Showing posts with label মানবতাবাদী কবিতা. Show all posts
Showing posts with label মানবতাবাদী কবিতা. Show all posts

খুকির সম্পত্তি কবিতা – জসীমউদ্দীন


খুকির সম্পত্তি
জসীমউদদীন


শিউলি নামের খুকির সনে আলাপ আমার অনেক দিনের থেকে
হাসিখুশি মিষ্টমিশি অনেক কথা কই যে তারে ডেকে।
সেদিন তার কইনু 'খুকি- কী কী জিনিস কওতো তোমার আছে?
সগৌরবে বলল, অনেক-অনেক কিছু আছে তাহার কাছে;
সাতটা ভাঙা পেন্সিল আর নীল বরণের ভাঙা দু-খান কাঁচ,
মারবেল আছে তিন-চারটে, কড়ি আছে গণ্ডা ছ কি পাঁচ।
ডলি পুতুল, মিনি পুতুল, কাঠের পুতুল, মাটির পুতুল আর-
পুঁতির মালা, রঙিন ঝিনুক, আরও অনেক খেলনা আছে তার।
আছে তাহার পাতার বাঁশি, টিনের উনুন, শোলার পাখির ছা
সাতটা আছে ঝুমঝুমি তার আর আছে তার একটি খেলার মা।


নারী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


নারী
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই-
              আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
              বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
              অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
              বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
              অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
              নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
              তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
              অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
              ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
              এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
              নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
              তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল,
              অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
              জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
              সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
              পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ!
              দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
              পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
              শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
              নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
              নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
              ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
              নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
              নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
              যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
              নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
              জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
              জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
              মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
              কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
              কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
              কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
              বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
              কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
              প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
              রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
              রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

পুরুষ হৃদয়-হীন,
              মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
              ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
              বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
              খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
              লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
              নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
              দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
              অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
              বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!

তিনি নর-অবতার-
              পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
              পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
              নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
সে যুগ হয়েছে বাসি,
              যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
              বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
              কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
              নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
              আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
যুগের ধর্ম এই-
              পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

শোনো মর্ত্যের জীব!
              অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
              স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
              করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
              আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
              আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
              চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
              মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
              যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
              দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

ধরার দুলালী মেয়ে,
              ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
              কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
              ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
              সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
              মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
              ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
              আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
              পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
              লুটায়ে পড়িবে ও চরন-তলে দলিত যমের সাথে!
              এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
              যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
সেদিন সুদূর নয়-
              যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!


মানুষ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


গাহি সাম্যের গান-
                মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্‌ ।
                নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
                সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- 
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
                ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’
                স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
                দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
                জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
                ডাকিল পান’, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন!’
                সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
                তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
                ভুখারী ফুকারি’ কয়,
                ‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
                মসজিদে কাল শির্‌নী আছিল,-অঢেল গোস–র”টি
                বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি,
                এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্‌
                বলে, ‘বাবা, আমি ভূখা-ফাকা আমি আজ নিয়ে সাত দিন!’
                তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা-‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
                ভূখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
                ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা
                সোজা পথ দেখ!’ গোস–র”টি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
                ভুখারী ফিরিয়া চলে, চলিতে চলিতে বলে-
                ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
                আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে বন্ধ করনি প্রভু।
                তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
                মোল্লা-পুর”ত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
                কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
                ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
                খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
                সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
                তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
                ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
                ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন’ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
                যাহারা আনিল গ্রন’-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
                পূজিছে গ্রন’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
                মানুষ এনেছে গ্রন’;-গ্রন’ আনেনি মানুষ কোনো।
                আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
                কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
                আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
                তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
                আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
                কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
                হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
                আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
                হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
                কে জানে কাহার অন- ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
                কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
                হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!
                অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উ”চ নহে,
                আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
                তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন’ ভজনালয়
                ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
                হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
                জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
                যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
                আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
                ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
                ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
                আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
                তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
                রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
                হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
                দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
                যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
                তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।
                দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
                তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
                তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
                দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
                কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!

                বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
                নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
                মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
                তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
                তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
                তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!
তোমারি কামনা-রাণী
                যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।


পাপ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


পাপ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই!-
                   যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।
                   এ পাপ-মুলুকে পাপ করেনি করেনিক’ কে আছে পুরুষ-নারী?
                   আমরা ত ছার; পাপে পঙ্কিল পাপীদের কাণ্ডারী! 
                   তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,
                   দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল!
                   আদম হইতে শুরু ক’রে এই নজরুল তক্‌ সবে
                   কম-বেশী ক’রে পাপের ছুরিতে পুণ্য করেছে জবেহ্‌ !
বিশ্ব পাপস্থান
                   অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্‌!
থর্মান্ধরা শোনো,
                   অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!
                   পাপের পঙ্কে পুণ্য-পদ্ম, ফুলে ফুলে হেথা পাপ!
                   সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ।
                   এদের এড়াতে না পারিয়া যত অবতার আদি কেহ
                  পুণ্যে দিলেন আত্মা ও প্রাণ, পাপেরে দিলেন দেহ।
বন্ধু, কহিনি মিছে,
                  ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব হ’তে ধ’রে ক্রমে নেমে এস নীচে-
                  মানুষের কথা ছেড়ে দাও, যত ধ্যানী মুনি ঋষি যোগী
                  আত্মা তাঁদের ত্যাগী তপস্বী, দেহ তাঁহাদের ভোগী!
এ-দুনিয়া পাপশালা,
                  ধর্ম-গাধার পৃষ্ঠে এখানে শূণ্য-ছালা!

