হিরণবালা কবিতা – হেলাল হাফিজ


হিরণবালা
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


হিরণবালা তোমার কাছে দারুন ঋণী সারা জীবন
যেমন ঋণী আব্বা এবং মায়ের কাছে।

ফুলের কাছে মৌমাছিরা
বায়ুর কাছে নদীর বুকে জলের খেলা যেমন ঋণী
খোদার কসম হিরণবালা
তোমার কাছে আমিও ঠিক তেমনি ঋণী।

তোমার বুকে বুক রেখেছি বলেই আমি পবিত্র আজ
তোমার জলে স্নান করেছি বলেই আমি বিশুদ্ধ আজ
যৌবনে এই তৃষ্ণা কাতর লকলকে জিভ
এক নিশীথে কুসুম গরম তোমার মুখে
কিছু সময় ছিলো বলেই সভ্য হলো
মোহান্ধ মন এবং জীবন মুক্তি পেলো।

আঙুল দিয়ে তোমার আঙুল ছুঁয়েছিলাম বলেই আমার
আঙুলে আজ সুর এসেছে,
নারী-খেলার অভিজ্ঞতার প্রথম এবং পবিত্র ঋণ
তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখে সত্যি কি আর শোধ হয়েছে?


হিজলতলীর সুখ কবিতা – হেলাল হাফিজ


হিজলতলীর সুখ
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


বলাই বাহুল্য আমি রাজনীতিবিদ নই, সুবক্তাও নই
তবু আজ এই সমাবেশে বলবো কয়েক কথা
সকলের অনুমতি পেলে।
–’বলুন, বলুন’।
রঙিন বেলুন দিয়ে মন ভোলানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই,
উপস্থিত সুধী, কেউ ভুলে মনেও করবেন না আমি
পারমিট, পেঁয়াজ আর পারফিউম ন্যায্যমূল্যে দেবো।
–’পেঁয়াজটা পেলে ভালো হত’।
আর কতো? যারা দিতো তারা আর দেবে না বলেছে।
–’কী হবে? কী হবে এখন উপায়’?
হেলায় খেলায় হয়েছে অনেক বেলা ফুরিয়েছে দিন
অবহেলা প্রপীড়িত মানুষেরা শোধ চায় ঋণ,
তবু দেবে, ভাত দেবে–ভোট দেবে, তবে
সামান্য তক্‌লিফ করে মাঝে মধ্যে গ্রামে যেতে হবে।
–’তবে কি সত্যি সব যা কিছু রটেছে’?
ঘটনা ঘটেছে এক মারাত্মক স্বাধীনতা-উত্তর এদেশে
প্রাপক দিয়েছে জেনে কারা ভদ্রবেশে
হিজলতলীর সুখ জবর-দখল করে রেখেছে এদ্দিন,
একটা কিছু তো আজ যথার্থই খুব সমীচীন।


সম্প্রদান কবিতা – হেলাল হাফিজ


সম্প্রদান
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


ভাদ্রের বর্ধিত আষাঢ়ে সখ্য হয়েছিলো।
সে প্রথম, সে আমার শেষ।

পথে ও প্রান্তরে, ঘরে,
দিতে রাতে, মাসে ও বছরে
সমস্ত সাম্রাজ্য জুড়ে
সে আষাঢ় অতোটা ভেজাবে আমি ভাবিনি কসম।

আমার সকল শ্রমে, মেধা ও মননে
নিদারুণ নম্র খননে
কী নিপুণ ক্ষত দেখো বানিয়েছে চতুর আষাঢ়।

একদিন
সব কিছু
ছিলো তোর
ডাক নামে,
পোড়ামুখী
তবু তোর
ভরলো না মন,—
এই নে হারামজাদী একটা জীবন।


