Showing posts with label বিরহের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label বিরহের কবিতা. Show all posts

বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – দর্পণ কবীর


বসন্ত নয় অবহেলা
দর্পণ কবীর


বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিলো অবহেলা
ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত!
দরজা খুলে দেখি আমাকে ভালোবেসে এসেছে অবহেলা
মধ্য দুপুরের তির্যক রোদের মতো
অনেকটা নির্লজ্জভাবে আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা
আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম
আমার দীনদশায় কারো করুণা বা আর্তিব পেখম ছড়িয়ে আছে কি না
ছিলো না
বৃষ্টিহীন জনপদে খড়খড়ে রোদ যেমন দস্যুর মতো অদমনীয়
তেমনি অবহেলাও আমাকে আগলে রেখেছিলো নির্মোহ নিঃসংকোচিত

আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভোঁ-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম
তখন দেখি আমার সামনে কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা
উপেক্ষার সঙ্গেও একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের কোলাহল মুখর আনন্দ সভায়
কি মিলেছিলো?
ঠোঁট উল্টানো ভৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো এক তাল অবজ্ঞা
তাও সয়ে গিয়েছিলো একটা সময়
ধরেই নিয়েছিলাম আমার কোনো কালেই হবে না রাবেন্দ্রিক প্রেম
তোমাদের জয়গানে করতালিতে নতজানু থেকে
ছিলো আমার চাপা আক্ষেপ লজ্জা
বুঝে গিয়েছিলাম জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে ছোঁবে না
জয়নুলের রঙ নিয়ে কল্পনার বেসাতি
হারানো দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা
বা ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হলো, এ নিয়ে কৌতূহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনো

এত কিছু নেই জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবো, সেই অমিত শক্তিও আমার ছিলো না
মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে আমার কিছুই ছিলো না
শুধু ছিলো অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা

হ্যাঁ, একবার তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা চোখে 
তাকিয়েছিলে আমার দিকে
তাচ্ছিল্য নয়, একটু মায়াই যেন ছিলো
হতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত ছিলো তোমার দৃষ্টিতে
ওইটুকুই আমার যা পাওয়া
আমি ঝড়ে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে
উপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়ে
ও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমি
এ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী

অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম
এই অবহেলা তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষা কাচের দেওয়াল, অবজ্ঞা কুচকুচে অন্ধকার
এর কিছুই থাকবে না একটি বসন্তের ফুঁৎকারে
একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে নেবো
এমন ভাবাবেগও ছিলো আকাশের কার্নিশে লেপ্টে থাকা পেঁজা মেঘের মতো
ঐ মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে নামেনি
তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনো থামেনি

অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি অনেক কিছু বদলে গেছে সেকি!
কোথায় হারালো কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন করা অবহেলা
স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে ফেলা উপেক্ষা
আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার অবজ্ঞা
ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক, তবে এখনো পোড় খাওয়া দিন বড্ড রঙিন

আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন অশ্রুকণা
আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে ঝড়ে পড়ছে নক্ষত্র
এমনকি তুমি যে সম্রাজ্ঞীর বেশের আড়ালের মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছো লাবণ্যময় পাষাণ, পাথর
এটাও দেখতে পাই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে

আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেতো কবিতার রূপ
সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরুপ।


আমার কোনো বন্ধু নেই কবিতা – সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই
সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।
সত্যি বলতে আমার কোনো বন্ধু নেই।
বন্ধু বলতে জেনেছি যাদের, তারা কেবল পথ চলতে সঙ্গী ছিলো।
দূরের পথে ট্রেনে যেমন থাকে, পাশের সিটে। গল্প হয়, দু পেয়ালা লেবু চায়ের দাম মেটাতে 'আমি দিচ্ছি, আমি দিচ্ছি' যুদ্ধ হয়। সিগারেটের বাড়িয়ে দেয়া টুকরো ফুঁকে, 'এই যে নিন ফোন নম্বর, এদিকটাতে আবার এলে ফোন করবেন', বলা শেষে অচেনা এক স্টেশনে উধাও হয়।
এই যে আমি পথ হাঁটছি, রোজ ঘাটছি বুকের ভেতর কষ্ট, ক্লেদ,
এই যে আমি ক্লান্ত ভীষণ, বুকের ভেতর জমছে কেবল দুঃখের মেদ,
তবুও আমার নিজের কোনো বৃক্ষ নেই।
প্রবল দহন দিনের শেষে, যার ছায়াতে জিরোবো ভেবে ফিরে আসার ইচ্ছে হয়,
তেমন একটা ছায়ার মতন, আগলে রাখা মায়ার মতন আমার কোনো বন্ধু নেই।

একলা দুপুর উপুড় হলে বিষাদ ঢালা নদীর মতন,
একলা মানুষ ফানুশ হলে, নিরুদ্দেশ এক বোধির মতন,
হাতের মুঠোয় হাত রাখবার একটা কোনো মানুষ নেই।

আমার কোনো বন্ধু নেই।
আমি কেবল কোলাহলে ভিড়ের ভেতর হারিয়ে যাই,
ভুল মানুষে, যত্নে জমা ফুলগুলো সব বাড়িয়ে যাই,
হাওয়ায় ভাসা দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভেবে,
নির্বাসনের একটা জীবন মাড়িয়ে যাই।

আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।


যদি তুমি ফিরে না আসো কবিতা – শামসুর রাহমান


যদি তুমি ফিরে না আসো
শামসুর রাহমান


তুমি আমাকে ভুলে যাবে, আমি ভাবতেই পারি না।
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি
আছো এই সংসারে, হাঁটছো বারান্দায়, মুখ দেখছো
আয়নায়, আঙুলে জড়াচ্ছো চুল, দেখছো
তোমার সিঁথি দিয়ে বেরিয়ে গেছে অন্তুহীন উদ্যানের পথ, দেখছো
তোমার হাতের তালুতে ঝলমল করছে রূপালি শহর,
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি অস্তিত্বের ভূভাগে ফোটাচ্ছো ফুল
আমি ভাবতেই পারি না।

যখনই ভাবি, হঠাৎ কোনো একদিন তুমি
আমাকে ভুলে যেতে পারো,
যেমন ভুলে গেছো অনেকদিন আগে পড়া
কোনো উপন্যাস, তখন ভয়
কালো কামিজ প’রে হাজির হয় আমার সামনে,
পায়চারি করে ঘন ঘন মগজের মেঝেতে,
তখন
একটা বুনো ঘোড়া খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে,
আর আমার আর্তনাদ ঘুরপাক খেতে খেতে
অবসন্ন হয়ে নিশ্চুপ এক সময়, যেমন
ভ্রষ্ট পথিকের চিৎকার হারিয়ে যায় বিশাল মরুভূমিতে।

বিদায় বেলায় সাঝটাঝ আমি মানি না
আমি চাই ফিরে এসো তুমি
স্মৃতি বিস্মৃতির প্রান্তর পেরিয়ে
শাড়ীর ঢেউ তুলে,সব অশ্লীল চিৎকার
সব বর্বর বচসা স্তব্দ করে
ফিরে এসো তুমি, ফিরে এসো
স্বপ্নের মতো চিলেকোঠায়
মিশে যাও স্পন্দনে আমার।


তোমারে পেয়ে গেলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতো কবিতা – প্রীতম কে পাল


তোমারে পেয়ে গেলে বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতো কবিতা
প্রীতম কে পাল


তােমারে পেয়ে গেলে শালার বিরাট সমস্যা হয়ে যাইতাে।
সব কথা তােমারে বলা লাগতাে, লিখার মতােন কিছু পাইতাম না।

দুপুরে হয়তাে তােমারে পাইতাম কিন্তু ছারখার করা দুপুর পাইতাম না।
বিকালে হয়তাে তােমার লগে হাঁটা লাগতাে, বিকালের বিষাদ পাইতাম না।
সারারাত তােমার সাথে ফুসফুস করে কথা বলা লাগতাে, রাত আমারে....আর পাইতাে না।
তােমারে পেয়ে গেলে আর আক্ষেপ করার মতাে কিছু থাকতাে না,
আক্ষেপের অভাবে ফাঁকা ফাঁকা লাগতাে।
তােমার দিকে তাকাইলে তােমার চোখে ডুবে যাইতাম, পিঙ্ক ফ্লয়েডে আর ডুবা হইতাে না।
তােমার ভালােবাসা পেয়ে গেলে হয়তাে চায়ের কাপের ভালােবাসা একটু কম কম লাগতাে।
তােমারে পেয়ে গেলে তােমারে না পাওয়ার কষ্ট আর পাওয়া হইতো না তখন ছোটখাটো কষ্ট শালা জ্বালায়ে মারতো।
কাছ থেকে তোমার সৌন্দর্য দেখে ফেললে হয়তো নর্দান লাইটের টর্চলাইট মনে হইতো। 
তোমার চুমু পেয়ে গেলে হয়তো খাবার দাবার সব তিতা তিতা লাগতো, চিকন শরীরে আরো অপুষ্টিতে ভুগতাম।
তোমারে পেয়ে গেলে আর কোনো কিছুর পরোয়া করতাম না তখন জগৎ সংসার ছাড়খার হইয়া যাইতে পারতো।
তাই তোমারে পেয়ে গেলে আসলেই....আসলেই শালার বিরাট সমস্যা হইয়া যাইতো।


তোমারে পড়িছে মনে কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


তোমারে পড়িছে মনে
কাজী নজরুল ইসলাম.....চক্রবাক


তোমারে পড়িছে মনে 
         আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
         যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
         কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
                   তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
                   ঝিলিমিলি-তলে
                   ম্লান লুলিত অঞ্ছলে
         চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি।

                   সিক্ত-পক্ষ পাখী
তোমার চাঁপার ডালে বসিয়া একাকী
হয়ত তেমনি করি, ডাকিছ সাথীরে,
তুমি চাহি' আছ শুধু দূর শৈল-শিরে।।
         তোমার আঁখির ঘন নীলাঞ্জন ছায়া
         গগনে গগনে আজ ধরিয়াছে কায়া।

আজি হেথা রচি' নব নীপ-মালা--
স্মরণ পারের প্রিয়া, একান্তে নিরালা
         অকারণে !-জানি আমি জানি
তোমারে পাব না আমি। এই গান এই মালাখানি
রহিবে তাদেরি কন্ঠে- যাহাদেরে কভু
চাহি নাই, কুসুমে কাঁটার মত জড়ায়ে রহিল যারা তবু।
বহে আজি দিশাহারা শ্রাবণের অশান্ত পবন,
তারি মত ছুটে ফেরে দিকে দিকে উচাটন মন,
         খুঁজে যায় মোর গীত-সুর
কোথা কোন্‌ বাতায়নে বসি' তুমি বিরহ-বিধুর।
তোমার গগনে নেভে বারে বারে বিজলীর দীপ,
আমার অঙ্গনে হেথা বিকশিয়া ঝরে যায় নীপ।
         তোমার গগনে ঝরে ধারা অবিরল,
আমার নয়নে হেথা জল নাই, বুকে ব্যথা করে টলমল।

আমার বেদনা আজি রূপ ধরি' শত গীত-সুরে
নিখিল বিরহী-কন্ঠে--বিরহিণী--তব তরে ঝুরে!
         এ-পারে ও-পারে মোরা, নাই নাই কূল!
         তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দেই ফুল!