হেথা সবে সম পাপী,
                  আপন পাপের বাট্‌খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!
                  জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
                  টুপি প’রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।
                  পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?
                  পুলিশী পোশাক পরিয়া হ’য়েছ পাপের আসামী গুম।

বন্ধু, একটা মজার গল্প শোনো,
                 একদা অপাপ ফেরেশতা সব স্বর্গ-সভায় কোনো
                 এই আলোচনা করিতে আছিল বিধির নিয়মে দুষি,’
                 দিন রাত নাই এত পূজা করি, এত ক’রে তাঁরে তুষি,
                 তবু তিনি যেন খুশি নন্‌-তাঁর যত স্নেহ দয়া ঝরে
                 পাপ-আসক্ত কাদা ও মাটির মানুষ জাতির’ পরে!
                 শুনিলেন সব অন্তর্যামী, হাসিয়া সবারে ক’ন,-
                 মলিন ধুলার সন-ান ওরা বড় দুর্বল মন,
                 ফুলে ফুলে সেথা ভুলের বেদনা-নয়নে , অধরে শাপ,
                 চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ!
                সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রেনীতে চন্দ্রহার,
                চরণে লাক্ষা, ঠোটে তাম্বুল, দেখে ম’রে আছে মার!
                প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান,
                বুকে বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।

                দেবদুত সব বলে, ‘প্রভু, মোরা দেখিব কেমন ধরা,
                কেমনে সেখানে ফুল ফোটে যার শিয়রে মৃত্যু-জরা!’
                কহিলেন বিভু-‘তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ যে দুইজন
                যাক্‌ পৃথিবীতে, দেখুক কি ঘোর ধরণীর প্রলোভন!’
                ‘হারুত’ ‘মারুত’ ফেরেশতাদের গৌরব রবি-শশী
                ধরার ধুলার অংশী হইল মানবের গৃহে পশি’।
                কায়ায় কায়ায় মায়া বুলে হেথা ছায়ায় ছায়ায় ফাঁদ,
                কমল-দীঘিতে সাতশ’ হয়েছে এই আকাশের চাঁদ!
                শব্দ গন্ধ বর্ণ হেথায় পেতেছে অরূপ-ফাঁসী,
               ঘাটে ঘাটে হেথা ঘট-ভরা হাসি, মাঠে মাঠে কাঁদে বাঁশী!
               দুদিনে আতশী ফেরেশতা প্রাণ- ভিজিল মাটির রসে,
               শফরী-চোখের চটুল চাতুরী বুকে দাগ কেটে বসে।
               ঘাঘরী ঝলকি’ গাগরী ছলকি’ নাগরী ‘জোহরা’ যায়-
               স্বর্গের দূত মজিল সে-রূপে,  বিকাইল রাঙা পা’য়!
               অধর-আনার-রসে ডুবে গেল দোজখের নার-ভীতি,
               মাটির সোরাহী মস-ানা হ’ল আঙ্গুরী খুনে তিতি’!
               কোথা ভেসে গেল-সংযম-বাঁধ, বারণের বেড়া টুটে,
               প্রাণ ভ’রে পিয়ে মাটির মদিরা ওষ্ঠ-পুষ্প-পুটে।
               বেহেশ্‌তে সব ফেরেশ্‌তাদের বিধাতা কহেন হাসি’-
              ‘হার”ত মার”তে কি ক’রেছে দেখ ধরণী সর্বনাশী!’
               নয়না এখানে যাদু জানে সখা এক আঁখি-ইশারায়
               লক্ষ যুগের মহা-তপস্যা কোথায় উবিয়া যায়।
সুন্দরী বসুমতী
              চিরযৌবনা, দেবতা ইহার শিব নয়-কাম রতি!


বারাঙ্গনা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


বারাঙ্গনা
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
না-ই হ’লে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;
তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি;
আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে,
তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে।-
স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী-পুত্র হ’ল মহাবীর দ্রোণ,
কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন.
কানীন-পুত্র কর্ণ হইল দান-বীর মহারথী
স্বর্গ হইতে পতিতা গঙ্গা শিবেরে পেলেন পতি,
শান-নু রাজা নিবেদিল প্রেম পুনঃ সেই গঙ্গায়-
তাঁদেরি পুত্র অমর ভীষ্ম, কৃষ্ণ প্রণমে যায়!
মুনি হ’ল শুনি সত্যকাম সে জারজ জবালা-শিশু,
বিস্ময়কর জন্ম যাঁহার-মহাপ্রেমিক সে যিশু!- 
কেহ নহে হেথা পাপ-পঙ্কিল, কেহ সে ঘৃণ্য নহে,
ফুটিছে অযুত বিমল কমল কামনা-কালীয়-দহে!
শোনো মানুষের বাণী,
জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক’ কোনো গ্লানি!
পাপ করিয়াছি বলিয়া কি নাই পুণ্যেরও অধিকার?
শত পাপ করি’ হয়নি ক্ষুন্ন দেবত্ব দেবতার।
অহল্যা যদি মুক্তি লভে, মা, মেরী হ’তে পারে দেবী,
তোমরাও কেন হবে না পূজ্যা বিমল সত্য সেবি’?
তব সন্তানে জারজ বলিয়া কোন্‌ গোঁড়া পাড়ে গালি,
তাহাদের আমি এই দু’টো কথা জিজ্ঞাসা করি খালি-
দেবতা গো জিজ্ঞাসি-
দেড় শত কোটি সন্তান এই বিশ্বের অধিবাসী-
কয়জন পিতা-মাতা ইহাদের হ’য়ে নিষ্কাম ব্রতী
পুত্রকন্যা কামনা করিল? কয়জন সৎ-সতী?
ক’জন করিল তপস্যা ভাই সন্তান-লাভ তরে?
কার পাপে কোটি দুধের বা”চা আঁতুড়ে জন্মে’ মরে?
সেরেফ্‌ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,
সেই কামানার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!
শুন ধর্মের চাঁই-
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!