শামুক কবিতা – হেলাল হাফিজ


শামুক
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


‘অদ্ভুত, অদ্ভুত’ বলে
সমস্বরে চিৎকার করে উঠলেন কিছু লোক।
আমি নগরের জ্যেষ্ঠ শামুক
একবার একটু নড়েই নতুন ভঙ্গিতে ঠিক গুটিয়ে গেলাম,
জলে দ্রাঘিমা জুড়ে
যে রকম গুটানো ছিলাম,
ছিমছাম একা একা ভেতরে ছিলাম,
মানুষের কাছে এসে
নতুন মুদ্রায় আমি নির্জন হলাম,
একাই ছিলাম আমি পুনরায় একলা হলাম।


লাবণ্যের লতা কবিতা – হেলাল হাফিজ


লাবণ্যের লতা
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


দুরভিসন্ধির খেলা শেষ হয়ে কোনোদিন
দিন যদি আসে,
এই দেশে ভালোবেসে বলবে মানুষ,
অনন্বিত অসন্তোষ অজারকতার কালে এসে
লাবন্যের লকলকে লতা এক খুব কায়ক্লেশে
একদিন তুলেছিলো বিনয়াবনত মাথা
এতোটুকু ছিলো না দীনতা।

অকুলীন এই দিন শেষ হয়ে কোনোদিন
দিন যদি আসে,
শুভ্রতায় স্নিগ্ধতায় সমুজ্জল মানুষ এদেশে
বলবে সূর্যের দিকে ছিলো সেই লতাটির মুখ
বলবে মাটির সাথে ছিলো তার গাঢ় যোগাযোগ,
কিছু অক্সিজেন সেও দিয়েছিলো
নিয়েছিলো বিষ
বলবে পুষ্পিত কিছু করেছিলো ধূসর কার্নিশ।

ভালোবাসাবাসিহীন এই দিন সব নয়– শেষ নয়
আরো দিন আছে,
ততো বেশি দূরে নয়
বারান্দার মতো ঠিক দরোজার কাছে।


রাডার কবিতা – হেলাল হাফিজ


রাডার
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


একটা কিছু করুন।
এভাবে আর কদিন চলে দিন ফুরালে হাসবে লোকে
দুঃসময়ে আপনি কিছু বলুন
একটা কিছু করুন।

চতুর্দিকে ভালোবাসার দারুণ আকাল
খেলছে সবাই বেসুর-বেতাল
কালো-কঠিন-মর্মান্তিক নষ্ট খেলা,
আত্মঘাতী অবহেলো নগর ও গ্রাম গেরস্থালি
বনভূমি পাখপাখালি সব পোড়াবে,
সময় বড়ো দ্রুত যাচ্ছে
ভাল্লাগে না ভাবটা ছেড়ে সত্যি এবার উঠুন
একটা কিছু করুন।

দিন থাকে না দিন তো যাবেই
প্রেমিক যারা পথ তো পাবেই
একটা কিছু সন্নিকটে, আত বাড়িয়ে ধরুন
দোহাই লাগে একটা কিছু করুন।


রাখাল কবিতা – হেলাল হাফিজ


রাখাল
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


আমি কোনো পোষা পাখি নাকি?
যেমন শেখাবে বুলি
সেভাবেই ঠোঁট নেড়ে যাবো, অথবা প্রত্যহ
মনোরঞ্জনের গান ব্যাকুল আগ্রহে গেয়ে
অনুগত ভঙ্গিমায় অনুকূলে খেলাবো আকাশ,
আমি কোনো সে রকম পোষা পাখি নাকি?

আমার তেমন কিছু বাণিজ্যিক ঋণ নেই,
কিংবা সজ্ঞানে এ বাগানে নির্মোহ ভ্রমণে
কোনোদিন ভণিতা করিনি। নির্লোভ প্রার্থনা
শর্ত সাপেক্ষে কারো পক্ষপাত কখনো চাবো না।

তিনি, শুধু তিনি
নাড়ীর আত্মীয় এক সংগঠিত আর অসহায় কৃষক আছেন
ভেতরে থাকেন, যখন যেভাবে তিনি আমাকে বলেন
হয়ে যাই শর্তাহীন তেমন রাখাল বিনা বাক্য ব্যয়ে।