দূরের বন্ধু কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


দূরের বন্ধু
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট

বন্ধু আমার! থেকে থেকে কোন্‌ সুদূরের বিজন পুরে
       ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে?
আমার অনেক দুখের পথের বাসা বারে বারে ঝড়ে উড়ে,
       ঘর-ছাড়া তাই বেড়াই ঘুরে।।
      তোমার বাঁশীর উদাস কাদন
  শিথিল করে সকল বাঁধন
       কাজ হ’ল তাই পথিক সাধন,
খুঁজে ফেরা পথ-বঁধরে,
 ঘুরে’ ঘুরে’ দূরে দূরে।।

হে মোর প্রিয়! তোমার বুকে একটুকুতেই হিংসা জাগে,
তাই তো পথে হয় না থামা-তোমার ব্যথা বক্ষে লাগে!

   বাঁধতে বাসা পথের পাশে
    তোমার চোখে কান্না আসে
উত্তরী বায় ভেজা ঘাসে
     শ্বাস ওঠে আর নয়ন বুঝে,
    বন্ধু, তোমার সুরে সুরে।।


আপন-পিয়াসী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


আপন-পিয়াসী
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
      খুঁজি তারে আমি আপনার,
      আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
      আমারি তিয়াসী বাসনায়।।
   
আমারই মনের তৃষিত আকাশে
কাঁদে সে চাতক আকুল পিয়াসে,

কভু সে চকোর সুধা-চোর আসে
নিশীথে স্বপনে জোছনায়।।

আমার মনের পিয়াল তমালে হেরি তারে স্নেহ-মেঘ-শ্যাম,
অশনি-আলোকে হেরি তারে থির-বিজুলি-উজল অভিরাম।।
      আমারই রচিত কাননে বসিয়া
      পরানু পিয়ারে মালিকা রচিয়া,
      সে মালা সহসা দেখিনু জাগিয়া,
      আপনারি গলে দোলে হায়।।


কমল-কাঁটা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


কমল-কাঁটা
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


আজকে দেখি হিংসা-মদের মত্ত-বারণ-রণে
জাগ্‌ছে শুধু মৃণাল-কাঁটা আমার কমল-বনে।
    উঠল কখন ভীম কোলাহল,
    আমার বুকের রক্ত-কমল
    কে ছিঁড়িল-বাঁধ-ভরা জল
    শুধায় ক্ষণে ক্ষণে।
ঢেউ-এর দোলায় মরাল-তরী নাচ্‌বে না আন্‌মনে।।

কাঁটাও আমার যায় না কেন, কমল গেল যদি!
সিনান-বধূর শাপ শুধু আজ কুড়াই নিরবধি!
    আস্‌বে কি আর পথিক-বালা?
    প’রবে আমার মৃণাল-মালা?
    আমার জলজ-কাঁটার জ্বালা
    জ্ব’লবে মোরই মনে?
ফুল না পেয়েও কমল-কাঁটা বাঁধবে কে কঙ্কণে?


চৈতী হাওয়া কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


চৈতী হাওয়া
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


হারিয়ে গেছ অন্ধকারে-পাইনি খুঁজে আর,
আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!
        আজ্‌কে তোমার জন্মদিন-
        স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন
হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার!
এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!

শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল,
কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?
        আঁধার দীঘির রাঙলে মুখ,
        নিটোল ঢেউ-এর ভাঙলে বুক,-
কোন্‌ পূজারী নিল ছিঁড়ে? ছিন্ন তোমার দল
ঢেকেছে আজ কোন্‌ দেবতার কোন্‌ সে পাষাণ-তল?

অস্ত-খেয়ার হারামাণিক-বোঝাই-করা না’
আস্‌ছে নিতুই ফিরিয়ে দেওয়ার উদয়-পারের গাঁ
        ঘাটে আমি রই ব’সে
        আমার মাণিক কই গো সে?
পারাবারের ঢেউ-দোলানী হান্‌ছে বুকে ঘা!
আমি খুঁজি ভিড়ের মাঝে চেনা কমল-পা!

বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুম্‌রে ওঠে মন,
পেয়েছিলাম এম্‌নি হাওয়ায় তোমার পরশন।
        তেম্‌নি আবার মহুয়া-মউ
        মৌমাছিদের কৃষ্ণ-বউ
পান ক’রে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল বন,
ফুল-সৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!

প’ড়ছে মনে টগর চাঁপা বেল চামেলি যুঁই,
মধুপ দেখে যাদের শাখা আপ্‌নি যেত নুই।
        হাস্‌তে তুমি দুলিয়ে ডাল,
        গোলাপ হ’য়ে ফুটতো গাল
থর্‌কমলী আঁউরে যেত তপ্ত ও-গাল ছুঁই!
বকুল শাখা-ব্যকুল হ’ত টলমলাত ভুঁই!

