জেনেছে সত্য যাহা হত্যা তারই!
জালিম ওরা অত্যাচারী!
সৈনিকের এই গৈরিকে ভাই–
জোর অপমান করলে ওরাই,
তাই তো ওদের মুখ কালো আজ, খুন যেন নীল জল!–
ওরা হিংস্র পশুর দল!
ওরা হিংস্র পশুর দল!!

[হাবিলদার-মেজর পথ খুঁজিয়া ফিরিয়া অর্ডার দিল-ফর্ওয়ার্ড! লেফ্ট্ হুইল্–
সৈন্যগণ আবার চলিতে লাগিল-লেফ্ট্ রাইট্! লেফ্ট্!]

সাচ্চা ছিল সৈন্য যারা শহীদ হলো মরে।
তোদের মতন পিঠ ফেরেনি প্রাণটা হাতে করে,–
ওরা শহীদ হলো মরে!
পিট্নি খেয়ে পিঠ যে তোদের ঢিট হয়েছে! কেমন!
পৃষ্ঠে তোদের বর্শা বেঁধা, বীর সে তোরা এমন!
মুর্দারা সব যুদ্ধে আসিস্! যা যা!
খুন দেখেছিস্ বীরের? হা দেখ্ টক্টকে লাল কেমন গরম তাজা!
মুর্দারা সব যা যা!!

[বলিয়াই কটিদেশ হইতে ছোরা খুলিয়া হাতের রক্ত লইয়া দেখাইল]

ত্রঁরাই বলেন হবেন রাজা!
আরে যা যা! উচিত সাজা
তাই দিয়েছে শক্ত ছেলে কামাল ভাই!

[হাবিলদার মেজর;- সাবাস সিপাই!]

এই তো চাই! এই তো চাই!
থাক্লে স্বাধীন সবাই আছি, নেই তো নাই, নেই তো নাই!
এই তো চাই!!

[কতকগুলি লোক অশ্রুপূর্ণ নয়নে এই দৃশ্য দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছিল।
         তাহাদের দেখিয়া সৈন্যগণ আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল।]

মার্ দিয়া ভাই মার্ দিয়া!
দুশ্মন্ সব হার্ গিয়া!
কিল্লা ফতে হো দিয়া।
পর্ওয়া নেহি, যা নে দো ভাই যো গিয়া!
কিল্লা ফতে হো গিয়া!
হুর্রো হো!
হুর্রো হো!

[হাবিলদার-মেজর;-সাবাস জোয়ান! লেফ্ট্! রাইট্!]

জোর্সে চলো পা মিলিয়ে,
গা হিলিয়ে,
এম্নি করে হাত দুলিয়ে!
দাদ্রা তালে 'এক দুই তিন' পা মিলিয়ে
ঢেউএর মত যাই!
আজ স্বাধীন এ দেশ! আজাদ মোরা বেহেশ্তও না চাই!
আর বেহেশ্তও না চাই!!

[হাবিলদার-মেজর:- সাবাস সিপাই! ফের বল ভাই!]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল তাই!
কামাল ! তু নে কামাল কিয়া ভাই !
হো হো কামাল ! তু নে কামাল কিয়া ভাই ! !

[সৈন্যদল এক নগরের পার্শ্ব দিয়া চলিতে লাগিল। নগর-বাসিনীরা ঝরকা হইতে মুখ বাড়াইয়া এই মহান
দৃশ্য দেখিতেছিল; তাহদের চোখ-মুখ আনন্দাশ্রুতে আপ্লুত। আজ বধূর মুখের বোরকা খসিয়া পড়িয়াছে।
ফুল ছড়াইয়া হাত দুলাইয়া তাহারা বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতেছিল। সৈন্যগণ চীৎকার করিয়া উঠিল।]

ঐ শুনেছিস্? ঝর্কাতে সব বল্ছে ডেকে বৌ-দলে,
'কে বীর তুমি? কে চলেছ চৌদলে?'
চিনিস্নে কি? এমন বোকা বোনগুলি সব!– কামাল এ যে কামাল!
পাগলি মায়ের দামাল ছেলে! ভাই যে তোদের!
তা না হলে কার হবে আর রৌশন্ এমন জামাল?
কামাল এ যে কামাল!!
উড়িয়ে দেবো পুড়িয়ে দেবো ঘর-বাড়ি সব সামাল!
ঘর-বাড়ি সব সামাল!!
আজ আমাদের খুন ছুটেছে, হোশ টুটেছে,
ডগ্মগিয়ে জোশ উঠেছে!
সাম্নে থেকে পালাও!
শোহরত দাও নওরাতি আজ! হর্ ঘরে দীপ জ্বালাও!
সাম্নে থেকে পালাও!
যাও ঘরে দীপ জ্বালাও!!