ফরিয়াদ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ফরিয়াদ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সর্বহারা


এই ধরণীর ধূলি-মাখা তব অসহায় সন্তান
মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদি-পিতা ভগবান!-
আমার আঁখির দুখ-দীপ নিয়া
বেড়াই তোমার সৃষ্টি ব্যাপিয়া,
যতটুকু হেরি বিস্ময়ে মরি, ভ’রে ওঠে সারা প্রাণ!
এত ভালো তুমি? এত ভালোবাসা? এত তুমি মহীয়ান্‌?
                                       ভগবান! ভগবান!

তোমার সৃষ্টি কত সুন্দর, কত সে মহৎ, পিতা!
সৃষ্টি-শিয়রে ব’সে কাঁদ তবু জননীর মতো ভীতা!
নাহি সোয়াসি-, নাহি যেন সুখ,
ভেঙে গড়ো, গড়ে ভাঙো, উৎসুক!
আকাশ মুড়েছ মরকতে-পাছে আঁখি হয় রোদে ম্লান।
তোমার পবন করিছে বীজন জুড়াতে দগ্ধ প্রাণ!
                                       ভগবান! ভগবান!   
  
রবি শশী তারা প্রভাত-সন্ধ্যা তোমার আদেশ কহে-
‘এই দিবা রাতি আকাশ বাতাস নহে একা কারো নহে।
এই ধরণীর যাহা সম্বল,-
বাসে-ভরা ফুল, রসে-ভরা ফল,
সু-স্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখীর কন্ঠে গান,-
সকলের এতে সম অধিকার, এই তাঁর ফরমান!’
                                         ভগবান! ভগবান!

শ্বেত পীত কালো করিয়া সৃজিলে মানবে, সে তব সাধ।
আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ!
তুমি বল নাই, শুধু শ্বেতদ্বীপে
জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে,
সাদা র’বে সবাকার টুঁটি টিপে, এ নহে তব বিধান।
সন্তান তব করিতেছে আজ তোমার অসম্মান!
                                       ভগবান! ভগবান!
   
তব কনিষ্ঠ মেয়ে ধরণীরে দিলে দান ধুলা-মাটি,
তাই দিয়ে তার ছেলেদের মুখে ধরে সে দুধের বাটি!
ময়ূরের মতো কলাপ মেলিয়া
তার আনন্দ বেড়ায় খেলিয়া-
সন্তান তার সুখী নয়, তারা লোভী, তারা শয়তান!
ঈর্ষায় মাতি’ করে কাটাকাটি, রচে নিতি ব্যবধান!
                                       ভগবান! ভগবান!

তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী,
রসনা তাহার শ্যামল ধরায় করিছে সাহারা গোবী!
মাটির ঢিবিতে দু’দিন বসিয়া
রাজা সেজে করে পেষণ কষিয়া!
সে পেষণে তারি আসন ধসিয়া রচিছে গোরস’ান!
ভাই-এর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে বীরের আখ্যা পান!
                                       ভগবান! ভগবান!

জনগণে যারা জোঁক সম শোষে তারে মহাজন কয়,
সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।
মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,
মাটির মালিক তাঁহারাই হন-
যে যত ভন্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান।
নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান।
                                       ভগবান! ভগবান!

অন্যায় রণে যারা যত দড় তারা তত বড় জাতি,
সাত মহারথী শিশুরে বধিয়া ফুলায় বেহায়া ছাতি!
তোমার চক্র রুধিয়াছে আজ
বেনের রৌপ্য-চাকায়, কি লাজ!
এত অনাচার স’য়ে যাও তুমি, তুমি মহা মহীয়ান্‌ ।
পীড়িত মানব পারে না ক’ আর, সবে না এ অপমান-
                                       ভগবান! ভগবান!

ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডঙ্কা শঙ্কা নাহি ক’ আর!
এ মরিয়া’র মুখে মারণের বাণী উঠিতেছে ‘মার মার!’
রক্ত যা ছিল ক’রেছে শোষণ,
নীরক্ত দেহে হাড় দিয়ে রণ!
শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই হাড়ে ওঠে গান-
‘জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান!
                                       জয় জয় ভগবান!’

তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে কবির ভোগ,
এই পৃথিবীর নাড়ী সাথে আছে সৃজন-দিনের যোগ।
 তাজা ফুল ফলে অঞ্চলি পুরে
 বেড়ায় ধরণী প্রতি ঘরে ঘুরে,
কে আছে এমন ডাকু যে হরিবে আমার গোলার ধান?
আমার ক্ষুধার অন্নে পেয়েছি আমার প্রাণের ঘ্রাণ-
                                         এতদিনে ভগবান!