কাঙাল কৃষক তিনি, জীবনে প্রথম তাকে যখন বুঝেছি
স্বেচ্ছায় বিবেক আমি তার কাছে শর্তাহীন বন্ধক রেখেছি।


যেভাবে সে এলো কবিতা – হেলাল হাফিজ


যেভাবে সে এলো
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


অসম্ভব ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছিলো,
সামনে যা পেলো খেলো,
যেন মন্বন্তরে কেটে যাওয়া রজতজয়ন্তী শেষে
এসেছে সে, সবকিছু উপাদেয় মুখে।

গাভিন ক্ষেতের সব ঘ্রাণ টেনে নিলো,
করুণ কার্নিশ ঘেঁষে বেড়ে ওঠা লকলকে লতাটিও খেলো,
দুধাল গাভীটি খেলো
খেলো সব জলের কলস।

শানে বাধা ঘাট খেলো
সবুজের বনভূমি খেলো
উদাস আকাশ খেলো
কবিতার পান্ডুলিপি খেলো।

দু’পায়া পথের বুক, বিদ্যালয়
উপাসনালয় আর কারখানার চিমনি খেলো
মতিঝিলে স্টেটব্যাংক খেলো।

রাখালের অনুপম বাঁশিটিকে খেলো,
মগড়ার তীরে বসে চাল ধোয়া হাতটিকে খেলো

স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না।


যুগল জীবনী কবিতা – হেলাল হাফিজ


যুগল জীবনী
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
বলে,–’কি নাগর
এতো সহজেই যদি চলে যাবে
তবে কেন ঘর বেঁধেছিলে উদ্ধাস্তু ঘর,
কেন করেছিলে চারু বেদনার এতো আয়োজন।
শৈশব কৈশোর থেকে যৌবনের কতো প্রয়োজন
উপেক্ষার ‘ডাস্টবিনে’ ফেলে
মনে আছে সে-ই কবে
চাদরের মতো করে নির্দ্বিধায় আমাকে জড়ালে,
আমি বাল্য-বিবাহিতা বালিকার মতো
অস্পষ্ট দু’চোখ তুলে নির্নিমেষে তাকিয়েছিলাম
অপরিপক্ক তবু সন্মতি সূচক মাথা নাড়িয়েছিলাম
অতোশতো না বুঝেই বিশ্বাসের দুই হাত বাড়িয়েছিলাম,
ছেলেখেলাচ্ছলে
সেই থেকে অনাদরে, এলোমেলো
তোমার কষ্টের সাথে শর্তহীন সখ্য হয়েছিলো,
তোমার হয়েছে কাজ, আজ প্রয়োজন আমার ফুরালো’?

আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো
কবিতা আমার কোষে নিরাপদ আশ্রম গড়েছে
সংগোপনে বলেছে,–’হে কবি
দেখো চারদিকে মানুষের মারাত্মক দুঃসময়
এমন দুর্দিনে আমি পরিপুষ্ট প্রেমিক আর প্রতিবাদী তোমাকেই চাই’।

কষ্টে-সৃষ্টে আছি
কবিতা সুখেই আছে,–থাক,
এতো দিন-রাত যদি গিয়ে থাকে
যাক তবে জীবনের আরো কিছু যাক।


যার যেখানে জায়গা কবিতা – হেলাল হাফিজ


যার যেখানে জায়গা
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


ভোলায়া ভালায়া আর কথা দিয়া কতোদিন ঠাগাইবেন মানুষ
ভাবছেন অহনো তাদের অয় নাই হুঁশ।
গোছায়া গাছায়া লন বেশি দিন পাইবেন না সময়
আলামত দেখতাছি মানুষের অইবোই জয়।

কলিমুদ্দিনের পোলা চিডি দিয়া জানাইছে,–’ভাই
আইতাছি টাউন দেখতে একসাথে আমরা সবাই,
নগরের ধাপ্‌পাবাজ মানুষেরে কইও রেডি অইতে
বেদম মাইরের মুখে কতোক্ষণ পারবো দাঁড়াইতে।’