[হাবিলদার-মেজর:- লেফ্ট্ ফর্ম্! লেফ্ট্! রাইট! লেফ্ট্!-ফরওয়ার্ড্!]

[বাহিনীর মুখ হঠাৎ বামদিকে ফিরিয়া গেল। পার্শ্বেই পরিখার সারি। পরিখা-ভর্তি নিহত সৈন্যের
দল পচিতেছে এবং কতকগুলি অ-সামরিক নগরবাসী তাহা ডিঙাইয়া ডিঙাইয়া চলিতেছে।]

ইস্! দেখেছিস! ঐ কারা ভাই সাম্লে চলেন পা,
ফস্কে মরা আধ-মরাদের মাড়িয়ে ফেলেন বা!
ও তাই শিউরে ওঠে গা!
 হাঃ হাঃ হাঃ!
মরল যে সে মরেই গেছে,
বাঁচ্ল যারা রইল বেঁচে!
এই তো জানি সোজা হিসাব! দুঃখ কি তার আঁ?
মরায় দেখে ডরায় এরা! ভয় কি মরায়? বাঃ!
হাঃ হাঃ হাঃ!

[সম্মুখে সঙ্কীর্ণ ভগ্ন সেতু। হাবিলদার-মেজর অর্ডার দিল-'ফর্ম্ ইন্টু সিঙ্গল্ লাইন'। এক একজন করিয়া
বুকের পিঠের নিহত ও আহত ভাইদের চাপিয়া ধরিয়া অতি সন্তর্পণে 'স্লো মার্চ' করিয়া পার হইতে লাগিল।]

সত্যি কিন্তু ভাই!
যখন মোদের বক্ষে-বাঁধা ভাইগুলির এই মুখের পানে চাই–
কেমন সে এক ব্যথায় তখন প্রাণটা কাঁদে যে সে!
কে যেন দুই বজ্র-হাতে চেপে ধরে কল্জেখানা পেষে!
নিজের হাজার ঘায়েল জখম ভুলে তখন ডুক্রে কেন কেঁদেও ফেলি শেষে!
কে যেন ভাই কল্জেখানা পেষে!!
ঘুমোও পিঠে, ঘুমোও বুকে, ভাইটি আমার, আহা!
বুক যে ভরে হাহাকারে যতই তোরে সাব্বাস দিই,
যতই বলি বাহা!
লক্ষ্মীমণি ভাইটি আমার, আহা!!
ঘুমোও ঘুমোও মরণ-পরের ভাইটি আমার, আহা!!
অস্ত-পারের দেশ পারায়ে বহুৎ সে দূর তোদের ঘরের রাহা!
ঘুমোও এখন ঘুমোও ঘুমোও ভাইটি ছোট আহা!
মরণ-বধূর লাল রাঙা বর! ঘুমো!
আহা, এমন চাঁদমুখে তোর কেউ দিল না চুমো!

হতভাগা রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে
না জানি কোন্ ফুট্তে-চাওয়া মানুষ-কুঁড়ির হিয়ায়!
তরুণ জীবন এম্নি গেল, একটি রাতও পেলিনে রে বুকে কোনো প্রিয়ায়!
অরুণ খুনের তরুণ শহীদ! হতভাগ্য রে!
মরেও যে তুই দিয়ে গেলি বহুৎ দাগা রে!
তাই যত আজ লিখ্নে-ওয়ালা তোদের মরণ ফুর্তি-সে জোর লেখে!
এক লাইনে দশ হাজারের মৃত্যু-কথা! হাসি রকম দেখে!
মরলে কুকুর ওদের, ওরা শহীদ-গাথার বই লেখে!
খবর বেরোয় দৈনিকে,
আর   একটি কথায় দুঃখ জানান, 'জোর মরেছে দশটা হাজার সৈনিকে!'
আঁখির পাতা ভিজল কি না কোনো কালো চোখের,
জান্ল না হায় এ-জীবনে ঐ সে তরুণ দশটি হাজার লোকের!
পচে মরিস পরিখাতে, মা-বোনেরাও শুনে বলে 'বাহা'!
সৈনিকেরই সত্যিকারের ব্যথার ব্যথী কেউ কি রে নেই? আহা!–
আয় ভাই তোর বৌ এল ঐ সন্ধ্যা মেয়ে রক্ত-চেলি পরে,
আঁধার-শাড়ি পরবে এখন পশ্বে যে তোর গোরের বাসর-ঘরে!–
ভাবতে নারি, গোরের মাটি করবে মাটি এ মুখ কেমন করে–
সোনা মানিক ভাইটি আমার ওরে!
বিদায়-বেলায় আরেকটিবার দিয়ে যা ভাই চুমো!
অনাদরের ভাইটি আমার! মাটির মায়ের কোলে এবার ঘুমো!!