যে-আকাশে হ’তে ঝরে তব দান আলো ও বৃষ্টি-ধারা,
সে-আকাশ হ’তে বেলুন উড়ায়ে গোলাগুলি হানে কা’রা?
 উদার আকাশ বাতাস কাহারা
 করিয়া তুলিছে ভীতির সাহারা?
তোমার অসীম ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে কা’র কামান?
হবে না সত্য দৈত্য-মুক্ত? হবে না প্রতিবিধান?
                                         ভগবান! ভগবান!

তোমার দত্ত হসে-রে বাঁধে কোন্‌ নিপীড়ন-চেড়ী?
আমার স্বাধীন বিচরণ রোধে কার আইনের বেড়ী?
 ক্ষুধা তৃষা আছে, আছে মোর প্রাণ,
 আমিও মানুষ, আমিও মহান্‌ !
আমার অধীনে এ মোর রসনা, এই খাড়া গর্দান!
মনের শিকল ছিঁড়েছি, পড়েছে হাতের শিকলে টান-
                                         এতদিনে ভগবান!

চির-অবনত তুলিয়াছে আজ গগনে উ”চ শির।
বান্দা আজিকে বন্ধন ছেদি’ ভেঙেছে কারা-প্রাচীর।
এতদিনে তার লাগিয়াছে ভালো-
আকাশ বাতাস বাহিরেতে আলো,
এবার বন্দী বুঝেছে, মধুর প্রাণের চাইতে ত্রাণ।
মুক্ত-কন্ঠে স্বাধীন বিশ্বে উঠিতেছে একতান-
                                           জয় নিপীড়িত প্রাণ!
                                           জয় নব অভিযান!
                                           জয় নব উত্থান!


দুঃশাসনের রক্ত-পান কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


দুঃশাসনের রক্ত-পান

কাজী নজরুল ইসলাম.....ভাঙ্গার গান


বল রে বন্য হিংস্র বীর,
দুঃশাসনের চাই রুধির।
চাই রুধির রক্ত চাই,
ঘোষো দিকে দিকে এই কথাই
দুঃশাসনের রক্ত চাই!
দুঃশাসনের রক্ত চাই!!

অত্যাচারী সে দুঃশাসন
চাই খুন তার চাই শাসন,
হাঁটু গেড়ে তার বুকে বসি
ঘাড় ভেঙে তার খুন শোষি।
আয় ভীম আয় হিংস্র বীর,
কর অ-কণ্ঠ পান রুধির।
ওরে এ যে সেই দুঃশাসন
দিল শত বীরে নির্বাসন,
কচি শিশু বেঁধে বেত্রাঘাত
করেছে রে এই ক্রূর স্যাঙাত।
মা-বোনেদের হরেছে লাজ
দিনের আলোকে এই পিশাচ।
বুক ফেটে চোখে জল আসে,
তারে ক্ষমা করা? ভীরুতা সে!
হিংসাশী মোরা মাংসাশী,
ভণ্ডামি ভালবাসাবাসি!
শত্রুরে পেলে নিকটে ভাই
কাঁচা কলিজাটা চিবিয়ে খাই!
মারি লাথি তার মড়া মুখে,
তাতা-থৈ নাচি ভীম সুখে।

নহি মোরা ভীরু সংসারী,
বাঁধি না আমরা ঘরবাড়ি।
দিয়াছি তোদের ঘরের সুখ,
আঘাতের তরে মোদের বুক।
যাহাদের তরে মোরা চাঁড়াল
তাহারাই আজি পাড়িছে গা’ল!
তাহাদের তরে সন্ধ্যা-দীপ.
আমাদের আন্দামান-দ্বীপ!
তাহাদের তরে প্রিয়ার বুক
আমাদের তরে ভীম চাবুক।
তাহাদের ভালবাসাবাসি,
আমাদের তরে নীল ফাঁসি।
বরিছে তাদের বাজিয়া শাঁখ,
মোদের মরণে নিনাদে ঢাক।

জীবনের ভোগ শুধু ওদের,
তরুণ বয়সে মরা মোদের।
কার তরে ওরে কার তরে
সৈনিক মোরা পচি মরে?
কার তরে পশু সেজেছি আজ,
অকাতরে বুক পেতে নি বাজ।
ধর্মাধর্ম কেন যে নাই
আমাদের, তাহা কে বোঝে ভাই?
কেন বিদ্রোহী সব-কিছুর?
সব মায়া কেন করেছি দূর?
কারে ক’স মন সে-ব্যথা তোর?
যার তরে চুরি বলে চোর।
যার তরে মাখি গায়ে কাদা,
সেই হয় এসে পথে বাধা।

ভয় নাই গৃহী! কোরো না ভয়,
সুখ আমাদের লক্ষ্য নয়।
বিরূপাক্ষ যে মোরা ধাতার,
আমাদের তরে ক্লেশ-পাথার।
কাড়ি না তোদের অন্ন-গ্রাস,
তোমাদের ঘরে হানি না ত্রাস;
জালিমের মোরা ফেলাই লাশ,
রাজ-রাজড়ার সর্বনাশ!
ধর্ম-চিন্তা মোদের নয়,
আমাদের নাই মৃত্যু-ভয়!
মৃত্যুকে ভয় করে যারা,
ধর্মধ্বজ হোক তারা।
শুধু মানবের শুভ লাগি
সৈনিক যত দুখভাগী।
ধার্মিক! দোষ নিয়ো না তার,
কোরবানির১ সে, নয় রোজার২ !
তোমাদের তরে মুক্ত দেশ,
মোদের প্রাপ্য তোদের শ্লেষ।