চৈতী রাতের গাইত’ গজল বুলবুলিয়ার রব,
দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর!
        ভুঁই- তারকা সুন্দরী
        সজনে ফুলের দল ঝরি’
থোপা থোপা লা ছড়াত দোলন-খোঁপার’ পর।
ঝাজাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!

পিয়ালবনায় পলাশ ফুলের গেলাস-ভরা মউ!
খেত বঁধুর জড়িয়ে গলা সাঁওতালিয়া বউ!
        লুকিয়ে তুমি দেখতে তাই,
        বলতে, ‘আমি অমনি চাই!
খোঁপায় দিতাম চাঁপা গুঁজে, ঠোঁটে দিতাম মউ!
হিজল শাখায় ডাকত পাখি “ বউ গো কথা কউ”

ডাকত ডাহুক জল- পায়রা নাচত ভরা বিল,
জোড়া ভুর” ওড়া যেন আসমানে গাঙচিল
        হঠাৎ জলে রাখত্‌ে পা,
        কাজলা দীঘির শিউরে গা-
কাঁটা দিয়ে উঠত মৃণাল ফুটত কমল-ঝিল!
ডাগর চোখে লাগত তোমার সাগর দীঘির নীল!

উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়,
ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়!
        শঙ্খ বাজে মন্দিরে,
        সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে,
ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়!
মাঠের বাঁশী বন্‌-উদাসী ভীম্‌পলাশী গায়অ

বাউল আজি বাউল হ’ল আমরা তফাতে!
আম-মুকুলের গুঁজি-কাঠি দাও কি খোঁপাতে?
        ডাবের শীতল জল দিয়ে
        মুখ মাজ’কি আর প্রিয়ে?
প্রজাপতির ডাক-ঝরা সোনার টোপাতে
ভাঙা ভুর” দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে?

বউল ঝ’রে  ফ’লেছ আজ থোলো থোলো আম,
রসের পীড়ায় টস্‌টসে বুক ঝুরছে গোপাবজাম!
        কামরাঙারা রাঙল ফের
        পীড়ন পেতে ঐ মুখের,
স্মরণ ক’রে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম-
জামর”লে রস ফেটে পড়ে, হায়, কে দেবে দাম!

ক’রেছিলাম চাউনি চয়ন নয়ন হ’তে তোর,
ভেবেছিলুম গাঁথ্‌ব মালা পাইনে খুঁজে ডোর!
        সেই চাহনি নীল-কমল
        ভ’রল আমার মানস-জল,
কমল-কাঁটার ঘা লেগেছে মর্মমূলে মোর!
বক্ষে আমার দুলে আঁখির সাতনরী-হার লোর!

তরী আমার কোন্‌ কিনারায় পাইনে খুঁজে কুল,
স্মরণ-পারের গন্ধ পাঠায় কমলা নেবুর ফুল!
        পাহাড়তলীর শালবনায়
        বিষের মত নীল ঘনায়!
সাঁঝ প’রেছে ঐ দ্বিতীয়ার-চাঁদ-ইহুদী-দুল!
হায় গো, আমার ভিন্‌ গাঁয়ে আজ পথ হ’য়েছে ভুল!

কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই,
কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই!
        কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর-
        কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর?
তেমনি ক’রে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই?
কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে যাওয়া খেই!

পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’,
এই তরীতে হয়ত তোমার প’ড়বে রাঙা পা!
        আবার তোমার সুখ-ছোঁওয়ায়
        আকুল দোলা লাগবে না’য়,
এক তরীতে যাব মোরা আর-না-হারা গাঁ
পারাপারের ঘাটে প্রিয় রইনু বেঁধে না’।।


ব্যথা-নিশীথ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ব্যথা-নিশীথ
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


এই নীরব নিশীথ রাতে
শুধু জল আসে আঁখিপাতে।

কেন কি কথা স্মরণে রাজে?
বুকে কার হতাদর বাজে?
কোন্‌ ক্রন্দন হিয়া-মাঝে
ওঠে গুমরি’ ব্যর্থতাতে
            আর জল ভরে আঁখি-পাতে।।

মম বর্থ জীবন-বেদনা
এই নিশীথে লুকাতে নারি,
তাই গোপনে একাকী শয়নে
শুধু নয়নে উথলে বারি।
ছিল সেদিনো এমনি নিশা,
বুকে জেগেছিল শত তৃষা
তারি ব্যর্থ নিশাস মিশা
ওই শিথিল শেফালিকাতে
            আর পূরবীতে বেদনাতে।।


সন্ধ্যাতারা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সন্ধ্যাতারা
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


ঘোম্‌টা-পরা কাদের ঘরের বৌ তুমি ভাই সন্ধ্যাতারা?
তোমার চোখে দৃষ্টি জাগে হারানো কোন্‌ মুখের পারা।।

সাঁঝের প্রদীপ আঁচল ঝেঁপে
বঁধুর পথে চাইতে বেঁকে
চাউনিটি কার উঠছে কেঁপে
রোজ সাঁঝে ভাই এমনি ধারা।।

কারা হারানো বধূ তুমি অস-পথে মৌন মুখে
ঘনাও সাঁঝে ঘরের মায়া গৃহহীনের শূন্য বুকে।

এই যে নিতুই আসা-যাওয়া,
এমন কর”ণ মলিন চাওয়া,
কার তরে হায় আকাশ-বধু
তুমিও কি আজ প্রিয়-হারা।।