টিকেট ঘরের ছাদে বিকালে দাঁড়ায়ে যখন যা খুশি যারা কন
কোনো দিন খোঁজ লইছেন গ্রামের লোকের সোজা মন
কী কী চায়, কতোখানি চায়
কয়দিন খায় আর কয়বেলা না খায়া কাটায়।

রাইত অইলে অমুক ভবনে বেশ আনাগোনা, খুব কানাকানি,
আমিও গ্রামের পোলা চুত্‌মারানি গাইল দিতে জানি।


হৃদয়ের ঋণ কবিতা – হেলাল হাফিজ


হৃদয়ের ঋণ
হেলাল হাফিজ.....যে জলে আগুন জ্বলে


আমার জীবন ভালোবাসাহীন গেলে
কলঙ্ক হবে কলঙ্ক হবে তোর,
খুব সামান্য হৃদয়ের ঋণ পেলে
বেদনাকে নিয়ে সচ্ছলতার ঘর

বাঁধবো নিমেষে। শর্তবিহীন হাত
গচ্ছিত রেখে লাজুক দু’হাতে আমি
কাটাবো উজাড় যুগলবন্দী হাত
অযুত স্বপ্নে। শুনেছি জীবন দামী,

একবার আসে, তাকে ভালোবেসে যদি
অমার্জনীয় অপরাধ হয় হোক,
ইতিহাস দেবে অমরতা নিরবধি
আয় মেয়ে গড়ি চারু আনন্দলোক।

দেখবো দেখাবো পরস্পরকে খুলে
যতো সুখ আর দুঃখের সব দাগ,
আয় না পাষাণী একবার পথ ভুলে
পরীক্ষা হোক কার কতো অনুরাগ।


সুন্দরের গান – হেলাল হাফিজ


সুন্দরের গান
হেলাল হাফিজ.....কবিতা একাত্তর

হলো না, হলো না।
শৈশব হলো না, কৈশোর হলো না
না দিয়ে যৌবন শুরু, কার যেন
বিনা দোষে শুরুটা হলো না।
হলো না, হলো না।
দিবস হলো না, রজনীও না
সংসার হলো না, সন্ন্যাস হলো না, কার যেন
এসব হলো না, ওসব আরও না।
হলো না, হলো না।
সন্দুর হলো না, অসুন্দরও না
জীবন হলো না, জীবনেরও না, কার যেন
কিছুই হলো না, কিচ্ছু হলো না।
হলো না। না হোক,
আমি কী এমন লোক!
আমার হলো না তাতে কি হয়েছে?
তোমাদের হোক।

দৈনিক যুগান্তর, ঈদ সংখ্যা ২০০৮


রাখালের বাঁশি কবিতা – হেলাল হাফিজ


রাখালের বাঁশি
হেলাল হাফিজ.....কবিতা একাত্তর


কে আছেন ?
দয়া করে আকাশকে একটু বলেন -
সে সামান্য উপরে উঠুক,
আমি দাঁড়াতে পারছি না ।

ময়মনসিংহ, ১৯৯০


দ্বার খুলে আর রাখবো না নজরুলগীতি – কাজী নজরুল ইসলাম


দ্বার খুলে আর রাখবো না
কাজী নজরুল ইসলাম


আমি দ্বার খুলে আর রাখবো না, পালিয়ে যাবে গো
জানবে সবে গো, নাম ধরে আর ডাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

এবার পূজার প্রদীপ হয়ে, জ্বলবে আমার দেবালয়ে
জ্বালিয়ে যাবে গো, আর আঁচল দিয়ে ঢাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।

হার মেনেছি গো, হার দিয়ে আর বাঁধবো না
দান এনেছি গো, প্রান চেয়ে আর কাঁদবো না
হার মেনেছি গো।
পাষাণ তোমায় বন্দী করে, রাখবো আমার ঠাকুরঘরে
রইবো কাছে গো, আর অন্তরালে থাকবো না
পালিয়ে যাবে গো।।


