Showing posts with label বাংলাদেশের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label বাংলাদেশের কবিতা. Show all posts

রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো – ইমু ইমরান কায়েস


রিকশাওয়ালা কবি, বইও বেরিয়েছে দুটো!
ইমু ইমরান কায়েস


বনশ্রী যাবেন?
বনশ্রী তো চিনিনা চিনায়া নিয়েন,
নতুন জায়গা না গেলে আর চিনমু ক্যামনে।
খাঁটি কথা।
টিএসসির মোড় থেকে যখন রিকশা ঠিক করি
তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ঢাকা শহর, বাড়ি ফেরার তাড়া,
তাই অচিন রিকশাওয়ানাই সই।
প্রত্যেক মোড়ে ডান-বান বলতে বলতে চলার পথের অবিন্যস্ত আলসেমি,
অহেতুক সব চিন্তা-ভাবনার বিলাসিতা কেটে যাবে, যাক।
রাতের ঢাকা এখন আর খুব নিরাপদ না
চার দেয়ালে ফেরা দরকার, ঘরে ফেরা দরকার।
শাহজানপুর এসে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি কি না। বললাম, পড়ি না।
ডাক্তারি করি, রিকশাওয়ালার ফের বিনীত জিজ্ঞাসা
দেশেই থাকবেন, না বিদেশ চইলা যাবেন?
বললাম, দেশেই থাকবো, অর্ধেক জীবন শেষ,
নতুন করে আর কই যাবো।
দেশের অবস্থা তো ভালো না,
মানুষজন ভালো না, শিক্ষা নাই, সচেতনতা নাই,
থাইকা কি করবেন তার গলায় আক্ষেপ এবার!
আমি এইবার বিস্মিত হলাম,
রিকশাওয়ালার গলায় এই ধরনের সূক্ষ রুচিশীল হাহাকার তো থাকার কথা নয়,
সামথিং ইজ নট রাইট।
সত্যিকার অর্থেই নড়েচড়ে বসলাম।
আলো অন্ধকারে কেবল ঘামে ভেলা পিঠটুকু দেখা যাচ্ছে তার। ওঠার সময় চেহারা খেয়ালই করিনি।
সত্তা শার্টে লেপ্টে থাকা পিঠ থেকে কোন অ্যাবনর্মাল কিছু উদ্ধার করা গেল না।
এই দেশের মেইন সমস্যা কী ভাই জানেন?
সমস্যা তো অনেক।
ঘুষ, দুই নম্বরি, বিচার না হওয়া, প্রভাবশালীদের যা ইচ্ছা তাই করা, ধর্ম ইউজ করে হাবিজাবি কাজ করা, একে তাকে রাজাকার, একে তাকে নাস্তিক বানানো, বাজে রাজনীতি, তার মতে কোনটা কে জানে।
তাই জবাব না দিয়ে আমিই জিজ্ঞেস করলাম, কী?
এবার ভদ্রলোকের উত্তর শুনে ভিমড়ি খেলাম-
"মেইন সমস্যা হচ্ছে কেউ বই পড়ে না।"
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি পড়েন?"
অত না, টুকটাক।
আমি আবার কবিতার বই একটু বেশি পড়ি।
বলেন কী।
বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে রিকশা থেকে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হয় আমার।
কার কবিতার বই পড়েন?
ভদ্রলোক প্রবল মমতায় জানান,
তার পছন্দের কবি শক্তি চট্টোপধ্যায় আর ফরাসী কবি আর্তুর ব্যাবো।
খিলগাঁওয়ের গলিতে আকাশ ফুড়ে হঠাৎ একটা পাহাড় সম উঁচু জ্বিন এসে যদি পথ রোধ করে দাঁড়াতো তবু এতো চমকাতাম না। আর্তুর র‍্যাবো, শক্তি।
কি বিস্ময়! কি বিস্ময়।
ভজলোকের নাম শ্রিপান্থ শফিক।
আপনার অনুমান ঠিক আছে, শ্রিপাছ টুক বানানো।
বরিশালের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা একটা মানুষকে ওইটুকু মেলোড্রামা করতে দেয়াই যায়।
ছাত্র খারাপ ছিলেন না।
এসএসসি পরীক্ষার পর কবিতার 'ভূতে ধরলো।
আরজ আলী মাতুব্বর, সক্রেটস, স্টিফেন হকিং, শক্তি, র‍্যাবো, গিয়ম এপোলোনিয়ার, হুমায়ুন আজাদ পড়ার পর তার মনে হল 
জীবন এক আশ্চর্য গিফট।
স্কুল কলেজে পড়ে সেইটা নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
তাই আর পড়েননি! কবিতা লেখেন নিয়মিত, দুইটা বইও বেরিয়েছে।
যে জীবন তিনি যাপন করেন, তার মতে এটা প্রথা বিরোধী জীবন। একটা সেন্স অফ ফ্রিডম তো আছে!
খারাপ কী?
বাসার কাছাকাছি এসে ভদ্রলোকের সাথে কফি খেলাম এক কাপ।
কফি খেতে খেতে মনে হল, আহা জীবন!
কেউ কি ভীষণ দুঃসাহস নিয়ে জন্মায়!
আর কেউ কি করুণভাবে মাথা নত করে মেনে নেয় জাগতিক সমস্ত হিসাব।
ভদ্রলোকের প্রতি বুক ভর্তি হিংসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম!