[নিহত সৈন্যদের নামাইয়া রাখিয়া দিয়া সেতু পার হইয়া আবার জোরে মার্চ
করিতে করিতে তাহাদের রক্ত গরম হইয়া উঠিল।]

ঠিক বলেছ দোস্ত তুমি!
      চোস্ত কথা! আয় দেখি–তোর হস্ত চুমি!
      মৃত্যু এরা জয় করেছে, কান্না কিসের?
আব্-জম্-জম্ আনলে এরা, আপনি পিয়ে কল্সি বিষের!
      কে মরেছে? কান্না কিসের?
বেশ করেছে!
দেশ বাঁচাতে আপ্নারি জান শেষ করেছে!
বেশ করেছে!!
শহীদ ওরাই শহীদ!
বীরের মতন প্রাণ দিয়েছে খুন ওদেরি লোহিত!
শহীদ ওরাই শহীদ!!

[এইবার তাহাদের তাম্বু দেখা গেল। মহাবীর আনোয়ার পাশা বহু সৈন্যসামন্ত ও সৈনিকদের
আত্মীয়-স্বজন লইয়া বিজয়ী বীরদের অভ্যর্থনা করিতে আসিতেছেন দেখিয়া সৈন্যগণ আনন্দে
আত্মহারা হইয়া 'ডবল মার্চ' করিতে লাগিল]

হুর্রো হো!
হুর্রো হো!!
ভাই-বেরাদর পালাও এখন! দূর্ রহো! দূর্ রহো!!
হুর্রো হো! হুর্রো হো!

[কামাল পাশাকে কোলে করিয়া নাচিতে লাগিল]

    হৌ হৌ হৌ! কামাল জিতা রও!
            কামাল জিতা রও!
    ও কে আসে? আনোয়ার ভাই?–
    আনোয়ার ভাই! জানোয়ার সব সাফ!!
    জোর নাচো ভাই! হর্দম্ দাও লাফ!
            আজ জানোয়ার সব সাফ!
    হুর্রো হো! হুর্রো হো!!
সব-কুছ আব্ দূর্ রহো! – হুর্রো হো! হুর্রো হো!!
রণ জিতে জোর মন মেতেছে!-সালাম সবায় সালাম!–
                              নাচ্না থামা রে!
জখ্মি ঘায়েল ভাইকে আগে আস্তে নামা রে!
               নাচ্না থামা রে!–

            [আহতদেরে নামাইতে নামাইতে]

     কে ভাই? হাঁ হাঁ, সালাম!
–ঐ শোন্ শোন্ সিপাহ্-সালার কামাল ভাই-এর কামাল।

              [সেনাপতির অর্ডার আসিল]

  'সাবাস! থামো! হো! হো!
   সাবাস! হল্ট্! এক! দো!'

[এক নিমিষে সমস্ত কল-রোল নিস্তব্ধ হইয়া গেল। তখনো কি তারায় তারায় যেন ঐ বিজয়
গীতির হারা-সুর বাজিয়া বাজিয়া ক্রমে ক্ষীণ হইতে ক্ষীণ হইয়া মিলিয়া গেল–]

ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই!
    অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই!
              কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই।
    হো হো,     কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!!


ধূমকেতু কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ধূমকেতু
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


আমি     যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
           এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত      সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম       ধূম-কুণ্ডুলি করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘর ঘোলাটে!
আমি     অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি     স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার–
আর     মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ,
আমি    অশিব তিক্ত অভিশাপ!

আমি     সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও ঘুরি শূন্যে,
আমি     বিষ-ধূম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান-অভিমুন্যে।
শোঁও    শন-নন-নন-শন-নন-নন শাঁই শাঁই,
ঘুর্       পাক্ খাই, ধাই পাঁই পাঁই
মম       পুচ্ছে জড়ায়ে সৃষ্টি;
করি      উল্কা-অশনি-বৃষ্টি,–
আমি     একটা বিশ্ব গ্রাসিয়াছি, পারি গ্রাসিতে এখনো ত্রিশটি।
আমি     অপঘাত দুর্দৈব রে আমি সৃষ্টির অনাসৃষ্টি!

আমি     আপনার বিষ-জ্বালা-মদ-পিয়া মোচড় খাইয়া খাইয়া
জোর    বুঁদ হয়ে আমি চলেছি ধাইয়া ভাইয়া!
শুনি     মম বিষাক্ত 'রিরিরিরি'-নাদ
           শোনায় দ্বিরেফ-গুঞ্জন সম বিশ্ব-ঘোরার প্রণব-নিনাদ!
           ধূর্জটি-শিখ করাল পুচ্ছে
           দশ অবতারে বেঁধে ঝ্যাঁটা করে ঘুরাই উচ্চে, ঘুরাই–
আমি    অগ্নি-কেতন উড়াই!–
আমি    যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই      স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ       বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত
মম     অগ্নি-দাহনে জ্বলে পুড়ে তাই ঠুঁটো সে জগন্নাথ!
আমি   জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই     বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
আমি   জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তাও!
তাই     বিপ্লব আনি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তাও!
তোর   নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুথু দি!
আর    যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি।
মম     তূরীয় লোকের তির্যক্ গতি তূর্য গাজন বাজায়
মম     বিষ নিশ্বাসে মারীভয় হানে অরাজক যত রাজায়!