এ শহরে আমার কোনো বন্ধু নেই কবিতা – জান্নাতুন নুর দিশা


এ শহরে আমার কোনো বন্ধু নেই
জান্নাতুন নুর দিশা


এ শহরে আমার কোনো বন্ধু নেই!
অবশ্য এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ, অনুযোগ, উৎকণ্ঠা নেই।
বন্ধুহীন শহরের রাস্তায় আমি যে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হাঁটি,
তা বন্ধুহীনতার নয়, নয় একাকীত্বের।
কেবল একরাশ ক্লান্তির!
এ শহরে ক্লান্তি মুছবার মত আমার কোনো গামছা নেই।
আমি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নতুন গামছা দেখি।
এ শহরে আমরা প্রত্যেকেই তো একেকটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়াই।
এ শহরে প্রত্যেকের মন একেকটা সাদা থান পরে আছে।
বিধবা মন নিয়ে সাংসারিক দম্পতি যাপন করছে দিনরাত।
এর চেয়ে নৃশংস নয় আমার বন্ধুহীনতা।
আমি আমার অবসাদ ফেরি করি না কারো দুয়ারে।
যে শহরে সকালের রোদেরা অভিশপ্ত,
হাড়ের সন্ধিতে জমাট ব্যথার মত অসহ্য জীপন যাপন,
সেখানে আমার দুঃখের কথা বলে আমি কার বুক ভারী করব?
শীঘ্রই ছেড়ে যাব এ শহর।
দূরে, অন্য কোনো শহরে গড়ব বসতি,
তবে অত তাড়া নেই।
ঠিক ট্রেনের অপেক্ষায় যদি কেটে যায় একটা জন্ম,
তবু ভুল ট্রেনে চড়ব না।

তোমার শঙ্খ ধুলায় প’ড়ে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


তোমার শঙ্খ ধুলায় প’ড়ে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.....বলাকা


তোমার শঙ্খ ধুলায় প’ড়ে,
     কেমন করে সইব।
বাতাস আলো গেল মরে
     এ কী রে দুর্দৈব।
লড়বি কে আয় ধ্বজা বেয়ে,
গান আছে যার ওঠ-না গেয়ে,
চলবি যারা চল্‌ রে ধেয়ে,
     আয় না রে নিঃশঙ্ক।
ধুলয় পড়ে রইল চেয়ে
     ওই যে অভয় শঙ্খ।

চলেছিলাম পূজার ঘরে
     সাজিয়ে ফুলের অর্ঘ্য।
খুঁজি সারাদিনের পরে
     কোথায় শান্তি-শর্গ।
এবার আমার হৃদয়-ক্ষত
ভেবেছিলাম হবে গত,
ধুয়ে মলিন চিহ্ন যত
     হব নিষ্কলঙ্ক।
পথে দেখি ধুলায় নত
     তোমার মহাশঙ্খ।

আরতি-দীপ এই কি জ্বালা।
     এই কি আমার সন্ধ্যা।
গাঁথার রক্তজবার মালা?
     হায় রজনীগন্ধা।
ভেবেছিলাম যোঝাযুঝি
মিটিয়ে পাব বিরাম খুঁজি,
চুকিয়ে দিয়ে ঋণের পুঁজি,
     লব তোমার অঙ্ক।
হেনকালে ডাকল বুঝি
     নীরব তব শঙ্খ।

যৌবনেরি পরশমণি
     করাও তবে স্পর্শ।
দীপক-তানে উঠুক ধ্বনি
     দীপ্ত প্রাণের হর্ষ।
নিশার বক্ষ বিদায় করে
উদ্‌বোধনে গগন ভরে
অন্ধ দিকে দিগন্তরে
     জাগাও-না আতঙ্ক।
দুই হাতে আজ তুলব ধরে
     তোমার জয়শঙ্খ।

