Showing posts with label প্রকৃতির কবিতা. Show all posts
Showing posts with label প্রকৃতির কবিতা. Show all posts

অ-কেজোর গান – কাজী নজরুল ইসলাম


অ-কেজোর গান
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে আজ মেতে।।

এই রোদ-সোহাগী পউষ-প্রাতে
অথির প্রজাপতির সাথে
বেড়াই কুঁড়ির পাতে পাতে
পুষ্পল মৌ খেতে।
আমি আমন ধানের বিদায়-কাঁদন শুনি মাঠে রেতে।।

আজ কাশ-বনে কে শ্বাস ফেলে যায় মরা নদীর কূলে,
ও তার হলদে আঁচল চ’লতে জড়ায় অড়হরের ফুলে!
ঐ বাবলা ফুলের নাকছবি তার,
গা’য় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চ’লেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।।

আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে।।
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে।।


প্রলয়োল্লাস কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


প্রলয়োল্লাস
কাজী নজরুল ইসলাম.....অগ্নিবীণা


      তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

আস্‌ছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙ্‌ল আগল।
        মৃত্যু-গহন অন্ধ-কূপে
        মহাকালের চণ্ড-রূপে–
                      ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আস্‌ছে ভয়ঙ্কর–
        ওরে ঐ হাস্‌ছে ভয়ঙ্কর!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপ্‌টা মেরে গগন দুলায়,
সর্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!
        বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
        রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
                দোদুল্‌ দোলে!
অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর–
        ওরে ঐ স্তব্ধ চরাচর!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
        তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

দ্বাদশ রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন-কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়!
        বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
        সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে
                  কপোল-তলে!
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর 'পর–
        হাঁকে ঐ 'জয় প্রলয়ঙ্কর!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

মাভৈ মাভৈ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে!
জরায়-মরা মুমূর্ষদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে!
       এবার মহা-নিশার শেষে
       আস্‌বে ঊষা অরুণ হেসে
                     করুণ বেশে!
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু চাঁদের কর,
       আলো তার ভর্‌বে এবার ঘর।
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত-চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে!
খুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
       গগন-তলের নীল খিলানে।
       অন্ধ করার বন্ধ কূপে
       দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
                      পাষাণ স্তূপে!
এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর–
       শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর।
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? –প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন– জীবন-হারা অ-সুন্দরে কর্‌তে ছেদন!
       তাই সে এমন কেশে বেশে
       প্রলয় বয়েও আস্‌ছে হেসে–
                        মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!

ঐ ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!–
       বধূরা প্রদীপ তুলে ধর্‌!
কাল ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!–
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
       তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!


ফাল্গুনী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ফাল্গুনী
কাজী নজরুল ইসলাম.....সিন্ধু-হিন্দোল


