Showing posts with label Chithi. Show all posts
Showing posts with label Chithi. Show all posts

প্রিয় মুনা, বাকের ভাই চিঠি – ইমরুল কায়েস


প্রিয় মুনা, বাকের ভাই
ইমরুল কায়েস

প্রিয় মুনা,

কেমন আছ? আমিও ভালো আছি ইহকালে নামাজ- রোজা তেমন রাখি নাই। রমজান মাসেও লুকায়া লুকায়া চা-বিড়ি খাইছি। সুযোগ পাইলেই এরে ওরে হাল্কা মালিশ কইরা দিছি। কিন্তু আমি মরার পর তুমি নাকি দুই হাত তুইলা মরা কান্না কান্দো? যদিও এক্সেস ক্রাইং ভেরি ব্যাডা কিন্তু তোমার দোয়া বড় সাংঘাতিক। ইহকালে টর্চার কইরা আসলেও পরকালে কেউ আমারে টর্চার করতেছেনা। তুমি এতো কান্দো ক্যান মুনা? এবার একটা বিয়া করো, সংসার করো। তোমারে কইছিলাম না মাইরে ভাইটামিন আছে? মাইরে কোনো ভাইটামিন নাই মুনা। ভাইটামিন আছে প্রেমে, সংসারে।

ফাঁসি নিয়া আমার তেমন কোনো দুঃখ নাই। অন্য কাওরে খুন না করলেও, তোমার মন রে আমি খুন করছি। মাইন্ড মার্ডার বিগ মার্ডার। আগে বুঝিনাই মুনা। তোমারে স্নেহ কইরা একটা আবদার করি। এই দুনিয়া বড় উত্তম জায়গা। বাকেরের চিন্তা করার মত ফালতু কাজ এইখানে মানায় না। যহন ছিলাম তখন ছিলাম। এহন তো নাই!! না থাকা জিনিস আর কতদিন সাজায়া রাখবা মুনা? তুইলা যাওয়ার ফার্স্ট স্টেপ হইল পারডন করা, মেয়ে লোক সব পারে, কিন্তু সহজে পারডন করতে পারেনা। আমারে তুমি পারডন কইরো মুনা। 

'হাওয়া মে উড়তা যায়ে' গানটা গাইয়া, একটা লাল দোপাট্টার মতন আমারে তুমি উড়ায়া দিও মুনা।


ইতি অপু কবিতা – পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু কবিতা
পৃথ্বীরাজ চৌধুরী


ইতি অপু, কোনো সাধারণ কবিতা নয়। এই চিঠি কবিতা বা পত্র কবিতাটি পাঠক সমাজে সাড়া জাগানো একটি জনপ্রিয় কবিতা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী অপূর্ব সৃষ্টি অপুর মর্ম বেদনার ছবি, পৃথ্বীরাজ চৌধুরী তাঁর সুনিপুণ কলমের ছোঁয়ায় আমাদের উপহার দিয়েছেন।

