Showing posts with label কষ্টের কবিতা. Show all posts
Showing posts with label কষ্টের কবিতা. Show all posts

প্রিয় মুনা, বাকের ভাই চিঠি – ইমরুল কায়েস


প্রিয় মুনা, বাকের ভাই
ইমরুল কায়েস

প্রিয় মুনা,

কেমন আছ? আমিও ভালো আছি ইহকালে নামাজ- রোজা তেমন রাখি নাই। রমজান মাসেও লুকায়া লুকায়া চা-বিড়ি খাইছি। সুযোগ পাইলেই এরে ওরে হাল্কা মালিশ কইরা দিছি। কিন্তু আমি মরার পর তুমি নাকি দুই হাত তুইলা মরা কান্না কান্দো? যদিও এক্সেস ক্রাইং ভেরি ব্যাডা কিন্তু তোমার দোয়া বড় সাংঘাতিক। ইহকালে টর্চার কইরা আসলেও পরকালে কেউ আমারে টর্চার করতেছেনা। তুমি এতো কান্দো ক্যান মুনা? এবার একটা বিয়া করো, সংসার করো। তোমারে কইছিলাম না মাইরে ভাইটামিন আছে? মাইরে কোনো ভাইটামিন নাই মুনা। ভাইটামিন আছে প্রেমে, সংসারে।

ফাঁসি নিয়া আমার তেমন কোনো দুঃখ নাই। অন্য কাওরে খুন না করলেও, তোমার মন রে আমি খুন করছি। মাইন্ড মার্ডার বিগ মার্ডার। আগে বুঝিনাই মুনা। তোমারে স্নেহ কইরা একটা আবদার করি। এই দুনিয়া বড় উত্তম জায়গা। বাকেরের চিন্তা করার মত ফালতু কাজ এইখানে মানায় না। যহন ছিলাম তখন ছিলাম। এহন তো নাই!! না থাকা জিনিস আর কতদিন সাজায়া রাখবা মুনা? তুইলা যাওয়ার ফার্স্ট স্টেপ হইল পারডন করা, মেয়ে লোক সব পারে, কিন্তু সহজে পারডন করতে পারেনা। আমারে তুমি পারডন কইরো মুনা। 

'হাওয়া মে উড়তা যায়ে' গানটা গাইয়া, একটা লাল দোপাট্টার মতন আমারে তুমি উড়ায়া দিও মুনা।


আমি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলছি কবিতা – ফুয়াদ স্বনম


আমি, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলছি
ফুয়াদ স্বনম

আমার বেশ মনে আছে, 
বাবা খুব ভোরে বেড়ুতেন আর ফিরতেন 
সবার ঘুমাবার পর। 

না প্রতিদিনই নয়, 
এই ধরুন, মাসের দশ থেকে
একুশ-বাইশ তারিখ পর্যন্ত।

বাড়িওয়ালার সামনে পড়াটা এড়াতেই 
এই ভোর পাঁচটা থেকে
বারোটা পযর্ন্ত অফিস।

বাবা বেশ রাগী ছিলেন,
আমরা বাবাকে ভয়ে কিছু প্রশ্ন করতে 
পারতাম না। পারলে, নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতাম,

"বাবা, তুমি রোজ অফিসের আগে, ছুটির পরে
সংসদ ভবনের পামট্রিগুলোর নীচে অন্ধকার
স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তায় বসে মাথা হেঁট করে কি ভাবো?

কে তোমায় সকালের নাস্তা বানিয়ে দেয়? 
লাঞ্চ করো কি কখনো?"