সখি পাতিসনে শিলাতলে পদ্মপাতা,
সখি দিসনে গোলাব-ছিটে খাস্‌ লো মাথা!
             যার অন্তরে ক্রন্দন
             করে হৃদি মন্থন
             তারে হরি-চন্দন
             কমলী মালা-
সখি দিসনে লো দিসনে লো, বড় সে জ্বালা!      
বল কেমনে নিবাই সখি বুকের আগুন!
এল খুন-মাখা তৃণ নিয়ে খু’নেরা ফাগুন!
             সে যেন হানে হুল্‌-খুনসুড়ি,
             ফেটে পড়ে ফুলকুঁড়ি
             আইবুড়ো আইবুড়ো
             বুকে ধরে ঘুণ!
যত বিরহিণী নিম্‌-খুন-কাটা ঘায়ে নুন!
আজ লাল-পানি পিয়ে দেখি সব-কিছু  চুর!
সবে আতর বিলায় বায়ু বাতাবি নেবুর!
             হ’ল মাদার আশোক ঘা’ল,
             রঙন তো নাজেহাল!
             লালে লাল ডালে-ডাল
             পলাশ শিমুল!
সখি তাহাদের মধু ক্ষরে-মোরে বেঁধে হুল্‌!
নব সহকার-মঞ্জরী সহ ভ্রমরী!
চুমে ভোমরা নিপট, হিয়া মরে গুমরি’।
             কত ঘাটে ঘাটে সই-সই
             ঘট ভরে নিতি ওই,
             চোখে মুখে ফোটে খই,-
             আব-রাঙা গাল,
যত আধ-ভাঙা ইঙ্গিত তত হয় লাল!
আর সইতে পারিনে সই ফুল-ঝামেলা!
প্রাতে মল্লী চাঁপা, সাঁজে বেলা চামেলা!
             হের ফুটবো মাধী হুরী
             ডগমগ তরুপুরী,
             পথে পথে ফুলঝুরি
             সজিনা ফুলে!
এত ফুল দেখে কুলবালা কূল না ভুলে!
সাজি’ বাটা-ভরা ছাঁচিপান ব্যজনী-হাতে
করে স্বজনে বীজন কত সজনী ছাতে!
             সেথা চোখে চোখে সঙ্কেত
             কানে কথা-যাও ধেৎ,-
             ঢ’লে-পড়া অঙ্কেতে
             মন্‌মথ-ঘায়!
আজ আমি ছাড়া আর সবে মন-মত পায়।
সখি মিষ্টি ও ঝাল মেশা এল এ কি বায়!
এ যে বুক যত জ্বালা করে মুখ তত চায়!
             এযে শরাবের মতো নেশা  
             এ পোড়া মলয় মেশা,
             ডাকে তাহে কুলনাশা
             কালামুখো পিক।
যেন কাবাব করিতে বেঁধে কলিজাতে শিক্‌!
এল আলো-রাধা ফাগ ভরি’ চাঁদের থালায়
ঝরে জোছনা-আবীর সারা শ্যাম সুষমায়!
             যত ডাল-পালা নিম্‌খুন,
             ফুলে ফুলে কুঙ্কুম্‌,
             চুড়ি বালা রুম্‌ঝুম,
             হোরির খেলা,
শুধু নিরালায় কেঁদে মরি আমি একেলা!
   
আজ সঙ্কেত-শঙ্কিত বন-বীথিকায়
কত কুলবধূ ছিঁড়ে শাড়ি কুলের কাঁটায়!
             সখি ভরা মোর এ দু’কুল
             কাঁটাহীন শুধু ফুল!
             ফুলে এত বেঁধে হুল?
             ভালো ছিল হায়,
সখি ছিঁড়িত দু’কূল যদি কুলের কাঁটায়!

হুগলী, ফাল্গুন ১৩৩২

তপসে মাছ কবিতা – ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত

 

তপসে মাছ
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত


কষিত-কনককান্তি কমনীয় কায়।
গালভরা গোঁফ-দাড়ি তপস্বীর প্রায়।
মানুষের দৃশ্য নও বাস কর নীরে।
মোহন মণির প্রভা ননীর শরীরে।।
পাখি নও কিন্তু ধর মনোহর পাখা।
সমধুর মিষ্ট রস সব-অঙ্গে মাখা।।
একবার রসনায় যে পেয়েছে তার।
আর কিছু মুখে নাহি ভাল লাগে তার।।
দৃশ্য মাত্র সর্বগাত্র প্রফুল্লিত হয়।
সৌরভে আমোদ করে ত্রিভুবনময়।।
প্রাণে নাহি দেরি সয় কাঁটা আঁশ বাছা।
ইচ্ছা করে একেবারে গালে দিই কাঁচা।
অপরূপ হেরে রূপ পুত্রশোক হরে।
মুখে দেওয়া দূরে থাক গন্ধে পেট ভরে।
কুড়ি দরে কিনে লই দেখে তাজা তাজা।
টপাটপ খেয়ে ফেলি ছাঁকাতেলে ভাজা।।
না করে উদর যেই তোমায় গ্রহণ।
বৃথায় জীবন তার বৃথায় জীবন।
নগরের লোক সব এই কয় মাস।
তোমার কৃপায় করে মহা সুখে বাস।।