বিদায়-বেলায় কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


বিদায়-বেলায়
কাজী নজরুল ইসলাম.....ছায়ানট


তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না,
জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না।
ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না,
       শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।।
হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা,
আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ
দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
চলার তোমার বাকী পথটুকু-
পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক-
হায়,  অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না,
       ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।।

দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি
তব ব্যথা কেউ বোঝে না,
তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী,
পথে ফেরে যারা পথ-হারা,
কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না,
বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি?
দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে?
এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে!
তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায় 
কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায়
আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়-
পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক!
কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো
মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না,
       ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।


অবেলার ডাক কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


অবেলার ডাক
কাজী নজরুল ইসলাম.....দোলনচাঁপা


অনেক ক’রে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে,
আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।।

আজ মনে হয় রোজ রাতে সে ঘুম পাড়াত নয়ন চুমে,
চুমুর পরে চুম দিয়ে ফের হান্‌তে আঘাত ভোরের ঘুমে।
               ভাব্‌তুম তখন এ কোন্‌ বালাই!
               কর্‌ত এ প্রাণ পালাই পালাই।
আজ সে কথা মনে হ’য়ে ভাসি অঝোর নয়ন-ঝরে।
অভাগিনীর সে গরব আজ ধূলায় লুটায় ব্যথার ভারে।।

তর”ণ তাহার ভরাট বুকের উপ্‌চে-পড়া আদর সোহাগ
হেলায় দু’পায় দ’লেছি মা, আজ কেন হায় তার অনুরাগ?
               এই চরণ সে বক্ষে চেপে
               চুমেছে, আর দু’চোখ ছেপে
জল ঝ’রেছে, তখনো মা কইনি কথা অহঙ্কারে,
এম্‌নি দার”ণ হতাদরে ক’রেছি মা, বিদায় তারে।।

দেখেওছিলাম বুক-ভরা তার অনাদরের আঘাত-কাঁটা,
দ্বার হ’তে সে গেছে দ্বারে খেয়ে সবার লাথি-ঝাটা।
               ভেবেছিলাম আমার কাছে
               তার দরদের শানি- আছে,
আমিও গো মা ফিরিয়ে দিলাম চিন্‌তে নেরে দেবতারে।
ভিক্ষুবেশে এসেছিল রাজাধিরাজ দাসীর দ্বারে।।

পথ ভুলে সে এসেছিল সে মোর সাধের রাজ-ভিখারী,
মাগো আমি ভিখারিনী, আমি কি তাঁয় চিন্‌তে পারি?
               তাই মাগো তাঁর পূজার ডালা
               নিইনি, নিইনি মণির মালা,
দেব্‌তা আমার নিজে আমায় পূজল ষোড়শ-উপচারে।
পূজারীকে চিন্‌লাম না মা পূজা-ধূমের অন্ধকারে।।

আমায় চাওয়াই শেষ চাওয়া তার মাগো আমি তা কি জানি?
ধরায় শুধু রইল ধরা রাজ-অতিথির বিদায়-বাণী।
               ওরে আমার ভালোবাসা!
               কোথায় বেঁধেছিলি বাসা
যখন আমার রাজা এসে দাঁড়িয়েছিল এই দুয়ারে?
নিঃশ্বসিয়া উঠছে ধরা, ‘নেই রে সে নেই, খুঁজিস কারে!’

সে যে পথের চির-পথিক, তার কি সহে ঘরের মায়া?
দূর হ’তে মা দূরন-রে ডাকে তাকে পথের ছায়া।
               মাঠের পারে বনের মাঝে
               চপল তাহার নূপুর বাজে,
ফুলের সাথে ফুটে বেড়ায়, মেঘের সাথে যায় পাহাড়ে,
ধরা দিয়েও দেয় না ধরা জানি না সে চায় কাহারে?

মাগো আমায় শক্তি কোথায় পথ-পাগলে ধ’রে রাখার?
তার তরে নয় ভালোবাসা সন্ধ্যা-প্রদীপ ঘরে ডাকার।
               তাই মা আমার বুকের কবাট
               খুলতে নারল তার করাঘাত,
এ মন তখন কেমন যেন বাসত ভালো আর কাহারে,
আমিই দূরে ঠেলে দিলাম অভিমানী ঘর-হারারে।।

সোহাগে সে ধ’রতে যেত নিবিড় ক’রে বক্ষে চেপে,
হতভাগী পারিয়ে যেতাম ভয়ে এ বুক উঠ্‌ত কেঁপে।
               রাজ ভিখারীর আঁখির কালো,
               দূরে থেকেই লাগ্‌ত ভালো,
আসলে কাছে ক্ষুধিত তার দীঘল চাওয়া অশ্র”-ভারে।
ব্যথায় কেমন মুষড়ে যেতাম, সুর হারাতাম মনে তরে।।

আজ কেন মা তারই মতন আমারো এই বুকের ক্ষুধা
চায় শুধু সেই হেলায় হারা আদর-সোহাগ পরশ-সুধা,
               আজ মনে হয় তাঁর সে বুকে
               এ মুখ চেপে নিবিড় সুখে
গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ ক’রে দিই এ আমারে!
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাঁহার দেশের কানন-পারে?