পুলু, কেমন আছিস, ভালো?
বড় তারাতারি নিভে যাচ্ছে এই কলমের আলো।
মাঘ কুয়াশার চেয়েও ঝাপসা হচ্ছে অক্ষর,
কোথা দিয়ে কেটে গেলোরে এতগুলো বছর?
যেন রেলের চাকায় বেঁধেছিলো কেউ দিনঘড়িটার কাটা,
অনেক কষ্টে জোগার করেছি তোর ঠিকানাটা!
এই দেখ! পরিচয়টাই দেয়া হয়নি কথায় কথায়!
চিনতে পারছিস? রোল ফরটি-সিক্স, অপূর্ব কুমার রায়।
তোর সাথে শেষ দেখা, নাগপুর কোলীয়ারী।
তারপর জানিস? খুলনা গিয়েছিলাম অপর্ণাদের বাড়ি।
খুলনাতো এখন বাংলাদেশ।ওখানে কে থাকে,
আমি ছাড়া তোকে এখনো কেউ পুলু বলে ডাকে?
কাজল এখন বিয়ে করেছে, চাকরি করছে কোলকাতায়।
সেসব যাক, এবার আসি যেজন্য চিঠি সেই কথায়।
জানিনা, কোত্থেকে শুরু করব, ঠিক কোন দুঃখ ভোগ?
তোর সাথে প্রায় ত্রিশ বছর পরেতো যোগাযোগ!
তুই বলবি আমার দোষ, রাখিসনি কেন যোগাযোগ?
যোগ আর যোগ রাখব কোথায়, আয়ূষ্কালে শুধুই বিয়োগ!
ছ’য়ে দিদি, দ’শে বাবা, সতেরতে গেলেন মা!
আর বাইশ বছর ফাগুন মাস, যেদিন গেলো অপর্ণা!
আর শুধু ওরাই নাকি? কয়লার ট্রেন, দুঃখ পুকুর,
গরুর গাড়িটাও ছেড়ে দিয়েছে কাঁশফুলে ঢাকা নিশ্চিন্তপুর!
বাবার উপর টান বলতে, খুব রোগা আর পলকা দড়ি।
রোগা দড়ি হেটে নামতো কাঁশিঘাটের চৌষট্টি সিঁড়ি।
বাবার আর লেখা হলোনা গ্রাম জাগানো মহৎ পালা!
দীর্ঘশ্বাসে চাপা সংলাপ, শুধু শুনতে পেলো গণেশ মহোলা।
এখন মাঝেমাঝে স্বপ্নে আসেন,
হরিহর পালা গিতিকার আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন,
“ঐ যায় শবযাত্রা আমার!
হরিধ্বণি দাও হে সবে, দুহাতে ওড়াও বিণ্ণী খৈ,
বাঁশের মাচায় শুয়ে চলেছেন, না লিখতে পারা আমার বই।”
ফিরে এলাম দেশের বাড়ি, ঘুরলো আবার রেলের চাকা।
সম্বল বলতে গলার পৈতে, মা-র জমানো ছত্রিশ টাকা।
পল্লীবাড়ি একি আছে, ধোয়াটে মাঠ, কাঁশের বন।
নতুন একটা শব্দ শিখলাম, স্যারের কাছে, “এম্বিশন।”
লিভিংস্টোন পড়ছি যখন কবে যাবো আফ্রিকায়?
দেবতাকে অভুক্ত রেখে, এই পূরুতের ছেলে জলপানি পায়!
মাকে ছেড়ে, পল্লী ছেড়ে, পূরুতের ছেলে দূর পালালো,
দুর বলতে কোলকাতা, তেতলা বাড়ি, ইলেক্ট্রিক আলো।
অখিল বাবুর রোয়্যাল প্রেসে সারারাত জেগে কাজ করতাম।
নতুন বইএর মোলাট দেখলেই ইচ্ছে হত, লেখি বাবার নাম।
একদিন একটা চিঠি এলো, মায়ের নাম লেখা তাতে,
মা লিখছেন ভাঙ্গা ছন্দে, মা লিখছেন কবিতাতে।
“অপু, আমার মাথার উপর উড়ছে জানিস, রাতের আকাশ।
কদিন পরেই গণেশ পূজো, তোরা কলেজে ছুটি কি পাশ?
চারা গাছটা পুতে গেছিলি, কদিন হলো দেইনি জল,
গণেশ পুজোয় না এলেও তুই অঘ্র্যাণ মাসে আসবি বল?
কদিন ধরেই জ্বরটা আসছে, বলা হয়নি কথায় কথায়,
তোর তেতলা জানালা থেকে গ্রামের রাতটা দেখা যায়!
অপু, আমার মাথার উপর আকাশ ভাঙছে, উহ্! কি কালো!
পাঠাবিরে জোঁনাকি ঘুম, পাঠাবিরে ইলেক্ট্রিক আলো?”
সেই থেকে-তো শ্বশানের কাঠ, গারহস্তে আমার হলো অক্ষয়।
যারা চলে যায়, কে বল্লো শুধু তাদেরি শব দাহ হয়?
প্রথমে প্রথমে পুড়ে যেতাম, নতুন বিয়োগ চড়া আঁচে!
দেখ, সন্তাপ কথাটাতেও তাপ কথাটা লুকিয়ে আছে!
একদিন তখন হবিষ্যি চলছে, এটো ছিটিয়ে ডাকছি কাক।
হঠাৎ মনে হলো, একি করছি, আমি-না হিমাদ্রী নন্দন মৈণাক!!!
সেই থেকেতো পালানো শুরু, থাকতে দেবে বৃক্ষবন?
তোমার সবুজ পাতার ভিরে রাখবে আমায়, রাখবে গোপন?
গাছ দেখলেই ভয় করেযে, চিতা কাঠ বড্ড ভয়!
শরীর জুরালো হঠাৎ করে, হঠাৎ শরীরে সূর্যোদয়!
মা, অপর্ণা মুছে গেলো এদের মুখের টুকিটাকি।
বলেই ফেল্লো অপর্ণার ছবি, হা করে দেখছো! আমি নতুন নাকি?
পুলু, একটা সত্যি কথা, এবার তবে বলি তোকে,
আমি মরে যাচ্ছি যন্ত্রণাতে, আমি মরে যাচ্ছি বিচ্ছেদ শোকে!
দিদি, বাবা, মা, অপর্ণা এরা না। কার কথা বলছি জানিস?
একটু ভালো করে মনে করে দেখ, তুইও ওদের খুব কাছ থেকে চিনিস।
মনে পরে সেই খুলনা যাওয়া পদ্মা নদী, ছবির সেট?
হঠাৎ তুই ডাকলি আমায়, হাতটা দে-না এডিয়েট।
হে, ঐ গল্পের পাতা, আমার অপ্রকাশিত প্রথম বই।
গল্পের শুরুটা তুইও জানিস, গল্পের শেষটা গেলো কই?!
সেদিন গল্পে ঝিঁঝি ডাকছিলো, মাথার উপর বৃক্ষছাতা।
সূর্যোদয়কে সামনে পেয়ে, উড়িয়েছিলাম গল্পের পাতা।
ওরা কি সব ওখানেই আছে? চালে ডালে পাতা সংসার।
সংসার না বৈরাগ্য? কি জীবণ হয় ছেড়া পাতার?
এসব আমার জানা দরকার। এসব আমার জানা প্রয়োজন।
ব্যার্থ লেখক অপূর্ব রায়ের ওরাই হলো আত্মা স্বজন।
ওরা আমার সাথে বাসে ওঠে, আমার সাথে অফিস করে।
শুধু পেছন ফিরে দেখতে গেলেই, ওরা বৃক্ষ বনে লুকিয়ে পরে!
আর যখন ঘুমিয়ে পরি, ওরা স্বপ্নে আসে অহরহ।
আসলে শুধু ছেড়ে এসেছিতো, কখনো ওদের করিনি দাহ।
এখন আমার মায়ের বয়স, সন্ধে হলেই আসে জ্বর।
বাবা বসে জল শেক দেয়। বলে অপু, লেখাটা শেষ কর।
পশ্চিমের টিকেট কেটেছি ভোর হলেই রওনা হব।
খেলনা, মুখোশ, কলের গাড়ি; ওদের জন্য কি কি নেব?
গল্পটা যদি জিজ্ঞেস করে, এতদিন পর তুমি এদিকে?
আমি তাহলে সেদিনের সেই অবাক করা সূর্য ডেকে,
সব অধিকার ছেড়ে দেব।
লেখক, পিতা সব সবলেখক শর্ত বিনীময়ে ফিরে পাবে ওরা শৈশব।
গোপন বলতে নিজের কাছে একটা নাম রাখবো শুধু, একটা নাম রাখবো শুধু,
পিতা নয় লেখক নয় স্বার্থ নয় শুধু বন্ধু।
চল্লাম পুলু, জানাবো তোকে কি দেখলাম ছেড়া পাতায়।
ভালো থাকিস বইটা ছাপিস।

