Showing posts with label আহমদ ছফার কবিতা. Show all posts
Showing posts with label আহমদ ছফার কবিতা. Show all posts

রজনীগন্ধার উপমা কবিতা – আহমেদ ছফা


রজনীগন্ধার উপমা
আহমেদ ছফা


ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে, জ্বলে উঠি
ফেটে পড়ি তীব্র বিস্ফোরণে
ভেঙ্গে ফেলি হাটে হাঁড়ি
জানুক নগরবাসী, শুনুক সকলে
তােমার চরিতকথা
মহিলা হে কি রকম তুমি!

রজনীগন্ধাকে আমি বড় বেশি
ভালবাসি, ব্যথা দিতে নিজে ব্যথা পাই
এতদিন বলি বলি করে তাই বলতে পারিনি;
এ আমার দুর্বলতা, কলঙ্কও বলতে পার
তােমাকে পুষ্পের সঙ্গে অভিন্ন দেখেছি।

অবিকল গন্ধবহ ফুল্লমুখি নারী
রজনীগন্ধার মত অভিমানে নিত্য নতমুখি

মুখোমুখি দেখা হলে বাক্য জমে যায়
কি এক বয়েসী বােধে হঠাৎ নিশ্চল হয়ে উঠি
তােমাকে ব্যথা দিলে
রজনীগন্ধার দল ব্যথা পাবে ভেবে।


জল্লাদের সময় কবিতা – আহমদ ছফা


জল্লাদের সময়
আহমদ ছফা


১.
আমাদের এ সময় সুসময় নয়
জোয়ারে হিন্দোল দোলা, ভাটায় মন্থর
চেনাজানা ভদ্র নদী ভেবে
যেজন ভাসাবে ডিঙ্গা পৈতৃক বিশ্বাসে
জেনে রাখ সর্বনাশ সম্মুখে তোমার।

২.
দেশটা যেন বদ্ধজলা
এদিকে মরণ ওদিকেও তেমন

৩.
আমি তো নিশ্চিত জানি
বাস করি ভিন্ন ভূ-মণ্ডলে
বন্দী আমি, মুক্ত আমি আপন সমাজে....
অসীম সাহসী আমি
লোহার লাঙল দিয়ে পাথরে মৃত্তিকা চাষ করি।

৪.
দলে দলে তারা বলে
যুদ্ধ হবে
আরো একবার যুদ্ধহবে
পালঙ্ক শায়িত লাশ এই বাঙলায়।


শুধু একটি শব্দের জন্য কবিতা – আহমদ ছফা


শুধু একটি শব্দের জন্য
আহমদ ছফা


তুমি যখন রজনীগন্ধার ডাঁটার মত নত হয়ে
ঘরের মধ্যে পা রাখলে সারাঘরে খেলে গেল একটা স্পন্দন
হঠাৎ যেন বদ্ধ হওয়া শিউরে উঠল।
তুমি যখন বাঁকাচোরা হাত দুটো আলতোভাবে
কোলের উপর শুইয়ে রাখলে
অপার বাঙময় সে দুটো অপরূপ হাত
বীণার মত বেজে উঠতে চাইল।
তুমি যখন শরীরের বসন টেনে টুনে ঠিক করায়
হঠাৎ খুব মনোযোগী হয়ে উঠলে, মনে হল
শরীর ঢাকতে গিয়ে তুমি শরীর থেকে পালাতে চাইছ।

অমনি তোমার ভেতর থেকে একটা স্নিগ্ধ
বিদ্যুৎপ্রবাহ নির্গত হয়ে আমাকে তড়িতাহত করল।
তুমি যখন কার্পেটে বুড়ো আঙুল খুঁটে খুঁটে মেঝের
পানে তাকিয়ে খুউব নিচুস্বরে কথা বললে
মনে হয় ঘরে দেয়ালগুলো সন্তর্পণে কান পেতে আছে
যাতে তোমার প্রতিটি উচ্চারিত ধ্বনি দেয়ালের মর্মে বিধে থাকে।

যখন আমি তোমার কাছে গেলাম, মনে হল
একটা নির্জন ঝর্ণার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি
জাগতিকতার কোলাহল থেকে অনেক দূরে যার উৎসস্থল।
আর যে ঝর্ণা মৃদুস্বরে কেবল নিজের সঙ্গেই আলাপ করে।
আমি যখন তোমার ঘরের বাইরে পা রাখলাম
আমার রক্তে, আমার অনুভবে ফুটন্ত ঝর্ণার আবেগ;
একটা মৃদু মোহন প্রীতিবদ উত্তাপে আমার
ভেতরের পদার্থ সকল গলানো মোমের মত বেরিয়ে আসতে চাইছে।
যত দূরেই যাচ্ছি পথের পাশের সব কিছুর মধ্যে
যে ঝর্ণার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়নি,
সে অদৃশ্য ঝর্ণার ঝংকার শুনতে পাচ্ছি।