জানি জানি ঐ রণাঙ্গন
হবে যবে মোর মৃৎ-কাফন৩
ফেলিবে কি ছোট একটি শ্বাস?
তিক্ত হবে কি মুখের গ্রাস?
কিছুকাল পরে হাড্‌ডি মোর
পিষে যাবি ভাই জুতিতে তোর!
এই যারা আজ ধর্মহীন
চিনে শুধু খুন আর সঙিন;
তাহাদের মনে পড়িবে কার
ঘরে পড়ে যারা খেয়েছে মার?
ঘরে বসে নিস স্বর্গ-লোক,
মেরে মরে তারে দিস দোজখ৪!
ভয়ে-ভীরু ওরে ধর্মবীর!
আমরা হিংস্র চাই রুধির!
শহতান মোরা? আচ্ছা, তাই।
আমাদের পথে এসো না ভাই।

মোদের রক্ত-রুধির-রথ,
মোদের জাহান্নামের পথ,
ছেড়ে দেও ভাই জ্ঞান-প্রবীণ,
আমরা কাফের ধর্মহীন!
এর চেয়ে বেশি কি দেবে গা’ল?
আমরা পিশাচ খুন-মাতাল।
চালাও তোমার ধর্ম-রথ,
মোদের কাঁটার রক্ত-পথ।
আমরা বলিব সর্বদাই
দুঃশাসনের রক্ত চাই!!

চাই না ধর্ম, চাই না কাম,
চাই না মোক্ষ, সব হারাম
আমাদের কাছে: শুধু হালাল৫
দুশমন-খুন লাল-সে-লাল॥

 

আশীর্বাদ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আশীর্বাদ
কাজী নজরুল ইসলাম


আপনার ঘরে আছে যে শত্রু 
তারে আগে করো জয়, 
ভাঙো সে দেয়াল, প্রদীপের আলো 
যাহা আগুলিয়া রয়। 
অনাত্বীয়রে আত্বীয় করো, 
তোমার বিরাট প্রাণ 
করে না কো যেন কোনোদিন কোনো 
মানুষে অসম্মান। 
সংসারের মিথ্যা বাঁধন 
ছিন্ন হোক আগে, 
কবে সে তোমার সকল দেউল 
রাঙিবে আলোর রাগে।

এক আল্লাহ জিন্দাবাদ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


এক আল্লাহ জিন্দাবাদ

কাজী নজরুল ইসলাম


উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ; 
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ। 
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ, 
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ। 

উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই; 
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই! 
ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে, 
দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে। 

ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে, 
ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে। 
মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী, 
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি। 

মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী, 
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী। 
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি। 
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি। 

উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার, 
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার! 
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব 
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব। 

হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়, 
কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়। 
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি; 
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি। 

তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে, 
নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে। 
সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়, 
আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়। 

যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই, 
উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই। 
ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মেরা আল্লার রাজ্য চাই, 
দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই। 

মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের, 
শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে-- শখ ওদের! 
আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ, 
নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ। 

পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো, 
এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো। 
সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে, 
তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে। 

দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল 
তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল। 
ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়, 
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়! 

তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা, 
এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা। 
ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ, 
পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ। 

বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে, 
হবে দুলদুল - আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে। 
আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন, 
তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন। 

নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান 
সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান! 
ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে - ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ, 
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - "এক আল্লাহ জিন্দাবাদ"।


কান্ডারী হুশিয়ার ! কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কান্ডারী হুশিয়ার!

কাজী নজরুল ইসলাম


দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার 
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার! 

দুলিতেছে তরি, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, 
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ? 
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। 
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার। 

তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান! 
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান। 
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান, 
ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার। 

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরন 
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পন। 
হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? 
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার 

গিরি সংকট, ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ, 
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ! 
কান্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ? 
করে হানাহানি, তবু চলো টানি, নিয়াছ যে মহাভার! 

কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর, 
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর! 
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর! 
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার। 

ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান, 
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন্ বলিদান 
আজি পরীক্ষা, জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ? 
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার!


সর্বহারা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সর্বহারা

কাজী নজরুল ইসলাম.....সর্বহারা



ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা
চোরাবালির চর,
ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস
সেই চরে তোর ঘর?
শূন্যে তড়িৎ দেয় ইশারা,
হাট তুলে দে সর্বহারা,
মেঘ-জননীর অশ্র”ধারা
ঝ’রছে মাথার’ পর,
দাঁড়িয়ে দূরে ডাকছে মাটি
দুলিয়ে তর”-কর।।

কন্যারা তোর বন্যাধারায়
কাঁদছে উতরোল,
ডাক দিয়েছে তাদের আজি
সাগর-মায়ের কোল।
নায়ের মাঝি! নায়ের মাঝি!
পাল তু’লে তুই দে রে আজি
তুরঙ্গ ঐ তুফান-তাজী
তরঙ্গে খায় দোল।
নায়ের মাঝি! আর কেন ভাই?
মায়ার নোঙর তোল্‌।
    
ভাঙন-ভরা ভাঙনে তোর
যায় রে বেলা যায়।
মাঝি রে! দেখ্‌ কুরঙ্গী তোর
কূলের পানে চায়।
যায় চ’লে ঐ সাথের সাথী
ঘনায় গহন শাঙন-রাতি
মাদুর-ভরা কাঁদন পাতি’
ঘুমুস্‌ নে আর, হায়!
ঐ কাঁদনের বাঁধন ছেঁড়া
এতই কি রে দায়?