বাড়ি ভাড়া দেবার তারিখ উত্তীর্ণ হলেই, 
আমরা দু'ভাই গিয়ে দাঁড়াতাম
বাড়িওয়ালার সামনে করুণ মুখ করে, 
উনি গলে যেতেন।

এই হঠাৎ করুণ মুখ করার ব্যাপারটা
আমরা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছিলাম। 

মোটরবাইক পাশ কেটে বের হলেই
আমি হা করে চেয়ে থাকতাম।

একদিন বাবা বলেছিলেন,
"শুনো আব্বা, নিম্ন মধ্যবিত্তদের স্বপ্ন দেখবারও একটা 
লিমিট থাকে রে বোকা।"

জবাবে বাবা কে সেদিন চমকে দিয়ে বলেছিলাম,
"বাবা, জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলির অপূরণের
আক্ষেপ থেকে জন্ম নেয়া সুপ্ত বাসনাগুলি

যদি হঠাৎই ঘুম ভেঙে লাফ দিয়ে জেগে উঠে
হাত ধরাধরি করে হাঁটতে চায়?
সেও কি নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে অন্যায়ের সামিল হবে? 
নাকি সে বিত্তশালী হয়ে উঠবার ধৃষ্টতা?"

বলেই ভাবলাম, কি যে সব ভুলভাল
বকে ফেললাম বাবার সামনে? 
বেশী বলে ফেললাম না তো?

আমি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, 
শিক্ষা, সততা আর আদর্শই যাদের একমাত্র সম্বল, 
তাদের অন্তত বাবার মুখের ওপর
এমন বাগ্মিতা মানায় না।

গলির মুখে তিন রাস্তার মোড়ে
কার্তিক বাবুর মুদির দোকান।
তোমাকে ভয়ে কোনদিন বলিনি বাবা,

ভীষণ হাস্যোজ্জ্বল লোকটির মুখ, আষাঢ়ের
আকাশের মতো গোমড়া হয়ে যেতো
আমাদের বাকির স্লিপ ধরা হাতগুলো দেখলেই। 
একটা লজেন্সও কোনদিনও চাইতে পারিনি
বাকির খাতার কারণে।

বাকিতে মৌলিক চাহিদা মেটাতে মেটাতে 
শৈশব যে কোথায় ছুটে পালিয়েছিল, 
তা টের পেতে পেতে,
তখন আমিও আরেক বাবা হয়ে উঠছি।

চাল-ময়দার ঠোঙাগুলোকে কেটে
সেলাই করে খাতা বানাতাম, 
বছর শেষে আবার তাদের বিক্রি করে 
নতুন ক্লাসের সেকেন্ডহ্যান্ড বই কেনা।
নতুন বই কেনার কথা তো
কস্মিনকালেও ভাবতে পারিনি।

আমিষবিহীন পেঁপে ভাজি, আলুর ঝোল, 
বেগুন ভর্তা খেয়ে খেয়ে কতো 
দিন-রাত পার করেছি,
অন্য কিছুর চড়া আঁচে আমাদের 
বাজারের ব্যাগ জ্বলে যেত সেসময়।
অন্য কিছুর সামর্থ্য ছিলো না বলে।
ঈদে পরবে কদাচিৎ জুটেছে ফার্মের মুরগী।

আমাদের পিঠাপিঠি দু-ভাইয়ের জন্য 
একটিই শখের জিন্সপ্যান্ট কিনতে পেরেছিলাম 
তিনশত টাকা খরচা করে। 
তাও, একমাসের একটি টিউশুনির বেতন দিয়ে। 
মা সেটা আলমারিতে তুলে তুলে রাখতেন। 
যদি কোথাও দাওয়াত পড়ত, 
আমরা ভাগ করে নিতাম কে গায়ে হলুদে
যাবে সেটা পরে, আর বরযাত্রী কে হবে? 
এমন কোনো অনুষ্ঠান ছিলো না যে, 
আমরা দু'ভাই একসাথে গিয়েছি।
উপহার কেনার সামর্থ্য কোনদিনই আমাদের ছিলো না।
তাই, আমরা শুধু বরযাত্রী বা গায়ে হলুদেই যেতাম।