আজ বুঝেছি এ-জনমের আমার নিখিল শানি–আরাম
চুরি ক’রে পালিয়ে গেছে চোরের রাজা সেই প্রাণারাম।
               হে বসনে-র রাজা আমার!
               নাও এসে মোর হার-মানা-হারা!
আজ যে আমার বুক ফেটে যায় আর্তনাদের হাহাকারে,
দেখে যাও আজ সেই পাষাণী কেমন ক’রে কাঁদতে পারে!

তোমার কথাই সত্য হ’ল পাষাণ ফেটেও রক্ত বহে,
দাবাললের দার”ণ দাহ তুষার-গিরি আজকে দহে।
               জাগল বুকে ভীষণ জোয়ার,
               ভাঙল আগল ভাঙল দুয়ার
মূকের বুকে দেব্‌তা এলেন মুখর মুখে ভীম পাথারে।
বুক ফেটেছে মুখ ফুটেছে-মাগো মানা ক’র্‌ছ কারে?

স্বর্গ আমার গেছে পুড়ে তারই চ’লে যাওয়ার সাথে,
এখন আমার একার বাসার দোসরহীন এই দুঃখ-রাতে।
               ঘুম ভাঙাতে আস্‌বে না সে
               ভোর না হ’তেই শিয়র-পাশে,
আস্‌বে না আর গভীর রাতে চুম-চুরির অভিসারে,
কাঁদাবে ফিরে তাঁহার সাথী ঝড়ের রাতি বনের পারে।

আজ পেলে তাঁয় হুম্‌ড়ি খেয়ে প’ড়তুম মাগো যুগল পদে,
বুকে ধ’রে পদ-কোকনদ স্নান করাতাম আঁখির হ্রদে।
               ব’সতে দিতাম আধেক আঁচল,
               সজল চোখের চোখ-ভরা জল-
ভেজা কাজল মুছতাম তার চোখে মুখে অধর-ধারে,
আকুল কেশে পা মুছাতাম বেঁধে বাহুর কারাগারে।

দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী,
মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’
               ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে
               লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে,
বুক হ’তে মুখ আস্‌ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে,
দেখ্‌তে মাগো তখন তোমার রাক্ষুসী এই সর্বনাশী,
মুখ থুয়ে তাঁর উদার বুকে ব’লত,‘ আমি ভালোবাসি!’
               ব’ল্‌তে গিয়ে সুখ-শরমে
               লাল হ’য়ে গাল উঠত ঘেমে,
বুক হ’তে মুখ আস্‌ত নেমে লুটিয়ে যখন কোল-কিনারে,
দেখ্‌তুম মাগো তখন কেমন মান ক’রে সে থাক্‌তে পারে!

এম্‌নি এখন কতই আমা ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগে
তাঁর ওপর মা অভিমানে, ব্যাথায়, রাগে, অনুরাগে।
               চোখের জলের ঋণী ক’রে,
               সে গেছে কোন্‌ দ্বীপান-রে?
সে বুঝি মা সাত সমুদ্দুর তের নদীর সুদূরপারে?
ঝড়ের হাওয়া সেও বুঝি মা সে দূর-দেশে যেতে নারে?

তারে আমি ভালোবাসি সে যদি তা পায় মা খবর,
চৌচির হ’য়ে প’ড়বে ফেটে আনন্দে মা তাহার কবর।
               চীৎকারে তার উঠবে কেঁপে
               ধরার সাগর অশ্র” ছেপে,
উঠবে ক্ষেপে অগ্নি-গিরি সেই পাগলের হুহুঙ্কারে,
ভূধর সাগর আকাশ বাতাস ঘুর্ণি নেচে ঘিরবে তারে।

ছি, মা! তুমি ডুকরে কেন উঠছ কেঁদে অমন ক’রে?
তার চেয়ে মা তারই কোনো শোনা-কথা শুনাও মোরে!
               শুনতে শুনতে তোমার কোলে
              ঘুমিয়ে পড়ি। – ও কে খোলে
দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মতো ধাক্কা মারে?
ঝোড়ো হওয়া! ঝোড়ো হাওয়া! বন্ধু তোমার সাগর পারে!

সে কি হেথায় আসতে পারে আমি যেথায় আছি বেঁচে,
যে দেশে নেই আমার ছায়া এবার সে সেই দেশে গেছে!
               তবু কেন থাকি’ থাকি’,
               ইচ্ছা করে তারেই ডাকি!
যে কথা মোর রইল বাকী হায় যে কথা শুনাই কারে?
মাগো আমার প্রাণের কাঁদন আছড়ে মরে বুকের দ্বারে!

যাই তবে মা! দেকা হ’লে আমার কথা ব’লো তারে-
রাজার পূজা-সে কি কভু ভিখারিনী ঠেলতে পারে?
               মাগো আমি জানি জানি,
               আসবে আবার অভিমানী
খুঁজতে আমায় গভীর রাতে এই আমাদের কুটীর-দ্বারে,
ব’লো তখন খুঁজতে তারেই হারিয়ে গেছি অন্ধকারে!


অভিশাপ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


অভিশাপ
কাজী নজরুল ইসলাম.....দোলনচাঁপা


যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-
                      বুঝবে সেদিন বুঝবে!
                      ছবি আমার বুকে বেঁধে
                      পাগল হ’লে কেঁদে কেঁদে
                       ফিরবে মর” কানন গিরি,
                       সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
                       যেদিন আমায় খুঁজবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!