সুধাংশু! এবার তুই পালা কবিতা – আলমগীর হুসেন


সুধাংশু! এবার তুই পালা
আলমগীর হুসেন


পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু
সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে
এবার যে তোর পালানোর বেলা
জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা।

জানি তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু
দাঁড়িয়ে হাহাকারের ছোঁয়ায় জড়ানো শ্মশানসম বাস্তুভিটায়
সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো, আমাদের ছেলেবেলা
কিন্তু এবার যে তোর পালানোর বেলা, এবার তুই পালা।

আমি জানি নির্বাক দাঁড়িয়ে তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু
সেই একপাল বন্ধুগুলো ­ রামী, শেপু, কাকলী আরও অনেকে
প্রাণময় কোলাহলে কাটিয়েছি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বেলা
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।

আমি বুঝি তোর শঙ্কা আগামী বিরহ বেদনার বন্ধু সুধাংশু
আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা আত্মার সম্পর্ক ­-
এই বাস্তুভিটার সাথে আর একঝাঁক বন্ধুর ভালবাসা প্রাণঢালা।
কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।

কোথায় সেই কল-কাকলীতে মুখরিত সবুজ সুন্দর কাপালী-ভিটাটি বন্ধু সুধাংশু
দু’টি জীর্ণ-শীর্ণ ঘর চির-দুঃখীর মতো দাঁড়িয়ে আছে আজ সেই কাপালী ভিটায়।
কোথায় সেই রামী, শেপু, কাকলী আরও সেই প্রিয় বন্ধুগুলা
ওরা যে সবাই পালিয়েছে, এবার তোর পালা।

তুই কি জানিস বন্ধু সুধাংশু
তোর বিদায়ে ভীষণ ব্যথা পাবে আমার ঐ ছ’বছরের অবুঝ বোনটি ‘নেহা’
কাটাবে কত সন্ধ্যা অধীর প্রত্যাশায়, সুধাংশু ভাইকে জড়িয়ে ধরবেঃ কোথায় চকলেটগুলা?
তবুও তোকে পালাতে হবে যে, এবার তুই পালা।

আরও জানি বন্ধু সুধাংশু
তোর ষোড়শী বোনটি ‘মিলা’ দুষ্টামির ছলে আর বলতে পারবে নাঃ আলমদা তুমি এত কৃপণ কেন?
চলো মেলায় নিয়ে, কিনে দিতে হবে সুন্দর একটি মালা।
তথাপি তোকে পালাতে যে হবে, এবার তুই পালা।