কচি    শিশু-রসনায় ধানি-লঙ্কার পোড়া ঝাল
আর   বন্ধ কারায় গন্ধক ধোঁয়া, এসিড, পটাশ, মোন্‌ছাল,
আর   কাঁচা কলিজায় পচা ঘা'র সম সৃষ্টিরে আমি দাহ করি
                      আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই!
পেলে  বাহান্ন-শও জাহান্নমেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই!

আমি  যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু–
এই    স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
আমি  শি শি শি প্রলয়-শিশ্ দিয়ে ঘুরি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি,
আমি  ত্রিভুবন তার পোড়ায়ে মারিয়া আমিই করিব মুখাগ্নি!
তাই আমি ঘোর তিক্ত সুখে রে, একপাক ঘুরে বোঁও করে ফের দু'পাক নি!
                      কৃতঘ্নী আমি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি!

         পঞ্জর মম খর্পরে জ্বলে নিদারুণ যেই বৈশ্বানর–
                      শোন্ রে মর, শোন্ অমর!–
                      সে যে তোদের ঐ বিশ্বপিতার চিতা!
        এ চিতাগ্নিতে জগদীশ্বর পুড়ে ছাই হবে, হে সৃষ্টি জানো কি তা?
        কি বলো? কি বলো? ফের বলো ভাই আমি শয়তান-মিতা!
হো হো  ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালায়েছি বুকে চিতা!
ছোট   শন শন শন ঘর ঘর সাঁই সাঁই!
                      ছোট পাঁই পাঁই!
তুই    অভিশাপ তুই শয়তান তোর অনন্তকাল পরমাই!
ওরে   ভয় নাই তোর মার নাই!!
তুই    প্রলয়ঙ্কর ধূমকেতু,
তুই    উগ্র ক্ষিপ্ত তেজ-মরীচিকা ন'স্ অমরার ঘুম-সেতু
                    তুই ভৈরব ভয় ধূমকেতু!
আমি    যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই      স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু !

ঐ       ঈশ্বর-শির উল্লজ্ঘিতে আমি আগুনের সিঁড়ি,
আমি   বসিব বলিয়া পেতেছে ভবানী ব্রহ্মার বুকে পিঁড়ি !
খ্যাপা  মহেশের বিক্ষিপ্ত পিনাক, দেবরাজ-দম্ভোলি
লোকে  বলে মোরে, শুনে হাসি আমি আর নাচি বব-বম্ বলি !
এই    শিখায় আমার নিযুত ত্রিশূল বাশুলি বজ্র-ছড়ি
ওরে   ছড়ানো রয়েছে, কত যায় গড়াগড়ি !
মহা    সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি,
তার    ললাট তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি !
তাই   টিটকিরি দিয়ে হাহা হেসে উঠি,

আমি   বাজাই আকাশে তালি দিয়া 'তাতা-উর্-তাক্'
আর   সোঁও সোঁও করে প্যাঁচ দিয়ে খাই চিলে-ঘুড়ি সম ঘুরপাক!
মম    নিশাস আভাসে অগ্নি-গিরির বুক ফেটে ওঠে ঘুৎকার
আর   পুচ্ছে আমার কোটি নাগ-শিশু উদ্গারে বিষ-ফুৎকার!

কাল   বাঘিনী যেমন ধরিয়া শিকার
                      তখনি রক্ত শোষে না রে তার,
          দৃষ্টি-সীমায় রাখিয়া তাহারে উগ্রচণ্ড-সুখে
          পুচ্ছ সাপটি খেলা করে আর শিকার মরে সে ধুঁকে!
                      তেমনি করিয়া ভগবানে আমি
                      দৃষ্টি-সীমায় রাখি দিবাযামী
ঘিরিয়া  ঘিরিয়া খেলিতেছি খেলা, হাসি পিশাচের হাসি
                      এই অগ্নি-বাঘিনী আমি যে সর্বনাশী!