– ইতি অপু।


বেকারের চিঠি – মণিভূষণ ভট্টাচার্য | Bekarer Chithi kobita


বেকারের চিঠি
মণিভূষণ ভট্টাচার্য 


আমার বয়স যে বছর একুশ পূর্ণ হলো –
ভোট দিলাম।
দ্বিতীয়বার যখন চটের পর্দা-ঢাকা খোপরিতে ঢুকে
প্রগতিশীল প্রতীক চিহ্নে ছাপ মারছি তখন আমি ছাব্বিশ।

ঊনত্রিশ বছর বয়সেও বিশ্বের নিঃস্বতম গণতন্ত্র রক্ষার জন্য
আমার প্রাণ আকুল হয়ে উঠেছিলো।
কিন্তু এ বছর ভোটের দিন সারাদুপুর তক্তপোষে শুয়ে
বেড়ার ফোকর দিয়ে পতাকা-ওড়ানো রিকসার যাতায়াত দেখেছি
কিন্তু ভোট দিতে যাই নি।
 
না, আমি ভোট বয়কট করিনি
ভোট আমাকে বয়কট করেছে।

কারণ আমার বয়স একত্রিশ।
তিরিশের পর সরকারি চাকরি পাওয়া যায় না।
যে সরকার আমাকে চাকরি দেবে না –
সেই সরকার গঠনের জন্য
গায়ে আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘোর –
এরকম আশা করা যায় না।
বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অবশ্য বয়স পাঁচ বছর শিথিলযোগ্য,
কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিশেষ কারণ