তোকে যে বলা হয় নি বন্ধু সুধাংশু
মিলা’র সহপাঠী আমার ভাইটি ‘রিপন’ বলছিল সেদিনঃ ভাইয়া মিলা’টা যা সুন্দর হয়েছে না!
বলে দিয়েছি ওকে, সুন্দরী মেধাবী মিলা বিশ্ব জয় করবে, তোর মতো গর্দভটি ওর দিকে তাকাবে না।
তোর হাতে যে সময় নেই বন্ধু, এবার তুই পালা।

মিলাকে যে বিশ্ব জয় করতেই হবে বন্ধু সুধাংশু
অসাধারণ সুন্দরী মেধাবী মিলার জন্য এক ধর্ষিত, অচ্ছুৎ, অভাগী নারীর জীবন ­
হবে মানবতার জন্য এক অমার্জনীয় ব্যর্থতা।
তাই আমার কাতর মিনতি বন্ধু, এখনই তুই পালা।


আমার বন্ধু নিরঞ্জন কবিতা – ভাস্কর চৌধুরী


আমার বন্ধু নিরঞ্জন
ভাস্কর চৌধুরী


অনেক কথা বলবার আছে আমার
তবে সবার আগে নিরঞ্জনের কথা বলতে হবে আমাকে
নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম, আর কোন নাম ছিল কি তার?
আমি জানতাম না।
ওর একজন বান্ধবী ছিল অবশ্য কিছু দিনের জন্য
সে তাকে ‘প্রীতম’ বলে ডাকত।

ওর বান্ধবীর নাম ছিল জয়লতা
নিরঞ্জন জয়লতা সম্পর্কে আমাকে কিছু বলেনি তেমন।
জয়লতাকে কখনো কোন চিঠি লিখেছিল কিনা
সে কথাও আমাকে সে বলেনি।
তবে জয়লতার চিঠি আমি দেখেছি
একটা চিঠি ছিল এরকম-
প্রীতম,
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। তুমি বলেছ, এখন দুঃসময়-
কিন্তু আমি জানি, সবসময়ই সুসময়, যদি কেউ ব্যবহার করতে জানে তাকে
আমি বুঝি বেশী দিন নেই যদি পার এক্ষুনি তুলে নাও
নইলে অন্য পুরুষ ছিবড়ে খাবে আমাকে-


আমার ঘরে বসে সিগারেট টানতে টানতে
নিরঞ্জন চিঠিটা চুপ করে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, বিভূ, চিঠিটা পড়ুন।

আমি প্রথমে পড়তে চাইনি।।
পরে ওইটুকু পড়ে তার দিকে তাকিয়েছিলাম-
না-ওই সিগারেটের ধূঁয়োয়
আমি কোন নারী প্রেম-
তাড়িত মানুষের ছায়া দেখিনি- ভয়ানক নির্বিকার।
কিছু বলছেন না যে? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম
কি বলবো? এই ব্যাপারে। কোন ব্যাপারে?
এই যে জয়লতা।
বাদ দিন।

আমি বাদ দিয়েছিলাম।
নিরঞ্জন আমার ঘরে বসে অনেকক্ষণ সিগারেট
টেনে টেনে ঘরটাকে অন্ধকার করে চলে গিয়েছিল সেদিন।
জয়লতার সঙ্গে অন্য পুরুষের বিয়ে হয়েছিল
আমি জয়লতা এবং অন্য পুরুষটিকে দেখেছি
বহুবার, বিশ্ববিদ্যালয়েই।
জয়লতা আরো দেমাগী
আরো সুন্দরী হয়ে উঠেছিল।
অন্য পুরুষ ছিবড়ে খেলে মেয়েরা বুঝি
আরো সুন্দরী হতে থাকে?