স্বপন ভেঙে নিশুত্‌ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,-
                       জাগবে হঠাৎ চমকে!
                       ভাববে বুঝি আমিই এসে 
                       ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
                       ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
                       শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
                       বেদ্‌নাতে চোখ বুঁজবে-
                       বুঝবে সেদিন বুজবে।

গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিঁড়ে আস্‌বে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই-“ সেই য পথিক তার শেখানো গান না?’’
                       আস্‌বে ভেঙে কান্না!
                       প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
                       কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
                       প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
                       অশ্র”-হারা কঠিন আঁখি
                       ঘন ঘন মুছবে-
                       বুঝ্‌বে সেদিন বুঝবে!

আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ-
                       কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
                       শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
                       প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
                       বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
                       চোখের জলে সেদিন বালা
                       মুখের হাসি ঘুচবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির-ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই – থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রী!
                       আসবে শিশির-রাত্রি!
                       থাকবে পাশে বন্ধু স্বজন,
                       থাকবে রাতে বাহুর বাঁধন,
                       বঁধুর বুকের পরশনে
                       আমার পরশ আনবে মনে-
                       বিষিয়ে ও-বুক উঠবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আসবে আবার শীতের রাতি, আসবে না ক আ সে-
তোমার সুখে প’ড়ত বাধা থাকলে যে-জন পার্শ্বে,
                       আসবে না ক’ আর সে!
                       প’ড়বে মনে, মোর বাহুতে
                       মাথা থুয়ে যে-দিন শুতে,
                       মুখ ফিরিয়ে থাকতে ঘৃণায়!
                       সেই স্মৃতি তো ঐ বিছানায়
                       কাঁটা হ’য়ে ফুটবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আবার গাঙে আসবে জোয়ার, দুলবে তরী রঙ্গে,
সেই তরীতে হয়ত কেহ থাকবে তোমার সঙ্গে-
                       দুলবে তরী রঙ্গে,
                       প’ড়বে মনে সে কোন্‌ রাতে
                       এক তরীতে ছিলেম সাথে,
                       এমনি গাঙ ছিল জোয়ার,
                       নদীর দু’ধার এমনি আঁধার
                       তেম্‌নি তরী ছুটবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!

তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-
                       সখার কারা-বন্ধ!
                       বন্ধু তোমার হান্‌বে হেলা
                       ভাঙবে তোমার সুখের মেলা;
                       দীর্ঘ বেলা কাটবে না আর,
                       বইতে প্রাণের শান- এ ভার
                       মরণ-সনে বুঝ্‌বে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝ্‌বে!

ফুট্‌বে আবার দোলন চাঁপা চৈতী-রাতের চাঁদনী,
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদ্‌নী-
                       চৈতী-রাতের চাঁদ্‌নী।
                       ঋতুর পরে ফির্‌বে ঋতু,
                       সেদিন-হে মোর সোহাগ-ভীতু!
                       চাইবে কেঁদে নীল নভো গা’য়,
                       আমার মতন চোখ ভ’রে চায়
                       যে-তারা তা’য় খুঁজবে-
                       বুঝ্‌বে সেদিন বুঝ্‌বে!

আস্‌বে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন,
কাঁপবে কুটীর সেদিন ত্রাসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন-
                       টুটবে যবে বন্ধন!
                       পড়বে মনে, নেই সে সাথে
                       বাঁধবে বুকে দুঃখ-রাতে-
                       আপনি গালে যাচবে চুমা,
                       চাইবে আদর, মাগ্‌বে ছোঁওয়া,
                       আপনি যেচে চুমবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে।

আমার বুকের যে কাঁটা-ঘা তোমায় ব্যথা হান্‌ত,
সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়ত হ’য়ে শ্রান–
                       আসবে তখন পান’।
                       হয়ত তখন আমার কোলে
                       সোহাগ-লোভে প’ড়বে ঢ’লে,
                       আপনি সেদিন সেধে কেঁদে
                       চাপ্‌বে বুকে বাহু বেঁধে,
                       চরণ চুমে পূজবে-
                       বুঝবে সেদিন বুঝবে!


পিছু-ডাক কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


পিছু-ডাক
কাজী নজরুল ইসলাম.....দোলনচাঁপা


সখি!  নতুন ঘরে গিয়ে আমায় প’ড়বে কি আর মনে?
সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আযোজনে!
            প্রথম দেখা তোমায় আমায়
            যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
            যেথায় প্রতি ধূলিকণায়,
            লতাপাতার সনে
নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে,
শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।।

সেথা  তুমি যখন ভুল্‌তে আমায়, আস্‌ত অনেক কেহ,
তখন  আমার হ’য়ে অভিমানে কাঁদত যে ঐ গেহ।
           যেদিক পানে চাইতে সেথা
           বাজ্‌তে আমার স্মৃতির ব্যথা,
           সে গ্লানি আজ ভুলবে হেথা
           নতুন আলাপনে।
আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে।।

আমার  এত দিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দুর,
ওগো  আমার সুদুর ক’রত নিকট ঐ পুরাতন পুর।
        এখন তোমার নতুন বাঁধন
           নতুন হাসি, নতুন কাঁদন,
           নতুন সাধন, গানের মাতন
           নতুন আবাহনে।
আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদুর পুরাতন।।

সখি!  আমার আশাই দুরাশা আজ, তোমার বিধির বর,
আজ  মোর সমাধির বুকে তোমার উঠবে বাসর-ঘর!
           শূণ্য ভ’রে শুনতে পেনু
           ধেনু-চরা বনের বেণু-
           হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
           অন–দিগঙ্গনে।
বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।।


কেউ কথা রাখেনি কবিতা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


কেউ কথা রাখেনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিলো
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি ।

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে !
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁরে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে ?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি !
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না !

