Showing posts with label সাম্যবাদী ১৯২৫. Show all posts
Showing posts with label সাম্যবাদী ১৯২৫. Show all posts

ঈশ্বর কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


ঈশ্বর
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তুমি খুঁজিছ জগদীশ ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে’
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে?
                          হায় ঋষি দরবেশ,
বুকের মানিকে বুকে ধ’রে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ।
সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে,
স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে!
ইচ্ছা-অন্ধ! আঁখি খোলো, দেশ দর্পণে নিজ-কায়া,
দেখিবে, তোমারি সব অবয়বে প’ড়েছে তাঁহার ছায়া।
শিহরি’ উঠো না, শাস্ত্রবিদের ক’রো না ক’ বীর, ভয়-
তাহারা খোদার খোদ্‌ ‘ প্রাইভেট সেক্রেটারী’ ত নয়!
সকলের মাঝে প্রকাশ তাঁহার, সকলের মাঝে তিনি!
আমারে দেখিয়া আমার অদেখা জন্মদাতারে চিনি!
রত্ন লইয়া বেচা-কেনা করে বণিক সিন্ধু-কুলে-
রত্নাকরের খবর তা ব’লে পুছো না ওদের ভুলে’।
                          উহারা রত্ন-বেনে,
রত্ন চিনিয়া মনে করে ওরা রত্নাকরেও চেনে!
ডুবে নাই তা’রা অতল গভীর রত্ন-সিন্ধুতলে,
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও, সখা, সত্য-সিন্ধু-জলে।


নারী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


নারী
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই-
              আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
              বিশ্বে যা-কিছু মহান্‌ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
              অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
              বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
              অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
              নরককুন্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
              তারে বলো, আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান।
              অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
              ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
              এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
              নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।
              তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছে যত ফল,
              অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
              জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
              সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি’।
              পুরুষ এনেছে যামিনী-শানি-, সমীরণ, বারিবাহ!
              দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীতে হ’য়েছে বধূ,
              পুরুষ এসেছে মরুতৃষা ল’য়ে, নারী যোগায়েছে মধু।
              শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হল,
              নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
              নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে’
              ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।

স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
              নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হ’য়েছে অলঙ্কার।
              নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
              যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
              নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে’
              জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে!
              জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,
              মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান্‌।
              কোন্‌ রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে,
              কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
              কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি’ কত বোন দিল সেবা,
              বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
              কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
              প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।
              রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
              রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।

পুরুষ হৃদয়-হীন,
              মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।
              ধরায় যাঁদের যশ ধরে না’ক অমর মহামানব,
              বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উৎসব,
              খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা,-
              লব-কুশে বনে ত্যজিয়াছে রাম, পালন ক’রেছে সীতা।
              নারী সে শিখা’ল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
              দীপ্ত নয়নে পরা’ল কাজল বেদনার ঘন ছায়া।
              অদ্ভুতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
              বুকে ক’রে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ!

তিনি নর-অবতার-
              পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার।
              পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
              নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর।
সে যুগ হয়েছে বাসি,
              যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী!
              বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
              কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও , উঠিছে ডঙ্কা বাজি’।
              নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
              আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
যুগের ধর্ম এই-
              পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

শোনো মর্ত্যের জীব!
              অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
              স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
              করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
              আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
              আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
              চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
              মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
              যে ঘোমটা তোমা’ করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
              দূর ক’রে দাও দাসীর চিহ্ন, যেথা যত আভরণ!

ধরার দুলালী মেয়ে,
              ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে।
              কখন আসিল ‘প্নুটো’ যমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
              ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
              সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হ’তে আছ মরি’
              মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী।
              ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’!
              আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
              পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
              লুটায়ে পড়িবে ও চরন-তলে দলিত যমের সাথে!
              এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
              যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
সেদিন সুদূর নয়-
              যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!