এ কথার সূত্রে সেদিন নিরঞ্জন আমাকে বলেছিল,
মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন। আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।

হ্যাঁ, মানুষের মুক্তির জন্য
নিরঞ্জন মিছিল করতো।
আমি শুনেছি নিরঞ্জন বলছে…
তুমি দুস্কৃতি মারো, বাঙালি মারো
হিন্দু-মুসলমান মারো, গেরিলা-তামিল মারো
এভাবে যেখানে যাকেই মারো না কেন
ইতিহাস লিখবে যে এত মানুষ মরেছে
বড়ই করুণ এবং বড়ই দুঃখজনক
শক্তির স্বপক্ষে তুমি যারই মৃত্যু উল্লেখ করে
উল্লাস করনা কেন
মনে রেখো মানুষই মরেছে
এই ভয়ঙ্কর সত্য কথা বলে নিরঞ্জন
মিছিলে হাত উঠিয়ে বলেছিল,
এভাবে মানুষ মারা চলবে না।
মানুষকে বাঁচতে দাও।

নিরঞ্জন বাঁচেনি।
তার উদ্যত হাতে লেগেছিল
মানুষের হাতে বানানো বন্দুকের গুলি।
বুকেও লেগেছিল- যেখান থেকে ‘মানুষ’ শব্দটি
বড় পবিত্রতায় বেরিয়ে আসতো।
সে লাশ-
আমার বন্ধু নিরঞ্জনের লাশ,
আমি দেখেছি
রক্তাক্ত ছিন্ন ভিন্ন লাশ,
মানুষ কাঁধে করে
তাকে বয়ে এনেছিল মানুষের কাছে।
জয়লতা সে লাশ দেখেছিল কিনা
সে প্রশ্ন উঠছে না।
দেখলেও যদি কেঁদে থাকে
সে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে
তাতে নিরঞ্জনের কোন লাভ হয়নি।
মানুষ কেঁদেছিল
আমি জানি তাতে নিরঞ্জনের লাভ ছিল।
নিরঞ্জন প্রমাণ করতে পেরেছিল
গতকাল মিছিলে
আইন অমান্যের অভিযোগে
যে দুস্কৃতি মারা গিয়েছে
তার নাম নিরঞ্জন-
সে আসলে ‘মানুষ’।


যশোর রোড কবিতা – অ্যালেন গিন্সবার্গ


যশোর রোড 
অ্যালেন গিন্সবার্গ

কাব্যানুবাদ দিলদার হোসেন 


লাখো কচিমুখ উর্ধ্বগগনে চেয়ে,
ফোলা পেটে তারা গোলক বোবা চোখে
বাঁশের মাচানে যশোর রোডের ধারে
প্রকৃতির ডাকে বালু নালার পাড়ে

লাখো পিতারা ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে,
লাখো মাতারা জঠর ব্যথায় কাঁদে
লাখো পিতারা ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে,
লাখো মাতারা জঠর ব্যথায় কাঁদে
লাখো ভাইয়েরা দুঃখের নাচনে কাবু,
লাখো বোনেরা আবাসহীন রাতে

লাখো মাসিপিসি ক্ষুধার জ্বালায় ঝরে,
লাখো মামা কাকা লাশের শোকে মরে
লাখো পিতামহ ঘরহারা চিরদুঃখী,
লাখো মাতামহ উন্মাদ হয়ে বধির

লাখো কন্যারা হেঁটে যায় কাদামাটি,
লাখো শিশুরা ভিজে যায় বন্যায়
লাখো বালিকার বমি ক্ষুধা কান্নায়,
লাখো পরিবার আশাহীন বিসর্জন

লাখো হৃদয়ে ১৯৭১,
সূর্য খরায় যশোর রোডের বুকে
লাখো মানবের হঠাৎ মৃত্যু আসে
লাখো মানবেরা ধাবমান কলকাতায়

যশোর রোডে ট্যাক্সি চলেছে ভয়ে,
কয়লার গাড়ি টানে কঙ্কালসার গরু
কর্দমাক্ত ডোবা মাঠে ছুটে চলা,
গোবর জ্বালানি লেপ্টে আছে কুটিরে

জবুথবু মিছিলের মুখগুলো
বোবা চাহনিতে বালকের দল তাকায়
কঙ্কাল মুখ নৈঃশব্দের প্রতিবাদে,
ক্ষুধার্ত কালে দেবদূত মানব সাজে