আমি একজন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
যাদের, কোনো চাহিদা থাকতে নেই।
আমাদের মা তবু খুব সুখী ছিলেন, 
কারণ ক্ষুধা লাগলেও, আমরা ভাতের মাড়
লবণ ছিটিয়ে খেতে পারতাম।
তখনও, মাছের কাঁটা বেছে খেতে শিখিনি। 
মা-ও সেকথা জানতেন,
দুষতেন দারিদ্রতাকে। 
আমি দিব্যি পটলের তরকারি দিয়ে
আয়েশ করে খেয়ে ওঠার ভান করাটা
শিখে নিয়েছিলাম।
স্কুলের টিফিনের জন্য
জেদ করেছি কিনা 
ঢের সন্দেহ আছে!
স্কুলের মাইনে দেবার সাত তারিখ পার হলেই 
ঝন্টু স্যার দাঁড় করিয়ে রাখতেন 
এক পিরিয়ড প্রতিদিন, 
জানলে বাবা যদি কষ্ট পায়! 
তাই বলা হয়নি সেকথা কোনদিনই। 
প্রায়ই হাঁটু ছিলে দগদগে ক্ষত নিয়ে
ফিরতাম ফুটবল খেলে।
গভীর রাতে আমরা ঘুমিয়ে পড়লে, বাবা এসে
কেরোসিন লাগিয়ে দিতেন আন্টিসেপটিক হিসেবে। 
ঝরঝর করে পানি পড়তো
তখন তার চোখ বেয়ে। 
কেন বাবা! কেন ফেলতে? 
আমার হাঁটুর ক্ষত, এই যে রক্তাক্ত চামড়া ছেঁড়া,
কেন যে তার চোখের পুকুরটাকে
আন্দোলিত করে যেত, সে সময় বুঝতে পারিনি।

অন্যদের দেয়া সেকেন্ড হ্যান্ড জামাতেই
নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখেছিলাম। 
তবে, আমাদের মাঝে ছিলো
পদ্ম পুকুরের মতো ভীষণ লজ্জা। 
কলেজে, ক্যাম্পাসে বা আত্মীয় স্বজনদের কাছে
আমাদের অবস্থান ছিলো সুদৃঢ় ও মর্যদা সম্পন্ন। 
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিলো না
আমাদের ভেতরের দৈন্যদশা।
কারণ, শিশুবেলা থেকেই
আমাদের দুটো শিক্ষা দেয়া হয়-
এক, আমরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। 
আর দুই, আমরা সম্ভ্রান্ত পরিবারকে ধারণ করি।
আমাদের বুক, পেট, তল পেট, উদর,
বৃহদান্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র সব ক্ষুধার তাড়নায়
ফেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও, 
আমাদের মুখে সবসময়
চাঁদের হাসি লেপ্টে থাকবে।
আমাদের মুখে সবসময়ই
চাঁদের হাসি লেপ্টে থাকতো।। 


বসন্ত নয় অবহেলা কবিতা – দর্পণ কবীর


বসন্ত নয় অবহেলা
দর্পণ কবীর


বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিলো অবহেলা
ভেবেছিলাম, অনেকগুলো বর্ষা শেষে শরতের উষ্ণতা মিশে এলো বুঝি বসন্ত!
দরজা খুলে দেখি আমাকে ভালোবেসে এসেছে অবহেলা
মধ্য দুপুরের তির্যক রোদের মতো
অনেকটা নির্লজ্জভাবে আমাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা
আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখেছিলাম
আমার দীনদশায় কারো করুণা বা আর্তিব পেখম ছড়িয়ে আছে কি না
ছিলো না
বৃষ্টিহীন জনপদে খড়খড়ে রোদ যেমন দস্যুর মতো অদমনীয়
তেমনি অবহেলাও আমাকে আগলে রেখেছিলো নির্মোহ নিঃসংকোচিত

আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভোঁ-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম
তখন দেখি আমার সামনে কলহাস্যে দাঁড়িয়েছে উপেক্ষা
উপেক্ষার সঙ্গেও একবার কানামাছি খেলে এগিয়ে গিয়েছিলাম তোমাদের কোলাহল মুখর আনন্দ সভায়
কি মিলেছিলো?
ঠোঁট উল্টানো ভৎসনা আর অভিশপ্ত অনূঢ়ার মতো এক তাল অবজ্ঞা
তাও সয়ে গিয়েছিলো একটা সময়
ধরেই নিয়েছিলাম আমার কোনো কালেই হবে না রাবেন্দ্রিক প্রেম
তোমাদের জয়গানে করতালিতে নতজানু থেকে
ছিলো আমার চাপা আক্ষেপ লজ্জা
বুঝে গিয়েছিলাম জীবনানন্দময় স্বপ্ন আমাকে ছোঁবে না
জয়নুলের রঙ নিয়ে কল্পনার বেসাতি
হারানো দিনের গানের ঐন্দ্রালিক তন্ময়তা
বা ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হলো, এ নিয়ে কৌতূহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনো

এত কিছু নেই জেনেও নজরুলের মতো বিদ্রোহী হবো, সেই অমিত শক্তিও আমার ছিলো না
মেনে নেয়ার বিনয়টুকু ছাড়া আসলে আমার কিছুই ছিলো না
শুধু ছিলো অবহেলা, উপেক্ষা আর অবজ্ঞা

হ্যাঁ, একবার তুমি বা তোমরা যেন দয়া করে বাঁকা চোখে 
তাকিয়েছিলে আমার দিকে
তাচ্ছিল্য নয়, একটু মায়াই যেন ছিলো
হতে পারে কাঁপা আবেগও মিশ্রিত ছিলো তোমার দৃষ্টিতে
ওইটুকুই আমার যা পাওয়া
আমি ঝড়ে যাওয়া পাতা, তুমি ছিলে আকস্মিক দমকা হাওয়া
তারপরও অবহেলার চাদর ছাড়িয়ে
উপেক্ষার দেয়াল ডিঙিয়ে
ও অবজ্ঞার লাল দাগ মুছে জীবনের কোনো সীমারেখা ভাঙতে পারিনি আমি
এ কথা জানে শুধু অন্তর্যামী

অনেক স্বপ্নপ্রবণ হয়ে একবার ভেবেছিলাম
এই অবহেলা তুষারপাতের মুখচ্ছবি, উপেক্ষা কাচের দেওয়াল, অবজ্ঞা কুচকুচে অন্ধকার
এর কিছুই থাকবে না একটি বসন্তের ফুঁৎকারে
একটি ঝলমলে পোশাক গায়ে চড়িয়ে হাতের মুঠোয় বসন্ত নিয়ে অন্তত একটি সন্ধ্যাকে উজ্জ্বল করে নেবো
এমন ভাবাবেগও ছিলো আকাশের কার্নিশে লেপ্টে থাকা পেঁজা মেঘের মতো
ঐ মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে নামেনি
তোমার বা তোমাদের নাগরিক কোলাহল কখনো থামেনি

অর্ধেক জীবন ফেলে এসে দেখি অনেক কিছু বদলে গেছে সেকি!
কোথায় হারালো কৈশোরের দিনলিপি বিপন্ন করা অবহেলা
স্বপ্নকে অবদমনের স্বরলিপিতে আটকে ফেলা উপেক্ষা
আর তারুণ্যকে ম্রিয়মাণ করে রাখার অবজ্ঞা
ওরা আমাকে চোখ রাঙাতে পারে না ঠিক, তবে এখনো পোড় খাওয়া দিন বড্ড রঙিন

আমি আজ সমুদ্র জলে হাত রেখে বলে দিতে পারি
কোন ঢেউয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তোমাদের গোপন অশ্রুকণা
আকাশ পানে তাকিয়ে বুঝতে পারি কার দীর্ঘশ্বাসে ঝড়ে পড়ছে নক্ষত্র
এমনকি তুমি যে সম্রাজ্ঞীর বেশের আড়ালের মিহিন কষ্ট চেপে হয়েছো লাবণ্যময় পাষাণ, পাথর
এটাও দেখতে পাই অন্তরদৃষ্টি দিয়ে

আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেতো কবিতার রূপ
সেই অবহেলা হতো বসন্ত স্বরুপ।