আজ   রক্ত-মাতাল উল্লাসে মাতি রে–
মম    পুচ্ছে ঠিকরে দশগুণ ভাতি,
                      রক্ত রুদ্র উল্লাসে মাতি রে!
ভগবান? সে তো হাতের শিকার!– মুখে ফেনা উঠে মরে!
ভয়ে   কাঁপিছে, কখন পড়ি গিয়া তার আহত বুকের 'পরে!
                      অথবা যেন রে অসহায় এক শিশুরে ঘিরিয়া

অজগর কাল-কেউটে সে কোন ফিরিয়া ফিরিয়া
চায়, আর ঘোরে শন্‌ শন্ শন্,
ভয়-বিহ্বল শিশু তার মাঝে কাঁপে রে যেমন–
                      তেমনি করিয়া ভগবানে ঘিরে
ধূমকেতু-কালনাগ অভিশাপ ছুটে চলেছি রে,
                      আর সাপে-ঘেরা অসহায় শিশু সম
বিধাতা তাদের কাঁপিছে রুদ্র ঘূর্ণির মাঝে মম!

আজিও ব্যথিত সৃষ্টির বুকে ভগবান কাঁদে ত্রাসে,
স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি পাছে বা বড় হয়ে তারে গ্রাসে!


কুহেলিকা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কুহেলিকা
কাজী নজরুল ইসলাম.....চক্রবাক


তোমরা আমায় দেখ্‌তে কি পাও আমার গানের নদী-পারে ?
নিত্য কথায় কুহেলিকায় আড়াল করি আপনারে ।
সবাই যখন মত্ত হেথায় পান ক’রে মোর সুরের সুরা
সব-চেয়ে মোর আপন যে জন স-ই কাঁদে গো তৃষ্ণাতুরা ।
আমার বাদল-মেঘের জলে ভর্‌ল নদী সপ্ত পাথার ,
ফটিক-জলের কণ্ঠে কাঁদে তৃপ্তি-হারা সেই হাহাকার !
হায় রে , চাঁদের জ্যোৎস্না-ধারায় তন্দ্রাহারা বিশ্ব-নিখিল ,
কলঙ্ক তার নেয় না গো কেউ , রইল জু’ড়ে চাঁদেরি দিল !


রক্তাম্বরধারিণী মা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


রক্তাম্বরধারিণী মা

কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


রক্তাম্বর পর মা এবার
            জ্বলে পুড়ে যাক শ্বেত বসন।
দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন
            বাজে তরবারি ঝনন-ঝন।
সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেল মা গো
            জ্বাল সেথা জ্বাল কাল্-চিতা।
তোমার খড়গ-রক্ত হউক
            স্রষ্টার বুকে লাল ফিতা।
এলোকেশে তব দুলুক ঝন্‌ঝা
            কাল-বৈশাখী ভীম তুফান,
চরণ-আঘাতে উদ্গারে যেন
            আহত বিশ্ব রক্ত-বান।
নিশ্বাসে তব পেঁজা-তুলো সম
            উড়ে যাক মা গো এই ভুবন,
অ-সুরে নাশিতে হউক বিষ্ণু
            চক্র মা তোর হেম-কাঁকন।
টুটি টপে মারো অত্যাচারে মা,
            গল-হার হোক নীল ফাঁসি,
নয়নে তোমার ধূমকেতু-জ্বালা
            উঠুক সরোষে উদ্ভাসি।
হাসো খলখল, দাও করতালি,
            বলো হর হর শঙ্কর!
আজ হতে মা গো অসহায় সম
            ক্ষীণ ক্রন্দন সম্বর।
মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা,
            সে চাবুক করো নভ-তড়িৎ,
জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
            লালে-লাল হোক শ্বেত হরিৎ।
নিদ্রিত শিবে লাথি মারো আজ,
            ভাঙো মা ভোলার ভাঙ-নেশা,
পিয়াও এবার অ-শিব গরল
           নীলের সঙ্গে লাল মেশা।
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
           অশিব-নাশিনী চণ্ডি রূপ;
দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই
           আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তূপ।
শ্বেত শতদল-বাসিনী নয় আজ
            রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
            সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।


বিদ্রোহী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


বিদ্রোহী
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


বল        বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল        বীর
বল   মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’      
চন্দ্র  সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’      
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া      
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,      
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! 
মম    ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল        বীর 
আমি   চির উন্নত শির!

আমি   চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-    প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি   মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি   দুর্বার,আমি   ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি   অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি   দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি   মানি না কো কোন আইন,
আমি   ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি   ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি   বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল        বীর
চির-উন্নত মম শির!

আমি   ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, 
আমি   পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।           
আমি   নৃত্য-পাগল ছন্দ, 
আমি   আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। 
আমি   হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, 
আমি   চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’           
পথে   যেতে যেতে চকিতে চমকি’           
ফিং    দিয়া দিই তিন দোল; 
আমি   চপলা-চপল হিন্দোল। 
আমি   তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, 
করি    শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, 
আমি   উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! 
আমি   মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; 
আমি   শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর!
বল        বীর
আমি   চির উন্নত শির!