আমি গগনে মেঘ দেখামাত্র মেঘের অংশ
হয়ে গেলাম। বৃক্ষ দেখে বৃক্ষের আকার
ধারণ করলাম। যখন নদীর সান্নিধ্যে এলাম
ছলছল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়ার আবেগ আমার
বুকের ভেতর তরঙ্গ সৃষ্টি করল। তারপরে
যখন আকাশের অভিমুখে দৃকপাত করলাম,
দেখলাম ঘুঙুর পরা নক্ষত্ররা একে একে
আমার প্রাণে এসে প্রাণের চেরাগ জ্বালিয়ে তুলছে।

তুমি আমাকে চরাচরে প্রবাহিত হওয়ার
আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী করেছ।
তুমি আমার হাতে তুলে দিলে বিশ্বলোকে
বিহার করার টাটকা নতুন ছাড়পত্র।
হে নারী তোমাকে কি নামে ডাকব।
কোন নামে ডাকলে তোমার হৃৎকমল সুখসমীরে
আন্দোলিত হয়। কোন নামে ডাকলে আমার
নাভিপদ্মের মূল থেকে শৈলের
সোনালী পোনার মত যে অনুভবরাশি
ওপরে ভেসে উঠেছে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ ঘটাতে পারি!


বেতারে খবর ঝরে কবিতা – আহমদ ছফা


বেতারে খবর ঝরে
আহমদ ছফা


বেতারে খবর ঝরে,
তাজা খুন; কাঁচা প্রাণ ঝরে
ভিয়েৎনামে; পথে পথে
নগরে বন্দরে, বনে বনান্তরে
রক্ত ঝরে, রক্ত ঝরে
তপ্ত রক্ত ঝরে।
জিঘাংসার জটা মুক্ত সাগ্নিক নিঃশ্বাসে মূর্ত
মমচেরা কামনার বেশুমার নিহত মুহূর্ত
অকস্মাৎ আগ্নেয় ঝলকে
দুর্মর চেতনারশ্মি  দুর্জয় প্রত্যয়ে ফুসে
তুলি লক্ষ গোখরার ফণা
দুরন্ত মাভৈঃ সুরে সবল দরাজ কণ্ঠে উদাত্ত ঘোষণা
মার্কিনির বর্বরতা ক্ষমা করিব না।
জন্মে জন্মে যুগে ক্ষমা করিব না
কোটি কণ্ঠে নৃশংস ঘোষণা।
আত্মারে গচ্ছিত রেখে পাপের হারেমে
জোব্বা পরা লম্পটেরা;
নারীর সতীত্ব লুটে বীরত্বের দর্প করে যারা
যারা দুনিয়ার লোভে সত্যসন্ধ মানুষের বেচাকেনা করে,
যাদের পাশব শৈর্যে মানবতা মাথা কুটে মরে,
যাদের নাপাং বোমা ফুলের ফাগুনভরা
সবুজ পোয়াতি ক্ষেতে আগুন লাগায়,
যাদের জীবানু অস্ত্রে শিশুরা মাছের মত ধুকে ধুকে মরে,
যাদের রকেট ঘাটি ঘুমন্ত চোখের কোণে
বিভীষিকা আনে,
যাদের হিংসার শরে নিগারেরা নিত্য বিদ্ধ হয়,
যাদের বেনিয়াবুদ্ধি পৃথিবীর উর্বরতা ক্ষুণ হয়,
যারা রাখে জারজের রক্ত মাংসে
কলুষিত কামনার বীজ;

– সেই ঘৃণ্য দানবের নগ্ন বর্বরতা
ভিয়েতনাম সইবে না, সইবে না দুনিয়ার সংগ্রামী সেনানী।
আফ্রো’শিয়ার গহীন গহনবন, ফেনিল সমুদ্রতীরে।
মরুভর বুক কুঁড়ে অযুত নিযুত কণ্ঠ
বাতাসের হৃদপিণ্ড চিরে চিরে কয়,
– আদিম বর্বর তেজ বলদীপ্ত অহিংস হৃদয়
হিংসায় হিংসায় আজ নব পরিচয়।
তাই ধমনীর শেষে লালে, লিখে যাবো
সংগ্রামের রক্তাক্ত আখর।


লেনিন ঘুমোবে এবার কবিতা – আহমদ ছফা


লেনিন ঘুমোবে এবার
আহমদ ছফা


ভলগা নদী ধীরে বয়
রেড স্কোয়ারে পুরু হয় বরফের স্তর
ধূসর কুয়াশা ঢাকা ক্রেমলিন শিখর।
বছর বছর ধরে একটানা এক ঠায় দাঁড়িয়ে একাকী
লেনিনের বোবা চোখ প্রশ্ন করে আর কত বাকি।
কেটে গেছে বহুকাল, ঘটে গেছে বহু যুদ্ধ-বহু মন্বন্তর
লেনিনের বুকে বিঁধে কালের নখর।
অগাধ প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড় ক্লান্ত
শ্রান্ত জানু ঢলে আসে, আর সাধ্য নেই দাঁড়াবার
লেনিন ঘুমাবে এবার...