ইতি অপু কবিতা – পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু কবিতা
পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু, কোনো সাধারণ কবিতা নয়। এই চিঠি কবিতা বা পত্র কবিতাটি পাঠক সমাজে সাড়া জাগানো একটি জনপ্রিয় কবিতা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী অপূর্ব সৃষ্টি অপুর মর্ম বেদনার ছবি, পৃথ্বীরাজ চৌধুরী তাঁর সুনিপুণ কলমের ছোঁয়ায় আমাদের উপহার দিয়েছেন।

পুলু, কেমন আছিস, ভালো?
বড় তারাতারি নিভে যাচ্ছে এই কলমের আলো।
মাঘ কুয়াশার চেয়েও ঝাপসা হচ্ছে অক্ষর,
কোথা দিয়ে কেটে গেলোরে এতগুলো বছর?
যেন রেলের চাকায় বেঁধেছিলো কেউ দিনঘড়িটার কাটা,
অনেক কষ্টে জোগার করেছি তোর ঠিকানাটা!
এই দেখ! পরিচয়টাই দেয়া হয়নি কথায় কথায়!
চিনতে পারছিস? রোল ফরটি-সিক্স, অপূর্ব কুমার রায়।
তোর সাথে শেষ দেখা, নাগপুর কোলীয়ারী।
তারপর জানিস? খুলনা গিয়েছিলাম অপর্ণাদের বাড়ি।
খুলনাতো এখন বাংলাদেশ।ওখানে কে থাকে,
আমি ছাড়া তোকে এখনো কেউ পুলু বলে ডাকে?
কাজল এখন বিয়ে করেছে, চাকরি করছে কোলকাতায়।
সেসব যাক, এবার আসি যেজন্য চিঠি সেই কথায়।
জানিনা, কোত্থেকে শুরু করব, ঠিক কোন দুঃখ ভোগ?
তোর সাথে প্রায় ত্রিশ বছর পরেতো যোগাযোগ!
তুই বলবি আমার দোষ, রাখিসনি কেন যোগাযোগ?
যোগ আর যোগ রাখব কোথায়, আয়ূষ্কালে শুধুই বিয়োগ!
ছ’য়ে দিদি, দ’শে বাবা, সতেরতে গেলেন মা!
আর বাইশ বছর ফাগুন মাস, যেদিন গেলো অপর্ণা!
আর শুধু ওরাই নাকি? কয়লার ট্রেন, দুঃখ পুকুর,
গরুর গাড়িটাও ছেড়ে দিয়েছে কাঁশফুলে ঢাকা নিশ্চিন্তপুর!
বাবার উপর টান বলতে, খুব রোগা আর পলকা দড়ি।
রোগা দড়ি হেটে নামতো কাঁশিঘাটের চৌষট্টি সিঁড়ি।
বাবার আর লেখা হলোনা গ্রাম জাগানো মহৎ পালা!
দীর্ঘশ্বাসে চাপা সংলাপ, শুধু শুনতে পেলো গণেশ মহোলা।
এখন মাঝেমাঝে স্বপ্নে আসেন,
হরিহর পালা গিতিকার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন,
“ঐ যায় শবযাত্রা আমার!
হরিধ্বণি দাও হে সবে, দুহাতে ওড়াও বিণ্ণী খৈ,
বাঁশের মাচায় শুয়ে চলেছেন, না লিখতে পারা আমার বই।”
ফিরে এলাম দেশের বাড়ি, ঘুরলো আবার রেলের চাকা।
সম্বল বলতে গলার পৈতে, মা-র জমানো ছত্রিশ টাকা।
পল্লীবাড়ি একি আছে, ধোয়াটে মাঠ, কাঁশের বন।
নতুন একটা শব্দ শিখলাম, স্যারের কাছে, “এম্বিশন।”
লিভিংস্টোন পড়ছি যখন কবে যাবো আফ্রিকায়?
দেবতাকে অভুক্ত রেখে, এই পূরুতের ছেলে জলপানি পায়!
মাকে ছেড়ে, পল্লী ছেড়ে, পূরুতের ছেলে দূর পালালো,
দুর বলতে কোলকাতা, তেতলা বাড়ি, ইলেক্ট্রিক আলো।
অখিল বাবুর রোয়্যাল প্রেসে সারারাত জেগে কাজ করতাম।
নতুন বইএর মোলাট দেখলেই ইচ্ছে হত, লেখি বাবার নাম।
একদিন একটা চিঠি এলো, মায়ের নাম লেখা তাতে,
মা লিখছেন ভাঙ্গা ছন্দে, মা লিখছেন কবিতাতে।