মানুষ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


মানুষ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


গাহি সাম্যের গান-
                মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান্‌ ।
                নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
                সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- 
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
                ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’
                স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
                দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!
                জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
                ডাকিল পান’, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন!’
                সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
                তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
                ভুখারী ফুকারি’ কয়,
                ‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
                মসজিদে কাল শির্‌নী আছিল,-অঢেল গোস–র”টি
                বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি,
                এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্‌
                বলে, ‘বাবা, আমি ভূখা-ফাকা আমি আজ নিয়ে সাত দিন!’
                তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা-‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
                ভূখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
                ভূখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল-‘তা হলে শালা
                সোজা পথ দেখ!’ গোস–র”টি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
                ভুখারী ফিরিয়া চলে, চলিতে চলিতে বলে-
                ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
                আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে বন্ধ করনি প্রভু।
                তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
                মোল্লা-পুর”ত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
                কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
                ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
                খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
                সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
                তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
                ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’
                ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন’ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
                যাহারা আনিল গ্রন’-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
                পূজিছে গ্রন’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
                মানুষ এনেছে গ্রন’;-গ্রন’ আনেনি মানুষ কোনো।
                আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
                কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
                আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
                তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!
                আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
                কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
                হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
                আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
                হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
                কে জানে কাহার অন- ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
                কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
                হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!
                অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উ”চ নহে,
                আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
                তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন’ ভজনালয়
                ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
                হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
                জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
                যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
                আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
                ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
                ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
                আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
                তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।
                রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
                হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
                দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
                যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
                তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।
                দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
                তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
                তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
                দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
                কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!

                বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
                নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
                মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,
                তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
                তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
                তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!
তোমারি কামনা-রাণী
                যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।


পাপ কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


পাপ
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


সাম্যের গান গাই!-
                   যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।
                   এ পাপ-মুলুকে পাপ করেনি করেনিক’ কে আছে পুরুষ-নারী?
                   আমরা ত ছার; পাপে পঙ্কিল পাপীদের কাণ্ডারী! 
                   তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,
                   দেবতার পাপ-পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল!
                   আদম হইতে শুরু ক’রে এই নজরুল তক্‌ সবে
                   কম-বেশী ক’রে পাপের ছুরিতে পুণ্য করেছে জবেহ্‌ !
বিশ্ব পাপস্থান
                   অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্‌!
থর্মান্ধরা শোনো,
                   অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!
                   পাপের পঙ্কে পুণ্য-পদ্ম, ফুলে ফুলে হেথা পাপ!
                   সুন্দর এই ধরা-ভরা শুধু বঞ্চনা অভিশাপ।
                   এদের এড়াতে না পারিয়া যত অবতার আদি কেহ
                  পুণ্যে দিলেন আত্মা ও প্রাণ, পাপেরে দিলেন দেহ।
বন্ধু, কহিনি মিছে,
                  ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব হ’তে ধ’রে ক্রমে নেমে এস নীচে-
                  মানুষের কথা ছেড়ে দাও, যত ধ্যানী মুনি ঋষি যোগী
                  আত্মা তাঁদের ত্যাগী তপস্বী, দেহ তাঁহাদের ভোগী!
এ-দুনিয়া পাপশালা,
                  ধর্ম-গাধার পৃষ্ঠে এখানে শূণ্য-ছালা!

হেথা সবে সম পাপী,
                  আপন পাপের বাট্‌খারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!
                  জবাবদিহির কেন এত ঘটা যদি দেবতাই হও,
                  টুপি প’রে টিকি রেখে সদা বল যেন তুমি পাপী নও।
                  পাপী নও যদি কেন এ ভড়ং, ট্রেডমার্কার ধুম?
                  পুলিশী পোশাক পরিয়া হ’য়েছ পাপের আসামী গুম।

বন্ধু, একটা মজার গল্প শোনো,
                 একদা অপাপ ফেরেশতা সব স্বর্গ-সভায় কোনো
                 এই আলোচনা করিতে আছিল বিধির নিয়মে দুষি,’
                 দিন রাত নাই এত পূজা করি, এত ক’রে তাঁরে তুষি,
                 তবু তিনি যেন খুশি নন্‌-তাঁর যত স্নেহ দয়া ঝরে
                 পাপ-আসক্ত কাদা ও মাটির মানুষ জাতির’ পরে!
                 শুনিলেন সব অন্তর্যামী, হাসিয়া সবারে ক’ন,-
                 মলিন ধুলার সন-ান ওরা বড় দুর্বল মন,
                 ফুলে ফুলে সেথা ভুলের বেদনা-নয়নে , অধরে শাপ,
                 চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ!
                সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রেনীতে চন্দ্রহার,
                চরণে লাক্ষা, ঠোটে তাম্বুল, দেখে ম’রে আছে মার!
                প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান,
                বুকে বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।