লেনিন ঘুমোতে চায়
লেনিন ধূলির শিশু ভূমিশয্যা বড় ভালবাসে
সিমেট্রির গভীর থেকে জননীর ডাক ভেসে আসে
আয় যাদু ফিরে আয়। ডেকে ডেকে ভাইটি অস্থির;
মা ও ভায়ের মাঝে ভাইজান পেতে দাও নশ্বর শরীর।
জেগে জেগে লেনিনের দুচোখে ভ্রূকুটি
রাত নেই দিন নেই একঘেয়ে অক্লান্ত ডিউটি
ফুরোয় না, ফুরোবে না— তাই চায় ছুটি।
লেনিনের ছুটি প্রাপ্য তাই
সময় পাহারা থেকে মুক্ত হওয়া চাই।
কেননা জননী ডেকেছে তাকে, ভাই ডাকে আয়
বড় সাধ ঘুমোবার পৃথিবীর পুণ্য মৃত্তিকায়।
অনেক সময় গেছে— সময় সাগর গেছে
একাকী দাঁড়িয়ে, আর সাধ নেই দাঁড়াবার
লেনিন ঘুমাবে এবার।

ভলগার কনকনে হাওয়া হিংস্র ভালুকের মত রোমশ আঁধারে
ক্রেমলিনে ঝুলে থাকা চাঁদ আর তারার বিলাপ
লেনিন শুনেছে চুপে, সারারাত ঝিঁঝির কীর্তন
শুনে শুনে লেনিনের ক্ষেপে গেছে মন।
প্যাঁচা আর ইঁদুরেরা যেই পথে যাওয়া আসা করে,
লেনিনও পালাতে চায় সেই পথ ধরে।
কঠিন ইস্পাত ভল্ট নড়ে ওঠে,
আকাঙ্ক্ষার তীব্র তাপে ফেটে যেতে চায়
নিস্পন্দ পাষান মমি থরথর কাঁপে।
নিশ্চল শাম্রীর দল আগ্নেয়াস্র হাতে হাঁকে হুশিয়ার
থিরে রহ— খাড়া হয়ে ইস্পাত জঠরে,
লেনিন পালাতে চায় সব বাধা সব ধাঁধা করে একাকার
লেনিন ঘুমাবে এবার।

ভুলভ্রান্তি মেনে নিয়ে লেনিন জানাতে চায় সহজ ভাষায়
বিপ্লবের লাল স্বপ্ন— তার মৃত্যু নাই।
ভালবাসা অন্তঃস্থ স্রোতের বেগে পথ কেটে চলে
ফুটন্ত উত্থানমন্ত্র জেগে রয় মানুষের প্রাণের অতলে।
স্তব্ধ হোক জাগরণ, সাময়িক বিপ্লবের কেটে যাক ধার
তবুও প্রথম চোটে মুমুক্ষু মানুষ উঠে দাঁড়াবে আবার।
দোর্দণ্ড পাশব ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষায় প্রভু হতে চায়
লেনিন বইবে কেন সেই সব ক্রুরকর্মা ঠগীদের দায়
কেন লেনিনকে সাজতে হবে আধুনিক ফারাওর সঙ
বুকে পিটে পাথর ইস্পাত বর্ম এবং এবং।
কোটাল স্রোতের মত পরিনির্বাণের বেগ অন্তরে ঘনায়
লেনিন মানুষের ইতিহাসে মানুষের শিশু হতে চায়
তার আগে শুধু একবার মা ও ভায়ের পাশে
বিছায়ে শরীর— পেতে চায় মানবিক উত্তাপের স্বাদ
লেনিন ঘুমাবে এবার।

লেনিন সঠিক জানে মানবিক সম্ভাবনার
অনন্য সম্ভবা বীজ শক্তির ভাণ্ডার তিনি,
মাটিই গন্তব্য তার। মাটির সে উর্বরতা আছে,
নবজন্মে ঝলসে তোলা শুভ্রবুদ্ধ নবীন মানুষ।
ভল্টের আড়ালে বসে ঠিক পায় টের
মাটি পারে পূর্ব পূর্ব প্রজন্মের কলঙ্ক কলুষ
ধুয়ে মুছে-শুদ্ধতর সৃজনের বেগ
ফুৎকারে প্রমূর্ত করা উদ্ভিন্ন অঙ্কুরে।
সর্বাঙ্গীণ বিপ্লবের বোধিসত্ত্ব হয়ে লেনিন জন্মাতে চায় আরো একবার।
তাই তুষারের ফাঁকে ফাঁকে পথ চিনে চিনে
লেনিন পালাতে চায় মাটির গহীনে।
জননী ডেকেছে তাকে ভাই পাশে চায়
লম্বা ঘুম দিতে হবে পৃথিবীর পুণ্য মৃত্তিকায়
লেনিন ঘুমাবে এবার।