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে !
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী !
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা !


আমার বন্ধু নিরঞ্জন কবিতা – ভাস্কর চৌধুরী


আমার বন্ধু নিরঞ্জন
ভাস্কর চৌধুরী


অনেক কথা বলবার আছে আমার
তবে সবার আগে নিরঞ্জনের কথা বলতে হবে আমাকে
নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম, আর কোন নাম ছিল কি তার?
আমি জানতাম না।
ওর একজন বান্ধবী ছিল অবশ্য কিছু দিনের জন্য
সে তাকে ‘প্রীতম’ বলে ডাকত।

ওর বান্ধবীর নাম ছিল জয়লতা
নিরঞ্জন জয়লতা সম্পর্কে আমাকে কিছু বলেনি তেমন।
জয়লতাকে কখনো কোন চিঠি লিখেছিল কিনা
সে কথাও আমাকে সে বলেনি।
তবে জয়লতার চিঠি আমি দেখেছি
একটা চিঠি ছিল এরকম-
প্রীতম,
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। তুমি বলেছ, এখন দুঃসময়-
কিন্তু আমি জানি, সবসময়ই সুসময়, যদি কেউ ব্যবহার করতে জানে তাকে
আমি বুঝি বেশী দিন নেই যদি পার এক্ষুনি তুলে নাও
নইলে অন্য পুরুষ ছিবড়ে খাবে আমাকে-


আমার ঘরে বসে সিগারেট টানতে টানতে
নিরঞ্জন চিঠিটা চুপ করে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, বিভূ, চিঠিটা পড়ুন।

আমি প্রথমে পড়তে চাইনি।।
পরে ওইটুকু পড়ে তার দিকে তাকিয়েছিলাম-
না-ওই সিগারেটের ধূঁয়োয়
আমি কোন নারী প্রেম-
তাড়িত মানুষের ছায়া দেখিনি- ভয়ানক নির্বিকার।
কিছু বলছেন না যে? আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম
কি বলবো? এই ব্যাপারে। কোন ব্যাপারে?
এই যে জয়লতা।
বাদ দিন।

আমি বাদ দিয়েছিলাম।
নিরঞ্জন আমার ঘরে বসে অনেকক্ষণ সিগারেট
টেনে টেনে ঘরটাকে অন্ধকার করে চলে গিয়েছিল সেদিন।
জয়লতার সঙ্গে অন্য পুরুষের বিয়ে হয়েছিল
আমি জয়লতা এবং অন্য পুরুষটিকে দেখেছি
বহুবার, বিশ্ববিদ্যালয়েই।
জয়লতা আরো দেমাগী
আরো সুন্দরী হয়ে উঠেছিল।
অন্য পুরুষ ছিবড়ে খেলে মেয়েরা বুঝি
আরো সুন্দরী হতে থাকে?


এ কথার সূত্রে সেদিন নিরঞ্জন আমাকে বলেছিল,
মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন। আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।

হ্যাঁ, মানুষের মুক্তির জন্য
নিরঞ্জন মিছিল করতো।
আমি শুনেছি নিরঞ্জন বলছে…
তুমি দুস্কৃতি মারো, বাঙালি মারো
হিন্দু-মুসলমান মারো, গেরিলা-তামিল মারো
এভাবে যেখানে যাকেই মারো না কেন
ইতিহাস লিখবে যে এত মানুষ মরেছে
বড়ই করুণ এবং বড়ই দুঃখজনক
শক্তির স্বপক্ষে তুমি যারই মৃত্যু উল্লেখ করে
উল্লাস করনা কেন
মনে রেখো মানুষই মরেছে
এই ভয়ঙ্কর সত্য কথা বলে নিরঞ্জন
মিছিলে হাত উঠিয়ে বলেছিল,
এভাবে মানুষ মারা চলবে না।
মানুষকে বাঁচতে দাও।

নিরঞ্জন বাঁচেনি।
তার উদ্যত হাতে লেগেছিল
মানুষের হাতে বানানো বন্দুকের গুলি।
বুকেও লেগেছিল- যেখান থেকে ‘মানুষ’ শব্দটি
বড় পবিত্রতায় বেরিয়ে আসতো।
সে লাশ-
আমার বন্ধু নিরঞ্জনের লাশ,
আমি দেখেছি
রক্তাক্ত ছিন্ন ভিন্ন লাশ,
মানুষ কাঁধে করে
তাকে বয়ে এনেছিল মানুষের কাছে।
জয়লতা সে লাশ দেখেছিল কিনা
সে প্রশ্ন উঠছে না।
দেখলেও যদি কেঁদে থাকে
সে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে
তাতে নিরঞ্জনের কোন লাভ হয়নি।
মানুষ কেঁদেছিল
আমি জানি তাতে নিরঞ্জনের লাভ ছিল।
নিরঞ্জন প্রমাণ করতে পেরেছিল
গতকাল মিছিলে
আইন অমান্যের অভিযোগে
যে দুস্কৃতি মারা গিয়েছে
তার নাম নিরঞ্জন-
সে আসলে ‘মানুষ’।