                দেবদুত সব বলে, ‘প্রভু, মোরা দেখিব কেমন ধরা,
                কেমনে সেখানে ফুল ফোটে যার শিয়রে মৃত্যু-জরা!’
                কহিলেন বিভু-‘তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ যে দুইজন
                যাক্‌ পৃথিবীতে, দেখুক কি ঘোর ধরণীর প্রলোভন!’
                ‘হারুত’ ‘মারুত’ ফেরেশতাদের গৌরব রবি-শশী
                ধরার ধুলার অংশী হইল মানবের গৃহে পশি’।
                কায়ায় কায়ায় মায়া বুলে হেথা ছায়ায় ছায়ায় ফাঁদ,
                কমল-দীঘিতে সাতশ’ হয়েছে এই আকাশের চাঁদ!
                শব্দ গন্ধ বর্ণ হেথায় পেতেছে অরূপ-ফাঁসী,
               ঘাটে ঘাটে হেথা ঘট-ভরা হাসি, মাঠে মাঠে কাঁদে বাঁশী!
               দুদিনে আতশী ফেরেশতা প্রাণ- ভিজিল মাটির রসে,
               শফরী-চোখের চটুল চাতুরী বুকে দাগ কেটে বসে।
               ঘাঘরী ঝলকি’ গাগরী ছলকি’ নাগরী ‘জোহরা’ যায়-
               স্বর্গের দূত মজিল সে-রূপে,  বিকাইল রাঙা পা’য়!
               অধর-আনার-রসে ডুবে গেল দোজখের নার-ভীতি,
               মাটির সোরাহী মস-ানা হ’ল আঙ্গুরী খুনে তিতি’!
               কোথা ভেসে গেল-সংযম-বাঁধ, বারণের বেড়া টুটে,
               প্রাণ ভ’রে পিয়ে মাটির মদিরা ওষ্ঠ-পুষ্প-পুটে।
               বেহেশ্‌তে সব ফেরেশ্‌তাদের বিধাতা কহেন হাসি’-
              ‘হার”ত মার”তে কি ক’রেছে দেখ ধরণী সর্বনাশী!’
               নয়না এখানে যাদু জানে সখা এক আঁখি-ইশারায়
               লক্ষ যুগের মহা-তপস্যা কোথায় উবিয়া যায়।
সুন্দরী বসুমতী
              চিরযৌবনা, দেবতা ইহার শিব নয়-কাম রতি!


বারাঙ্গনা কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


বারাঙ্গনা
কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।
না-ই হ’লে সতী, তবু তো তোমরা মাতা-ভগিনীরই জাতি;
তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, তারা আমাদের জ্ঞাতি;
আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে,
তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে।-
স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী-পুত্র হ’ল মহাবীর দ্রোণ,
কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন.
কানীন-পুত্র কর্ণ হইল দান-বীর মহারথী
স্বর্গ হইতে পতিতা গঙ্গা শিবেরে পেলেন পতি,
শান-নু রাজা নিবেদিল প্রেম পুনঃ সেই গঙ্গায়-
তাঁদেরি পুত্র অমর ভীষ্ম, কৃষ্ণ প্রণমে যায়!
মুনি হ’ল শুনি সত্যকাম সে জারজ জবালা-শিশু,
বিস্ময়কর জন্ম যাঁহার-মহাপ্রেমিক সে যিশু!- 
কেহ নহে হেথা পাপ-পঙ্কিল, কেহ সে ঘৃণ্য নহে,
ফুটিছে অযুত বিমল কমল কামনা-কালীয়-দহে!
শোনো মানুষের বাণী,
জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক’ কোনো গ্লানি!
পাপ করিয়াছি বলিয়া কি নাই পুণ্যেরও অধিকার?
শত পাপ করি’ হয়নি ক্ষুন্ন দেবত্ব দেবতার।
অহল্যা যদি মুক্তি লভে, মা, মেরী হ’তে পারে দেবী,
তোমরাও কেন হবে না পূজ্যা বিমল সত্য সেবি’?
তব সন্তানে জারজ বলিয়া কোন্‌ গোঁড়া পাড়ে গালি,
তাহাদের আমি এই দু’টো কথা জিজ্ঞাসা করি খালি-
দেবতা গো জিজ্ঞাসি-
দেড় শত কোটি সন্তান এই বিশ্বের অধিবাসী-
কয়জন পিতা-মাতা ইহাদের হ’য়ে নিষ্কাম ব্রতী
পুত্রকন্যা কামনা করিল? কয়জন সৎ-সতী?
ক’জন করিল তপস্যা ভাই সন্তান-লাভ তরে?
কার পাপে কোটি দুধের বা”চা আঁতুড়ে জন্মে’ মরে?
সেরেফ্‌ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নরনারী যত,
সেই কামানার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!
শুন ধর্মের চাঁই-
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ-পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!


সাম্যবাদী কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম


সাম্যবাদী

কাজী নজরুল ইসলাম.....সাম্যবাদী


গাহি সাম্যের গান-
             যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
             যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
             কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
             কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
             পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
             কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
             জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, য্ত সখ-
             কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
            দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
            তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
            সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
           তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
           তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
          কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
          হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

বন্ধু, বলিনি ঝুট,
         এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
         এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
         বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
         মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
         এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
         এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
         এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
         এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
         ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
         এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
         এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
         এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।