“অপু, আমার মাথার উপর উড়ছে জানিস, রাতের আকাশ।
কদিন পরেই গণেশ পূজো, তোরা কলেজে ছুটি কি পাশ?
চারা গাছটা পুতে গেছিলি, কদিন হলো দেইনি জল,
গণেশ পুজোয় না এলেও তুই অঘ্র্যাণ মাসে আসবি বল?
কদিন ধরেই জ্বরটা আসছে, বলা হয়নি কথায় কথায়,
তোর তেতলা জানালা থেকে গ্রামের রাতটা দেখা যায়!
অপু, আমার মাথার উপর আকাশ ভাঙছে, উহ্! কি কালো!
পাঠাবিরে জোঁনাকি ঘুম, পাঠাবিরে ইলেক্ট্রিক আলো?”
সেই থেকে-তো শ্বশানের কাঠ, গারহস্তে আমার হলো অক্ষয়।
যারা চলে যায়, কে বল্লো শুধু তাদেরি শব দাহ হয়?
প্রথমে প্রথমে পুড়ে যেতাম, নতুন বিয়োগ চড়া আঁচে!
দেখ, সন্তাপ কথাটাতেও তাপ কথাটা লুকিয়ে আছে!
একদিন তখন হবিষ্যি চলছে, এটো ছিটিয়ে ডাকছি কাক।
হঠাৎ মনে হলো, একি করছি, আমি-না হিমাদ্রী নন্দন মৈণাক!!!
সেই থেকেতো পালানো শুরু, থাকতে দেবে বৃক্ষবন?
তোমার সবুজ পাতার ভিরে রাখবে আমায়, রাখবে গোপন?
গাছ দেখলেই ভয় করেযে, চিতা কাঠ বড্ড ভয়!
শরীর জুরালো হঠাৎ করে, হঠাৎ শরীরে সূর্যোদয়!
মা, অপর্ণা মুছে গেলো এদের মুখের টুকিটাকি।
বলেই ফেল্লো অপর্ণার ছবি, হা করে দেখছো! আমি নতুন নাকি?
পুলু, একটা সত্যি কথা, এবার তবে বলি তোকে,
আমি মরে যাচ্ছি যন্ত্রণাতে, আমি মরে যাচ্ছি বিচ্ছেদ শোকে!
দিদি, বাবা, মা, অপর্ণা এরা না। কার কথা বলছি জানিস?
একটু ভালো করে মনে করে দেখ, তুইও ওদের খুব কাছ থেকে চিনিস।
মনে পরে সেই খুলনা যাওয়া পদ্মা নদী, ছবির সেট?
হঠাৎ তুই ডাকলি আমায়, হাতটা দে-না এডিয়েট।
হে, ঐ গল্পের পাতা, আমার অপ্রকাশিত প্রথম বই।
গল্পের শুরুটা তুইও জানিস, গল্পের শেষটা গেলো কই?!
সেদিন গল্পে ঝিঁঝি ডাকছিলো, মাথার উপর বৃক্ষছাতা।
সূর্যোদয়কে সামনে পেয়ে, উড়িয়েছিলাম গল্পের পাতা।
ওরা কি সব ওখানেই আছে? চালে ডালে পাতা সংসার।
সংসার না বৈরাগ্য? কি জীবণ হয় ছেড়া পাতার?
এসব আমার জানা দরকার। এসব আমার জানা প্রয়োজন।
ব্যার্থ লেখক অপূর্ব রায়ের ওরাই হলো আত্মা স্বজন।
ওরা আমার সাথে বাসে ওঠে, আমার সাথে অফিস করে।
শুধু পেছন ফিরে দেখতে গেলেই, ওরা বৃক্ষ বনে লুকিয়ে পরে!
আর যখন ঘুমিয়ে পরি, ওরা স্বপ্নে আসে অহরহ।
আসলে শুধু ছেড়ে এসেছিতো, কখনো ওদের করিনি দাহ।
এখন আমার মায়ের বয়স, সন্ধে হলেই আসে জ্বর।
বাবা বসে জল শেক দেয়। বলে অপু, লেখাটা শেষ কর।
পশ্চিমের টিকেট কেটেছি ভোর হলেই রওনা হব।
খেলনা, মুখোশ, কলের গাড়ি; ওদের জন্য কি কি নেব?
গল্পটা যদি জিজ্ঞেস করে, এতদিন পর তুমি এদিকে?
আমি তাহলে সেদিনের সেই অবাক করা সূর্য ডেকে,
সব অধিকার ছেড়ে দেব।
লেখক, পিতা সব সবলেখক শর্ত বিনীময়ে ফিরে পাবে ওরা শৈশব।
গোপন বলতে নিজের কাছে একটা নাম রাখবো শুধু, একটা নাম রাখবো শুধু,
পিতা নয় লেখক নয় স্বার্থ নয় শুধু বন্ধু।
চল্লাম পুলু, জানাবো তোকে কি দেখলাম ছেড়া পাতায়।
ভালো থাকিস বইটা ছাপিস।