মায়ের কান্না, কোলের শিশুরা কাঁদে,
সন্ন্যাসিনী হয়ে ক্ষয়ে যাওয়া দহনকালে
কচি মুখে প্রার্থনা-জীব দিয়েছেন যিনি,
এ কেমন চড়ুই খাবারে আঁকড়েড়ে বেঁচে থাকা

ছিন্ন চাটাইয়ে শূন্য বাটিতে বসে
কম্পিত হাতে তুলে ধরে পিতামাতা
হায়! চোখ ফেটে আসে জল,
কান্দে মাতা নীরব যন্ত্রণার অশ্রুজলে

দুজন শিশু বসা পাতার ছায়ায়
নিস্তব্ধতায় আজ যদি কিছু পাওয়া
সপ্তাহান্তে চাল ডাল যদি মেলে,
গুঁড়োদুধ আর নেবে না শিশু বোবা রায়ে

টাকা, তরকারি, নেইতো কাজ পুরুষ যারা,
যা ছিলো চাল চারদিন গেল অন্নছাড়া
দিনে দিনে উপোস থেকে অন্নহারা,
যতটুকু পায় উগরিয়ে দেয় পাগলপারা

কান্দে মাতা যশোর রোডে ঠেকিয়ে মাথা,
বাংলায় তারা বলছে- সাহেব একচ দয়া!
উঠোন মাকে! পড়ে থাকে ছিন্ন খাদ্যকার্ড,
ক্যাম্পের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে সারারাত

শিশুরা বন্যাজলে খেলতে থাকে,
কেউ জানে না আজকে তাদের উদোম থাকা
এসব খুঁটিনাটি ফ্রেমবন্দী ছবিতে আছে,
শিশুর কান্নাখেলা আনবে তারা ধ্বংসলীলা

সান্ত্রী সেপাই ঘিরে আছে হাজার বালক,
অপেক্ষার শেষে যদি খাদ্য আসে
হুইসেল আর বাঁশের লাঠি বেজায় জোরে
ক্ষুধার খেলা থামায় তারা জোরসে মেরে

সারি ভেঙ্গে এলোমেলো লাফিয়ে আগায়
ভিড়ের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ এক শীর্ণ মানুষ
কাদার মঞ্চে এগিয়ে যায় হুলাবোলে
হুরীরা ধরপাকড়ে এগিয়ে আসে

শিশুরা কেনো জড়ো হয়েছে এই ভূমিতে,
হেসে খেলে আঁকড়ে ধরেছে কেন এই মাটিতে
কোন প্রতীক্ষার আনন্দে সময় এসে
নিয়ে যাবে ওদের ভেন্না পাতার ঘরে

রুটিওয়ালা খুপরির মুখে বর্জন করে,
বেসুরো শব্দে শিশুরা সন্ত্রস্ত সদলবলে
নাই কোন রুটি আনন্দ প্রার্থনায়,
সমস্বরে শিশুরা বলে বাহু এইতো বেশ

দৌড়ে গিয়ে গুরুজনে করে মিনতি
রাষ্ট্রের রুটি ব্যবস্থার কী খবর বলো?
আজ খাদ্যহীন আর আশ্রয়হীন এই তল্লাটে,
বেদনাহত অসুস্থ শিশুর জীর্ণ ছোঁয়ায়

মাসের পর মাস পুষ্টিহীন এই শরীরে,
দাস্ত বমিতে শূন্যদেহে ক্ষুধার্ত তারা
জীবাণুযুক্ত স্বাস্থ্যকার্ডে হতাশ তারা,
সিরাপের প্রয়োজন নয়তো পরিণতি ভরা


শরণার্থী পল্লী হাসপাতালে রূপ নিয়েছে,
সদ্যজাত শিশু মায়ের শীর্ণ গায়ে শোয়া
বানরের মতো দুর্বল চোখ কোটরে গেছে,
এই রক্তক্ষরণে হাজার মৃত্যুর প্রতিধ্বনি

রিকশায় চেপে যশোর রোডে যদিও তাকাই,
চেয়ে দেখি অর্ধ লক্ষ মানব পাঁজর ছবি
সারি সারি বাঁশের মাচান আর যে মাঠ,
নালা নর্দমায় শিশু পরিবার খাদ্যের অপেক্ষায়

সীমান্তে ট্রাক, থৈথৈ পানি, খাদ্য নাই
হে আমেরিকান দেবদূত রাষ্ট্রযন্ত্র
এখনই দেখো, দেখো,
কোথায় তোমার কূটনৈতিক বাচালবুলি?