বিশেষভাবেই অনুপস্থিত।
অগত্যা সরকারি চাকরি পাবার একটাই উপায় আছে
সার্টিফিকেট জাল করে বয়স কমিয়ে ফেলা।
কিন্তু হে নন্দিত নেতৃবৃন্দ, যদিও আমার চোখের উপর
আপনাদের অনির্বচনীয় লীলাময় জীবন খোলা আছে
তবু জালিয়াৎ হতে পারবো না –
আমার বাবা সৎ ছিলেন।
 
এই গঞ্জের বাজারে, ন্যাড়া ছাতিমতলায়, কাঁচাপাকা চুলে,
পুরু কাচের চশমা চোখে যে বৃদ্ধটি কুঁজো হয়ে
মান্ধাতার আমলের টাইপরাইটারে
আমার এবং আমার মতো শত শত চাকরিপ্রার্থী এবং
ভোটদাতা অর্থাৎ আপনাদের পরমান্নদাতা যুবকের
হাজার হাজার দরখাস্ত টাইপ ক’রে দিতেন –
একদিন ভরদুপুরে তার বুকের বাঁদিকের লজঝড়ে টাইপমেশিনটা
বিগড়ে গেল।
সেই ফাঁকা জায়গায় আমি কলা নিয়ে বসে পড়লাম।
কার্বাইডে পাকানো চালানী মর্তমান কলার রঙ
যদিও বোম্বাই-অভিনেত্রীর চটককেও হার মানায়,
তবু খেতে অতিশয় অখাদ্য, ফলে আমাকে ডাবের সঙ্গে
ভাব জমাতে হোলো।
 
পা ফাক করে দাঁড়িয়ে ধুতি-পাঞ্জাবী শার্ট-প্যান্ট যখন
সরু নল দিয়ে চোঁ চোঁ করে সুমিষ্ট জল টেনে নিতো,
তাদের দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে আমি এই গঞ্জের
ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষের মর্মান্তিক মহিমাকে স্পর্শ করতাম।
ডাবের খোলাটি ছুঁড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে, ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে
দেখতাম, অধিকাংশ অমেরুদণ্ডী বুদ্ধিজীবীদের মতোই,
ভিতরে শাঁস আছে কিনা।
 
তারপর চিরুনী ব্লাউজ ধূপকাঠি তরমুজ চাল
হোসিয়ারী মাল এবং ধূর্ত নেতা পূর্তমন্ত্রী হবার জন্য
যত বড় স্বপ্ন দেখে ঠিক সেই আয়তনের মিষ্টি কুমড়ো
অর্থাৎ একের পর এক বহুমুখী বাণিজ্য বিস্তারে আমি
বিড়লাকেও ছাড়িয়ে গেলাম, কিন্তু বেড়ালের ভাগ্যে
শিকে ছিড়লো না। ফলে প্রায় বিনা চিকিৎসায়
মা মারা গেলেন।
 
আমাদের এখানে গত কুড়ি বছরে আধখানা হাসপাতাল
হয়েছে, বাকি আধখানা আর হবে না, কারণ প্রধান রাজনৈতিক
দলের নেতারা অধিকাংশই ডাক্তার এবং তাদের
নার্সিং হোম আছে।
 
রোজ ভোর চারটেয় উঠে আমি যখন বস্তির
গণতান্ত্রিক খাটা পায়খানায় লাইন দিতাম,
মা নিজের – হাতে – দেওয়া ঘুঁটে জ্বালিয়ে চা করে দিতেন।
সেই স্যাঁতসেতে অন্ধকারে ধোঁয়াটে আগুনের সামনে
বসে-থাকা মা- কে আমার ভারতবর্ষ বলে মনে হোতো।
দিদির মৃতদেহ দড়ি কেটে নামাবার পর থেকে
মা একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।
যার সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়েছিলো সে গরীব ছিলো এবং
ভালো ছিলো। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে মহানও করেনি বা
খ্রীষ্ট্রের সম্মানও দেয় নি – এক চোরাকারবারি
শ্রমিকনেতার আড়কাঠিতে পরিণত করেছিলো। সে সেই
নেতাকে মহিলা সরবরাহ করতো –
সেই নেতার সঙ্গে মন্ত্রীর যোগাযোগ ছিলো,
মন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের যোগ ছিলো,
কেন্দ্রের সঙ্গে পরিধির যোগ ছিলো,
পরিধির সঙ্গে ব্যাস এবং ব্যাসের সঙ্গে
ব্যাসার্ধের সংযোগ ছিলো এবং এইসব সূক্ষ্ম যোগাযোগগুলি
একসঙ্গে গিঁট লেগে একটা মোটা নাইলনের দড়ি হয়ে
দিদির গলায় ফাঁস লাগিয়েছিলো।
 