– ইতি অপু।


আমার কোনো বন্ধু নেই কবিতা – সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই
সাদাত হোসাইন


আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।
সত্যি বলতে আমার কোনো বন্ধু নেই।
বন্ধু বলতে জেনেছি যাদের, তারা কেবল পথ চলতে সঙ্গী ছিলো।
দূরের পথে ট্রেনে যেমন থাকে, পাশের সিটে। গল্প হয়, দু পেয়ালা লেবু চায়ের দাম মেটাতে 'আমি দিচ্ছি, আমি দিচ্ছি' যুদ্ধ হয়। সিগারেটের বাড়িয়ে দেয়া টুকরো ফুঁকে, 'এই যে নিন ফোন নম্বর, এদিকটাতে আবার এলে ফোন করবেন', বলা শেষে অচেনা এক স্টেশনে উধাও হয়।
এই যে আমি পথ হাঁটছি, রোজ ঘাটছি বুকের ভেতর কষ্ট, ক্লেদ,
এই যে আমি ক্লান্ত ভীষণ, বুকের ভেতর জমছে কেবল দুঃখের মেদ,
তবুও আমার নিজের কোনো বৃক্ষ নেই।
প্রবল দহন দিনের শেষে, যার ছায়াতে জিরোবো ভেবে ফিরে আসার ইচ্ছে হয়,
তেমন একটা ছায়ার মতন, আগলে রাখা মায়ার মতন আমার কোনো বন্ধু নেই।

একলা দুপুর উপুড় হলে বিষাদ ঢালা নদীর মতন,
একলা মানুষ ফানুশ হলে, নিরুদ্দেশ এক বোধির মতন,
হাতের মুঠোয় হাত রাখবার একটা কোনো মানুষ নেই।

আমার কোনো বন্ধু নেই।
আমি কেবল কোলাহলে ভিড়ের ভেতর হারিয়ে যাই,
ভুল মানুষে, যত্নে জমা ফুলগুলো সব বাড়িয়ে যাই,
হাওয়ায় ভাসা দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভেবে,
নির্বাসনের একটা জীবন মাড়িয়ে যাই।

আমার কোনো বন্ধু নেই,
যার কাছে আমি নিজেকে ভেঙেচুরে, খুচরো পয়সার মতো জমা রাখতে পারি।
যে আমাকে যত্ন করে সঞ্চয় করবে, প্রয়োজনে ফিরিয়ে দেবে একটা একটা আধুলি।