হীরা-মানিক চাসনি ক’ তুই,
চাস্‌নি ত সাত ক্রোর,
একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র-
ভরা অভাব তোর,
চাইলি রে ঘুম শ্রানি–হরা
একটি ছিন্ন মাদুর-ভরা,
একটি প্রদীপ-আলো-করা
একটু-কুটীর-দোর।
আস্‌ল মৃত্যু আস্‌ল জরা,
আস্‌ল সিঁদেল-চোর।
    
মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে
মাটির বুকে চল্‌!
শক্তমাটির ঘায়ে হউক
রক্ত পদতল।
প্রলয়-পথিক চ’ল্‌বি ফিরি
দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!
হাঁকছে বাদল, ঘিরি’ ঘিরি’
নাচছে সিন্ধুজল।
চল্‌ রে জলের যাত্রী এবার
মাটির বুকে চল ।।


কুলি-মজুর – কাজী নজরুল ইসলাম | Kuli Mojur Kobita


কুলি-মজুর
কাজী নজরুল ইসলাম.....সর্বহারা


দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্‌?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকাকার খুনে রাঙা?
ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্‌ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!


কারার ঐ লৌহ-কপাট কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কারার ঐ লৌহ-কপাট

কাজী নজরুল ইসলাম.....ভাঙ্গার গান


১
কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
                   রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।

২
গাজনের বাজনা বাজা!
কে মালিক? কে সে রাজা?
কে দেয় সাজা
মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?
হা হা হা পায় যে হাসি,
ভগবান পরবে ফাঁসি!
সর্বনাশী
শিখায় এ হীন তথ্য কে রে!

৩
ওরে ও পাগলা ভোলা!
দে রে দে প্রলয় দোলা
গারদগুলা
জোরসে ধরে হেচ্‌কা টানে!
মার হাঁক হায়দারী হাঁক,
কাধে নে দুন্দুভি ঢাক
ডাক ওরে ডাক,
মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে!

৪
নাচে ওই কালবোশাখী,
কাটাবী কাল বসে কি?
দে রে দেখি
ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি!
লাথি মার, ভাঙ্গরে তালা!
যত সব বন্দী শালায়-
আগুন-জ্বালা,
জ্বালা, ফেল উপাড়ি।।