আমি   চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি   দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।
আমি   হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি, 
আমি   যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি। 
আমি   সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান, 
আমি   অবসান, নিশাবসান। 
আমি   ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য 
মম      এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য; 
আমি   কৃষ্ন-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর। 
আমি   ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল        বীর
চির-   উন্নত মম শির!

আমি    সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক, 
আমি    যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক। 
আমি    বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস, 
আমি    আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ! 
আমি    বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার, 
আমি    ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার, 
আমি    পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড, 
আমি    চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড! 
আমি    ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য, 
আমি    দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব। 
আমি    প্রাণ খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি    মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস! 
আমি    কভূ প্রশান্ত কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী, 
আমি    অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী! 
আমি    প্রভোন্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল,  
আমি    উদ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল, 
আমি    উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!
আমি    বন্ধন-হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি    ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি    উন্মন মন উদাসীর, 
আমি    বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি    বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের, 
আমি    অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা,
প্রিয়      লান্চিত বুকে গতি ফের 
আমি    অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত     চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি    গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি    চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
আমি    চির-শিশু, চির-কিশোর,     
আমি    যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি    উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,     
আমি    পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি    আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি     
আমি    মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি    তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি    সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি    উথ্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি    বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি      ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ      মর্ত্য-করতলে,     
তাজী    বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার        
           হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!

আমি    বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্ণি, কালানল,     
আমি    পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল! 
আমি    তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি    ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।

ধরি     বাসুকির ফণা জাপটি’ -      
ধরি     স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি   দেব শিশু, আমি চঞ্চল, 
আমি   ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি   অর্ফিয়াসের বাঁশরী,                
মহা-    সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম 
ঘুম      চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম                
মম      বাঁশরীর তানে পাশরি’                
আমি    শ্যামের হাতের বাঁশরী। 
আমি    রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া, 
ভয়ে     সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি    বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি   শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা, 
কভু    ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি   ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি   অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি   ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি   ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি   জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি   মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,          
আমি   অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়।          
আমি   মানব দানব দেবতার ভয়,                    
          বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,                    
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য, 
আমি   তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!       
আমি   উন্মাদ, আমি উন্মাদ!! 
আমি   চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!

আমি   পরশুরামের কঠোর কুঠার          
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!                
আমি   হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি   উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
          মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত                           
          আমি সেই দিন হব শান্ত, 
যবে     উত্‍পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না -
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -          
           বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত                       
আমি    সেই দিন হব শান্ত।

আমি    বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি    স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি    বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি     খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

আমি    চির-বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব      ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!


আগমনী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আগমনী
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


একি    রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন–
ঝন
     রনরন রন ঝনঝন!
সেকি  দমকি দমকি
                ধমকি ধমকি
দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি গমকি
           ওঠে চোটে চোটে,
           ছোটে লোটে ফোটে
বহ্নি-ফিনিকি চমকি   চমকি
            ঢাল-তলোয়ারে খনখন!
একি      রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন
রণ        ঝনঝন ঝন রণরণ!

হৈ        হৈ রব
ঐ         ভৈরব
হাঁকে,    লাখে লাখে
ঝাঁকে    ঝাঁকে ঝাঁকে
লাল      গৈরিক-গায় সৈনিক ধায় তালে তালে
ওই       পালে পালে,
            ধরা কাঁপে দাপে।
জাঁকে    মহাকাল কাঁপে থরথর!
রণে      কড়কড় কাড়া-খাঁড়া-ঘাত,
শির      পিষে হাঁকে রথ-ঘর্ঘর-ধ্বনি ঘররর!
'গুরু    গরগর' বোলে ভেরী তূরী,
'হর      হর হর'
করি     চীৎকার ছোটে সুরাসুর-সেনা হনহন!
ওঠে    ঝন্‌ঝা ঝাপটি দাপটি সাপটি
          হু-হু-হু-হু-হু-হু-শনশন!
ছোটে  সুরাসুর-সেনা হনহন!

তাতা   থৈথৈ তাতা থৈথৈ খল খল খল
নাচে   রণ-রঙ্গিণী সঙ্গিনী সাথে,
         ধকধক জ্বলে জ্বলজ্বল
বুকে   মুখে চোখে রোষ-হুতাশন!
         রোস্ কোথা শোন্!

ঐ     ডম্বরু-ঢোলে ডিমিডিমি বোলে,
        ব্যোম মরুৎ স-অম্বর দোলে,
        মম-বরুণ কী কল-কল্লোলে চলে উতরোলে
        ধ্বংসে মাতিয়া তাথিয়া তাথিয়া
        নাচিয়া রঙ্গে! চরণ-ভঙ্গে
        সৃষ্টি সে টলে টলমল!