মেশিনগানের খেলাতে কেন মারছো অবুঝ শিশু?
কোথায় তোমার সাহায্যকারী জঙ্গি ধাতবপাখি?
কোথায় আমেরিকার আলোকিত বায়ুসেনার দল?
তারা কি উত্তর লাওসে দিনরাত্রি ফেলছে বোমা?
কোথায় স্বর্ণখচিত রাষ্ট্রপতির সমরসেনা,
কোথায় লক্ষকোটি গর্বিত নৌসেনার দল
তাদের দিয়ে খাদা ঔষধ এখনই এনে দাও।
কেন কষ্ট বাড়িয়ে ভিয়েতনামে ফেলো নাপাম
কোথায় মেয়েরা চোখ ছলছল প্রিয়জন?
কোথায় হারায় প্রিয়জন মলিন বৃষ্টি কাদায়
শিশুরা সব তাকিয়ে থাকে যশোর রোডের দিকে,
চোখের সামনে মৃত্যুর সারি কোথায় হবে ঠাঁই
কার কাছে বলি ভাত কাপড় আর যত্নের প্রয়োজন,
কোন বন্ধুরা এনে দেবে আজ ক্ষুধামুক্তির পথ
দোখা লক্ষ শিশুরা একাকী কাটায় বৃষ্টিতে,
দেখো লক্ষ শিশুরা ব্যথায় কাতর দৃষ্টিতে

দুঃখের প্রতিবাদে জাগো ভুবন কন্ঠস্বর,
দুঃখকে ভালোবাসায় পরিণত করে অজানা প্রিয়জন
ক্ষুধার জ্বালায় অণুপরমাণু তোলে কাঁসর ধ্বনি,
জাগাও আমেরিকা সচেতন মানব মস্তিত্ব যারা

কত শিশু কত প্রাণ ঝরে যায় হায়,
কত কন্যা শিশুরা অশরীরী হয়ে পড়ে
আমাদের আমরা অযতনে করি নিঃশেষ,
দুঃখের কান্নায় তোলো আজ সুরের ঝংকার

কাদাপানিতে মাচানগুলো ভেড়ে যায় কান্নায়,
অসংখ্য চোখ ঘুমায় বৃষ্টিতে মাঠের মাটিতে
সভ্য মানুষকে ধিক্কার দেয় পানির ইদারা ঘিরে
এখনো ক্ষুধার্ত মায়ের কোলে তারা অসহায়

আমি অতীতে যা করেছি তাই কি করছি?
কবি সুনীল, বলো আমি কী করবো এখন?
টাকা কড়ি দিতে না পেরে ছেড়ে চলে যাবো নাকি?
মানবিক ভালোবাসায় কী করবো বলো কবি?

সাজানো শহর আর গাড়ি দিয়ে কী হবে?
মঙ্গলগ্রহে পা দিতে কী কী কিনবো বলো
কত লক্ষ মানুষ সুখের নিদ্রায় কাটায় নিউইয়র্কে,
আর সুস্বাদু সুপে শুকর ভাজা গিলে গিলে খায়

কত জারক রসে উন্মত্ত ভণ্ড হবে তুমি?
মা, সাগরের বুকে রক্তের হোলি খেলে
দিগার পেট্রোল নতুন গাড়ির স্বপ্নে বিভোর হবে।
পচা দুর্গন্ধে এই চরাচরে নক্ষত্রের আলো হারায়