দারিদ্র্য কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম



দারিদ্র্য
কাজী নজরুল ইসলাম.....সিন্ধু-হিন্দোল


হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান্‌।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধত উলঙ্গ দৃষ্টি, বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার!
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস,
অম্লান স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস,
অকালে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ!
শীর্ণ করপুট ভরি’ সুন্দরের দান
যতবার নিতে যাই-হে বুভুক্ষু তুমি
অগ্রে আসি’ কর পান! শূন্য মরুভূমি
হেরি মম কল্পলোক। আমার নয়ন
আমারি সুন্দরে করে অগ্নি বরিষণ!
বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমার
শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার
বিকশি’ উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম,
দলবৃন্ত ভাঙ শাখা কাঠুরিয়া সম!
আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল
ক’রে ওঠে সারা হিয়া, শিশির সজল
টলটল ধরণীর মত করুণায়!
তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়
করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হ’য়ে উঠি
ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি’
সুন্দরের, কল্যাণের। তরল গরল
কন্ঠে ঢালি’ তুমি বল, ‘অমৃতে কি ফল?
জ্বালা নাই, নেশা নাই. নাই উন্মাদনা,-
রে দুর্বল, অমরার অমৃত-সাধনা
এ দুঃখের পৃথিবীতে তোর ব্রত নহে,
তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে।
কাঁটা-কুঞ্জে বসি’ তুই গাঁথিবি মালিকা,
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা!….
গাহি গান, গাঁথি মালা, কন্ঠ করে জ্বালা,
দংশিল সর্বাঙ্গে মোর নাগ-নাগবালা!….
ভিক্ষা-ঝুলি নিয়া ফের’ দ্বারে দ্বারে ঋষি
ক্ষমাহীন হে দুর্বাসা! যাপিতেছে নিশি
সুখে রব-বধূ যথা-সেখানে কখন,
হে কঠোর-কন্ঠ, গিয়া ডাক-‘মূঢ়, শোন্‌,
ধরণী বিলাস-কুঞ্জ নহে নহে কারো,
অভাব বিরহ আছে, আছে দুঃখ আরো,
আছে কাঁটা শয্যাতলে বাহুতে প্রিয়ার,
তাই এবে কর্‌ ভোগ!-পড়ে হাহাকার
নিমেষে সে সুখ-স্বর্গে, নিবে যায় বাতি,
কাটিতে চাহে না যেন আর কাল-রাতি!
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট ক্ষীণ তনু,
কী দেখি’ বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু,
দু’নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ,
আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান,
প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা,-
তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দন্ড লিখা!
বিনয়ের ব্যভিচার নাহি তব পাশ,
তুমি চান নগ্নতার উলঙ্গ প্রকাশ।
সঙ্কোচ শরম বলি’ জান না ক’ কিছু,
উন্নত করিছ শির যার মাথা নীচু।
মৃত্যু-পথ-যাত্রীদল তোমার ইঙ্গিতে
গলায় পরিছে ফাঁসি হাসিতে হাসিতে!
নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে
সাধিতেছ মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে!
লক্ষ্মীর কিরীটি ধরি, ফেলিতেছ টানি’
ধূলিতলে। বীণা-তারে করাঘাত হানি’
সারদার, কী সুর বাজাতে চাহ গুণী?
যত সুর আর্তনাদ হ’য়ে ওঠে শুনি!
প্রভাতে উঠিয়া কালি শুনিনু, সানাই
বাজিছে করুণ সুরে! যেন আসে নাই
আজো কা’রা ঘরে ফিরে! কাঁদিয়া কাঁদিয়া
ডাকিছে তাদেরে যেন ঘরে ‘সানাইয়া’!
বধূদের প্রাণ আজ সানা’য়ের সুরে
ভেসে যায় যথা আজ প্রিয়তম দূরে
আসি আসি করিতেছে!  সখী বলে, ‘বল্‌
মুছিলি কেন লা আঁখি, মুছিলি কাজল?….
শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই
‘ আয় আয়’ কাঁদিতেছে তেমনি সানাই।
ম্লানমুখী শেফালিকা পড়িতেছে ঝরি’
বিধবার হাসি সম-স্নিগ্ধ গন্ধে ভরি’!
নেচে ফেরে প্রজাপতি চঞ্চল পাখায়
দুরন্ত নেশায় আজি, পুষ্প-প্রগল্‌ভায়
চুম্বনে বিবশ করি’! ভোমোরার পাখা
পরাগে হলুদ আজি, অঙ্গে মধু মাখা।
উছলি’ উঠিছে যেন দিকে দিকে প্রাণ!
আপনার অগোচরে গেয়ে উঠি গান
আগমনী আনন্দের! অকারণে আঁখি
পু’রে আসে অশ্রু-জলে! মিলনের রাখী
কে যেন বাঁধিয়া দেয় ধরণীর সাথে!
পুষ্পঞ্জলি ভরি’ দু’টি মাটি মাখা হাতে
ধরণী এগিয়ে আসে, দেয় উপহার।
ও যেন কনিষ্ঠা মেয়ে দুলালী আমার!-
সহসা চমকি’ উঠি! হায় মোর শিশু
জাগিয়া কাঁদিছ ঘরে, খাওনি ক’ কিছু
কালি হ’তে সারাদিন তাপস নিষ্ঠুর,
কাঁদ’ মোর ঘরে নিত্য তুমি ক্ষুধাতুর!
পারি নাই বাছা মোর, হে প্রিয় আমার,
দুই বিন্দু দুগ্ধ দিতে!-মোর অধিকার
আনন্দের নাহি নাহি! দারিদ্র্য অসহ
পুত্র হ’য়ে জায়া হয়ে কাঁদে অহরহ
আমার দুয়ার ধরি! কে বাজাবে বাঁশি?
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি?
কোথা পাব পুষ্পাসব?-ধুতুরা-গেলাস
ভরিয়া করেছি পান নয়ন-নির্যাস!….
আজো শুনি আগমনী গাহিছে সানাই,
ও যেন কাঁদিছে শুধু-নাই, কিছু নাই!


২৪শে আশ্বিন ১৩৩৩

সাম্যবাদী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সাম্যবাদী

কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


গাহি সাম্যের গান-
             যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
             যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
             কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
             কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
             পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
             কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
             জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, য্ত সখ-
             কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
            দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
            তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
            সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
           তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
           তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
          কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
          হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

বন্ধু, বলিনি ঝুট,
         এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
         এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
         বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
         মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
         এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
         এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
         এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
         এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
         ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
         এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
         এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
         এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।


সব্যসাচী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সব্যসাচী
কাজী নজরুল ইসলাম.....ফণি-মনসা


ওরে ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাপা প্রাচী,
গৌরশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী!
                   দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া
                   জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,
মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি।’
নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী!

বিরাট কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,
গান্ডীব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে!
                   বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,
                   সাথে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,
ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,
দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে!

যুগে যুগে ম’রে বাঁচে পুনঃ পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,
দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা!
                   লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,
                   লোভ-দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,
ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা!
ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উৎপীড়নের দেনা?

কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত।
                   আজি সম্রাট্‌ কালি সে বন্দী,
                   কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দী!
কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত,
তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ যারে করে পদাহত!

আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কাল তারে বলে পিতা,
চির-বন্দিনী হতেছে সহসা দেশ-দেশ-নন্দিতা।
                   দিকে দিকে ঐ বাজিছে ডঙ্কা,
                   জাগে শঙ্কর বিগত-শঙ্কা!
লঙ্কা সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,
জ্বলিবে তাঁহারি আঁখির সুমুখে কাল রাবণের চিতা!

যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,
যুগে যুগে হ’ন শ্রীভগবান্‌ যে তাঁহারই রথ-সারথি!
                   যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্‌গাতা
                   ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা।
অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,
শিবের খড়গে তখনই মুন্ড হারায়েছে প্রজাপতি!

নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনী,
জাগো রে জোয়ান! ঘুমায়ো না ভূয়ো শান্তির বাণী শুনি-
                   অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,
                   দানব দৈত্য তবু মরে নাই,
সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, ব’সে ব’সে কাল গুণি!
জাগো রে জোয়ান! বাত ধ’রে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি!

দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’
এস নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি!
                   পূজা ক’রে শুধু পেয়েছি কদলী,
                   এইবার তুমি এস মহাবলী।
রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চত্রুধারীরে টানি’,
আর সত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি।

মশা মেরে ঐ গরজে কামান-‘বিপ্লব মারিয়াছি।
আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি!’
                   মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,
                   টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি!
বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,
যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার ম’রে বাঁচি!


হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক
কাজী নজরুল ইসলাম


হিন্দু-মুসলিম দুটি ভাই 
ভারতের দুই আঁখি তারা 
এক বাগানে দুটি তরু দেবদারু আর কদম চারা।। 

যেন গঙ্গা সিন্ধু নদী 
যায় গো বয়ে নিরবধি 
এক হিমালয় হতে আসে, এক সাগরে হয় গো হারা।। 

বুলবুল আর কোকিল পাখী 
এক কাননে যায় গো ডাকি, 
ভাগীরথী যমুনা বয় মায়ের চোখের যুগল ধারা।। 

ঝগড়া করে ভায়ে ভায়ে 
এক জননীর কোল লয়ে 
মধুর যে এ কলহ ভাই পিঠোপিঠী ভায়ের পারা।। 

পেটে ধরা ছেলের চেয়ে চোখে ধরারা মায়া বেশী, 
অতিথী ছিল অতীতে, আজ সে সখা প্রতিবেশী। 
ফুল পাতিয়ে গোলাপ বেলী 
একই মায়ের বুকে খেলি, 
পাগলা তা'রা আল্লা ভগবানে ভাবে ভিন্ন যারা।।


কৌলীন্য কবিতা – ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত


কৌলীন্য
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত



মিছা কেন কুল নিয়া কর আঁটাআঁটি।
এ যে কুল কুল নয় সার মাত্র আঁটি।।
কুলের গৌরব কর কোন্ অভিমানে।
মূলের হইলে দোষ কেবা তারে মানে।।
ঘটকের মুখে সুধু কুলীনের চোপা।
রস নাই যশ কিসে কূল হল টোপা।।
আদর হইত তবে ভাঙ্গিলে অরুচি।
পোকাধরা সোঁকা ভার দেখে যায় রুচি।।
অতএব বৃথা এই কুলের আচার।
ইথে নাহি রক্ষা পায় কুলের আচার।।
কুলের সম্ভ্রম বল করিব কেমনে।
শতেক বিধবা হয় একেক মরণে।।
বগলেতে বৃষকাষ্ঠ শক্তিহীন যেই।
কোলের কুমারী লয়ে বিয়ে করে সেই।।
দুধে দাঁত ভাঙ্গে নাই শিশু নাম যার।
পিতামহী সম নারী দারা হয় তার।।
নরনারী তুল্য বিনা কিসে মন তোষে।
ব্যভিচার হয় শুদ্ধ এই সব দোষে।।
কুলকল্পে নয় রূপ সুলক্ষণ যাহা।
অবশ্য প্রামাণ্য করি শিরোধার্য তাহা।।
নচেৎ যে কুল তাহা দোষের কারণ।
পাপের গৌরব কেন করিব ধারণ।।
হে বিভু করুণাময় বিনয় আমার।
এ দেশের কুলধর্ম করহ সংহার।।


মানুষ কে? কবিতা – ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত


মানুষ কে?
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত


নিয়ত মানস ধামে একরূপ ভাব।
জগতের সুখ-দুখে সুখ দুখ লাভ।।
পরপীড়া পরিহার, পূর্ণ পরিতোষ।
সদানন্দে পরিপূর্ণ স্বভাবের কোষ।।
নাহি চায় আপনার পরিবার সুখ।
রাজ্যের কুশলকার্যে সদা হাস্যমুখ।।
কেবল পরের হিতে প্রেম লাভ যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

নাহি চায় রাজ্যপদ নাহি চায় ধন।
স্বর্গের সমান দেখে বন উপবন।।
পৃথিবীর সমুদয় নিজ পরিজন।
সন্তোষের সিংহাসনে বাস করে মন।।
আত্মার সহিত সব সমতুল্য গণে।
মাতাপিতা জ্ঞাতি ভাই ভেদ নাহি মনে।।
সকলে সমান মিত্র শত্রু নাহি যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

অহংকার-মদে কভু নহে অভিমানী।
সর্বদা রসনারাজ্যে বাস করে বাণী।।
ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে।
পর্বত সলিল হয় রসনার রসে।।
মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে।
অঙ্গীকার অস্বীকার নাহি কোন ক্রমে।।
অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

চেষ্টা যত্ন অনুরাগ মনের বান্ধব।
আলস্য তাদের কাছে রণে পরাভব।।
ভক্তিমতে কুশলগণে আয় আয় ডাকে।।
পরিশ্রম প্রতিজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।
চেষ্টায় সুসিদ্ধ করে জীবনের আশা।
যতনে হৃদয়েতে সমুদয় বাসা।।
স্মরণ স্মরণ মাত্রে আজ্ঞাকারী যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?