ওকি  বিজয়-ধ্বনি সিন্ধু গরজে কলকল কল কলকল!
         ওঠে    কোলাহল,
         কূট      হলাহল
         ছোটে   মন্থনে পুন রক্ত-উদধি,
                    ফেনা-বিষ ক্ষরে গলগল!
টলে   নির্বিকার সে বিধাত্রীরো গো
         সিংহ-আসন টলমল!
কার   আকাশ-জোড়া ও আনত-নয়ানে
         করুণা-অশ্রু ছলছল!

বাজে   মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁজর ঝম্‌ঝম,
নাচে    ধূর্জটি সাথে প্রমথ ববম্ বম্‌বম্!
লাল     লালে-লাল ওড়ে ঈশানে নিশান যুদ্ধের,
ওঠে    ওঙ্কার রণ-ডঙ্কার,
নাদে    ওম্ ওম্ মহাশঙ্খ বিষাণ রুদ্রের!
ছোটে   রক্ত-ফোয়ারা বহ্নির বান রে!
           কোটি   বীর-প্রাণ
           ক্ষণে    নির্বাণ
তবু      শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ
          গমকে শিরায় গম্‌গম্!
ভয়ে    রক্ত-পাগল প্রেত পিশাচেরও
          শিরদাঁড়া করে চন্‌চন্!
যত      ডাকিনী যোগিনী বিস্ময়াহতা,
           নিশীথিনী ভয়ে থম্‌থম্!
বাজে    মৃত সুরাসুর-পাঁজরে ঝাঁঝর ঝম্‌ঝম্!

ঐ        অসুর-পশুর মিথ্যা দৈত্য-সেনা যত
হত       আহত করে রে দেবতা সত্য!
           স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, মাতাল রক্ত-সুরায়;
           ত্রস্ত বিধাতা,
মস্ত পাগল পিনাক-পাণি স-ত্রিশূল প্রলয়-হস্ত ঘুরায়!
           ক্ষিপ্ত সবাই রক্ত-সুরায়!

           চিতার উপরে চিতা সারি সারি,
           চারিপাশে তারি
           ডাকে কুক্কুর গৃহিনী শৃগাল!
           প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!
           প্রলয়-দোলায় দুলিছে ত্রিকাল!!
আজ   রণ-রঙ্গিণী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ,
           দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!
           পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংস-বাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকে–
শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!
            'নাই দানব
             নাই অসুর,–
             চাইনে সুর,
             চাই মানব!'–
             বরাভয়-বাণী ঐ রে কার
             শুনি, নহে হৈ রৈ এবার!

             ওঠ্ রে ওঠ্,
             ছোট্ রে ছোট্!
             শান্ত মন,
             ক্ষান্ত রণ!–

             খোল্ তোরণ,
             চল্ বরণ
             করব্ মা'য়;
             ডর্‌ব কায়?
ধরব পা'য় কার্ সে আর,
বিশ্ব-মা'ই পার্শ্বে যার?
আজ   আকাশ-ডোবানো নেহারি তাঁহারি চাওয়া,
 ঐ      শেফালিকা-তলে কে বালিকা চলে?
          কেশের গন্ধ আনিছে আশিন-হাওয়া!
          এসেছে রে সাথে উৎপলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ঐ,
          সরসিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
এল     বীণা-পাণি অমলা ঐ!

           এসেছে গনেশ,
           এসেছে মহেশ,
           বাস্‌রে বাস্!
          জোর উছাস্!!
এল সুন্দর সুর-সেনাপতি,
সব মুখ এ যে চেনা-চেনা অতি!
বাস্ রে বাস্‌ জোর উছাস্!!

          হিমালয়! জাগো! ওঠো আজি,
          তব সীমা লয় হোক।
ভুলে যাও শোক– চোখে জল ব'ক
শান্তির– আজি শান্তি-নিলয় এ আলয় হোক!
          ঘরে ঘরে আজি দীপ জ্বলুক!
          মা'র আবাহন-গীত্ চলুক!
          দীপ জ্বলুক!
          গীত চলুক!!
আজ   কাঁপুক মানব-কলকল্লোলে কিশলয় সম নিখিল ব্যোম্!
           স্বা-গতম্!
           স্বা-গতম্!!
           মা-তরম্!
           মা-তরম্!!
ঐ   ঐ  ঐ  বিশ্ব কণ্ঠে
বন্দনা- বাণী লুণ্ঠে-'বন্দে মাতরম্!!!'