থামাও এ যুদ্ধ, বুকের উষ্ণ নিঃশ্বাসে
মানব চোখের নোনা জলের স্বাদ নিও চেখে
লক্ষ আবছায়ায় নিমজ্জিত এই মানববাগান
গ্রহের দূরবীক্ষণে দোষে মত্ত নরকের সংসার

আরো লক্ষ শিশু এখনো ঘরণ কামড়ে।
সৃষ্টিকর্তার সহানুভূতিতে এই দুঃখী মায়েরা
কত পিতাদের কষ্টের টাকায় এই মৃত্যুখেলা,
কত শিশুদের ফৌজি নিশানায় সাল হবে বেলা

বিভ্রাবেদনে আর কত আত্মার পথ চলা,
কত শিশুরা মায়ার খেলায় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
কত পরিজন কোঠরে চোখে যায় হারিয়ে,
কত মাতামহ বিপন্ন হয়ে অশরীরী বাঁচে

এত ভালোবাসায় কি রুটির যোগান হবে?
কত কাকা মামারা ছবি হয় মায়াজালে?
কত প্রিয় বোনের বিছানো নিত্য খুলি,
কত পিতামহের পীড়িত বদ্ধবাকে

আর কত বাবার দুঃখের কান্না শুনি,
আর কত পুত্রের দিকশূন্য পথে চলা
আর কত কন্যাদের দুঃখের কাতরতা,
আর কত কাকাদের জর্জরিত পদযুগল

লক্ষ শিশুরা কাঁদে সীমাহীন যন্ত্রণায়,
লক্ষ মাতার শরীর বৃষ্টিতে ভিজে যায়
লক্ষ ভাইয়েরা দুঃখের সাগরে ডুবে,
লক্ষ বালক বালিকা বাস্তুহীন অজানায় পথ চলে।

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড – অ্যালেন গিন্সবার্গ | Jessore Road


সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড
অ্যালেন গিন্সবার্গ


শত শত চোখ আকাশটা দেখে,
শত শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত
বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।

কাদামাটি মাখা মানুষের দল,
গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ইশ্বর,
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে,
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান,
এই কালোরাত কবে হবে শেষ।

শত শত মুখ হায় একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।

সময় চলেছে রাজপথ ধরে
যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল,
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর,
গরুগাড়ী কাদা রাস্তা পিছিল

লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে,
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়,
ঘরহীন ভাসে শত শত লোক
লক্ষ জননী পাগলের প্রায়।

রিফিউজি ঘরে খিদে পাওয়া শিশু,
পেটগুলো সব ফুলে ফেঁপে ওঠে
এইটুকু শিশু এতবড় চোখ
দিশেহারা মা কারকাছে ছোটে।

সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর,
এত এত শুধু মানুষের মুখ,
যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন
ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ।

কার কাছে বলি ভাত রূটি কথা,
কাকে বলি করো, করো করো ত্রান,
কাকে বলি, ওগো মৃত্যু থামাও,
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রান।

কাঁদো কাঁদো তুমি মানুষের দল
তোমার শরীর ক্ষত দিয়ে ঢাকা,
জননীর কোলে আধপেটা শিশু
একেমন বাঁচা, বেঁচে মরে থাকা।

ছোটো ছোটো তুমি মানুষের দল,
তোমার ঘরেও মৃত্যুর ছায়া,
গুলিতে ছিন্ন দেহ মন মাটি,
ঘর ছেড়েছোতো মাটি মিছে মায়া।

সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর,
ঘর ভেঙে গেছে যুদ্ধের ঝড়ে,
যশোর রোডের দুধারে মানুষ
এত এত লোক শুধু কেনো মরে।

শত শত চোখ আকাশটা দেখে,
শত শত শত শিশু মরে গেল,
যশোর রোডের যুদ্ধ ক্ষেত্রে
ছেঁড়া সংসার সব এলোমেলো

কাদামাটি মাখা মানুষের দল,
গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ইশ্বর,
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে,
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান,
এই কালোরাত কবে হবে শেষ।

শত শত মুখ হায় একাত্তর
যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে
পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে॥