চাকরি আমার হতো।
জেলার সব ছাত্রদের মধ্যে আমি যদি মাতৃভাষায়
প্রথম না হয়ে আপনাদের পিতৃভাষা অর্থাৎ
ইংরেজিতে প্রথম হতাম, হয়তো আমার বরাত
খুলে যেতো। অথবা আমার বন্ধুরা –
যারা ঠিক ঠিক জায়গায় তেল সরবরাহে
আরব রাষ্ট্রগুলিকেও হার মানিয়েছে –
আমি যদি তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
নামতে পারতাম তাহলে আমার গলায়
বাদামের ঝুড়ির বদলে নেকটাই ঝুলতো।
 
গর্তে-ঢুকে-যাওয়া ফ্যাকাসে হলুদ রঙের দুটো চোখের
শূন্য দৃষ্টি এবং একটা অকেজো টাইপ মেশিন ছাড়া
বাবা আমার জন্য আর কিছু রেখে যেতে পারেন নি।
এ বছর জীবনের সর্বশেষ ভোটটি দিয়ে মা চলে গেলেন। ভারতবর্ষ পড়ে রইলো।
 
আমার আর কোনো দায় নেই।
যেহেতু আজকের দর্শন আগামীকালের সংস্কার মাত্র
এখন যদি আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাই।
বন্ধুরা বলবে, ‘পালিয়ে গেল’।
বিদেশি টাকায় পুষ্ট যে সব তথাকথিত
জনসেবা প্রতিষ্ঠান আছে – তাতে যদি
ভাতের জন্য ঢুকে পড়ি –
তারা বলবে, ‘ব্যাটা গুপ্তচর’।
যদি আত্মহত্যা করি –
তাহলে, ‘কাপুরুষ’।
আর যদি সোজাসুজি প্রতিবাদ করি –
তাহলে আপনারা, রাজনৈতিক নৈশ প্রহরীরা
কালো টাকার কুমিরদের অন্ধকার পাড়ায় গিয়ে
মাঝরাতে ‘নকশাল’ ‘নকশাল’ ব’লে
ঘেউ ঘেউ করে তাদের জাগিয়ে দেবেন
এমন কি অবস্থা তেমন তেমন বেগতিক দেখলে
আপনাদের সঙ্গে রাশিয়া আমেরিকাও যোগ দেবে।
 
এতদিন চাকরি খুঁজেছি। পাই নি।
এবার ভাবছি আমরাই আপনাদের চাকরি দেবো।
 
আমরা যারা বেকার আধাবেকার ভবঘুরে
বাউন্ডুলে ভিখিরি –
যাদের জমি নেই কিন্তু জমিতে খাটে –
বাড়ি বানায় কিন্তু বাড়ি নেই –
যারা শহরে আলো জ্বালে কিন্তু যাদের কুপিতে তেল নেই –
যারা কারখানা বানায়, কিন্তু কারখানা যাদের
আস্তাকুঁড়ে চালান করে দেয়
যারা কোনোদিন একটা ভালো জামা পরেনি,
সরবত খায় নি,
বেড়াতে গিয়ে পর্বতমালার স্তব্ধ নিরাসক্তি ও মহত্ত্বকে
স্পর্শ করেনি,
যারা জন্মায় আর খাটে, খাটে আর মরে,
যারা পিপড়ের মতো পোকামাকড়ের মতো
শীত-রাত্রির ঝরাপাতার মতো –
সেইসব নিরক্ষর নগণ্য কুঁজো অবজ্ঞাত করুণ
যাদের দেখার জন্য এবং ঠকাবার জন্য আপনারা
বিরাট মঞ্চে উঠে দাঁড়ান –
যারা আগামীদিনের ভারতবর্ষের, গোটা পৃথিবীর এবং
সৌরজগতের মালিক – আমি তাদেরই একজন হয়ে
এই জংশনে স্টেশনে বাদাম বেচে যাচ্ছি।
কশাইয়ের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের মতো জীবন আমাদের –
যে-কোনো মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি – আবার
এই আঙুলের কেন্দ্রীভূত চাপে খোলা ফাটিয়ে বের করে আনা যায়
রাজনৈতিক ক্ষমতার পুষ্টিকর তৈলবীজ, আর সমস্ত শুকনো খোসা
বাতাসে উড়ে যায়, বাতাসের সঙ্গে আকাশ স্পর্শ করে
মানুষের অনন্ত ঘৃণার আগুন –
সেই আগুনের পাশে বসে আছেন আমার মা,
 
আমার দেশজননী।
 
না, ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনলেই আপনাদের মতো
আমার কম্প দিয়ে জ্বর আসে না।