চিরশিশু কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


চিরশিশু

কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


নাম-হারা তুই পথিক-শিশু এলি অচিন দেশ পারায়ে।
কোন্‌ নামের আজ প’রলি কাঁকনম বাঁধনহারায় কোন্‌ কারা এ।।
          আবার মনের মতন ক’রে
          কোন্‌ নামে বল ডাক্‌ব তোরে!
          পথ-ভোলা তুই এই সে ঘরে
          ছিলি ওরে এলি ওরে
          বারে বারে নাম হারায়ে।।

ওরে যাদু ওরে মাণিক, আঁধার ঘরের রতণ-মাণি!
ক্ষুধিত ঘর ভ’রলি এনে ছোট্ট হাতের একটু ননী।
          আজ যে শুধু নিবিড় সুখে
          কান্না-সায়র উথলে বুকে,
          নতুন নামে ডাকতে তোকে
          ওরে ও কে কন্ঠ র”খে’
          উঠছে কেন মন ভারায়ে!
অস্ত হ’তে এলে পথিক উদয় পানে পা বাড়ায়ে।।


প্রলয়োল্লাস কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


প্রলয়োল্লাস
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

আস্‌ছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙ্‌ল আগল।
        মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
        মহাকালের চণ্ড-রূপে–
                      ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আস্‌ছে ভয়ঙ্কর–
        ওরে ঐ হাস্‌ছে ভয়ঙ্কর!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপ্‌টা মেরে গগন দুলায়,
সর্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!
        বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
        রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
                দোদুল্‌ দোলে!
অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর–
        ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

দ্বাদশ রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন-কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
        বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
        সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে
                  কপোল-তলে!
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর 'পর–
        হাঁকে ঐ 'জয় প্রলয়ঙ্কর!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

মাভৈ মাভৈ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে!
জরায়-মরা মুমূর্ষদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে!
       এবার মহা-নিশার শেষে
       আস্‌বে ঊষা অরুণ হেসে
                     করুণ বেশে!
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
       আলো তার ভর্‌বে এবার ঘর।
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত-চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে!
খুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
       গগন-তলের নীল খিলানে।
       অন্ধ করার বন্ধ কূপে
       দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
                      পাষাণ স্তূপে!
এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর–
       শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর।
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? –প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন– জীবন-হারা অ-সুন্দরে কর্‌তে ছেদন!
       তাই সে এমন কেশে বেশে
       প্রলয় বয়েও আস্‌ছে হেসে–
                        মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!–
       বধূরা প্রদীপ তুলে ধর্‌!
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!–
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!


আমাদের নারী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আমাদের নারী
কাজী নজরুল ইসলাম


গুনে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়। 
রূপে লাবন্যে মাধুরী ও শ্রীতে হুরী পরী লাজ পায়।। 
নর নহে, নারী ইসলাম পরে প্রথম আনে ঈমান, 
আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব-প্রথম মুসলমান, 
পুরুষের সব গৌরবস্নান এক এই  মহিমায়।। 
নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী, 
যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভুমে কওসর পানি, 
যাঁর গুণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি  নর-নারী আজো গায়।। 
রহিমার মত মহিমা কাহার, তাঁর সম সতী কেবা, 
নারী নয় যেন মূর্তি ধরিয়া এসেছিল পতি সেবা 
মোদের খাওয়ালা জগতের আলা বীরত্বে গরিমায়।। 
রাজ্য শাসনের রিজিয়ার নাম ইতিহাসে অক্ষয়, 
শৌর্যে সাহসে চাঁদ সুলতানা বিশ্বের বিস্ময়। 
জেবুন্নেসার তুলনায় কোথায় জ্ঞানের তাপস্যার।। 
বারো বছরের বালিকা লায়লা ওহাবীব দলপতি 
মোদের সাকিনা জাহানারা যেন ধৈর্য মূর্তিমতী, 
সে গৌরবের গোর হয়ে গেছে আঁধারের বোরকায়।। 
আঁধার হেরেমে বন্দিনী হলো সহসা আলোর মেয়ে, 
সেই দিন হতে ইসলাম গেল গ্লানির কালিতে ছেয়ে 
লক্ষ খালিদা আসিবে, যদি এ নারীরা মুক্তি পায়।।


আশীর্বাদ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আশীর্বাদ
কাজী নজরুল ইসলাম


আপনার ঘরে আছে যে শত্রু 
তারে আগে করো জয়, 
ভাঙো সে দেয়াল, প্রদীপের আলো 
যাহা আগুলিয়া রয়। 
অনাত্বীয়রে আত্বীয় করো, 
তোমার বিরাট প্রাণ 
করে না কো যেন কোনোদিন কোনো 
মানুষে অসম্মান। 
সংসারের মিথ্যা বাঁধন 
ছিন্ন হোক আগে, 
কবে সে তোমার সকল দেউল 
রাঙিবে আলোর রাগে।