জানি জানি তন্দ্রা মম
     রইবে না আর চক্ষে।
জানি শ্রাবণধারা-সম
     বাণ বাজিয়ে বক্ষে।
কেউ বা ছুটে আসবে পাশে,
কাঁদবে বা কেউ দীর্ঘশ্বাসে,
দুঃস্বপনে কাঁপবে ত্রাসে
     সুপ্তির পর্যঙ্ক।
বাজবে যে আজ মহোল্লাসে
     তোমার মহাশঙ্খ।

তোমার কাছে আরাম চেয়ে
     পেলাম শুধু লজ্জা।
এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে
     পরাও রণসজ্জা।
ব্যাঘাত আসুক নব নব,
আঘাত খেয়ে অটল রব,
বক্ষে আমার দুঃখে তব
     বাজবে জয়ডঙ্ক।
দেব সকল শক্তি, লব
     অভয় তব শঙ্খ।

                                                                          রামগড়, ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৩২১


উৎসর্গ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


উৎসর্গ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.....বলাকা


উইলি পিয়র্‌সন্‌ বন্ধুবরেষু
আপনারে তুমি সহজে ভুলিয়া থাক,
আমরা তোমারে ভুলিতে পারি না তাই।
সবার পিছনে নিজের গোপনে রাখ,
আমরা তোমারে প্রকাশ করিতে চাই।
ছোটোরে কখনো ছোট নাহি কর মনে,
আদর করিতে জান অনাদৃত জনে,
প্রীতি তব কিছু না চাহে নিজের জন্য,
তোমারে আদরি আপনারে করি ধন্য।


                                                                                            স্নেহাসক্ত
                                                                               শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

                                            ৭ মে ১৯১৬, তোসা-মারু জাহাজ, বঙ্গসাগর।


হে বিরাট নদী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


হে বিরাট নদী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.....বলাকা


হে বিরাট নদী,
অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল
অবিচ্ছিন্ন অবিরল
চলে নিরবধি।
স্পন্দনে শিহরে শূন্য তব রুদ্র কায়াহীন বেগে;
বস্তুহীন প্রবাহের প্রচণ্ড আঘাত লেগে
পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুফেনা উঠে জেগে;
ক্রন্দসী কাঁদিয়া ওঠে বহ্নিভরা মেঘে।
আলোকের তীব্রচ্ছটা বিচ্ছুরিয়া উঠে বর্ণস্রোতে
ধাবমান অন্ধকার হতে;
ঘুর্ণাচক্রে ঘুরে ঘুরে মরে
                  স্তরে স্তরে
          সুর্যচন্দ্রতারা যত
          বুদ্‌বুদের মতো।
 
হে ভৈরবী, ওগো বৈরাগিণী,
চলেছ যে নিরুদ্দেশ সেই চলা তোমার রাগিণী,
          শব্দহীন সুর।
          অন্তহীন দূর
তোমারে কি নিরন্তর দেয় সাড়া।
সর্বনাশা প্রেমে তার নিত্য তাই তুমি ঘরছাড়া।
          উন্মত্ত সে-অভিসারে
          তব বক্ষোহারে
ঘন ঘন লাগে দোলা–ছড়ায় অমনি
          নক্ষত্রের  মণি;
আঁধারিয়া ওড়ে শূন্যে ঝোড়ো এলোচুল;
দুলে উঠে বিদ্যুতের দুল;
          অঞ্চল আকুল
          গড়ায় কম্পিত তৃণে,
চঞ্চল পল্লবপুঞ্জে বিপিনে বিপিনে;
বারম্বার ঝরে ঝরে পড়ে ফুল
জুঁই চাঁপা বকুল পারুল
          পথে পথে
তোমার ঋতুর থালি হতে।
শুধু ধাও, শুধু ধাও, শুধু বেগে ধাও
          উদ্দাম উধাও;
          ফিরে নাহি চাও,
যা কিছু তোমার সব দুই হাতে ফেলে ফেলে যাও।
কুড়ায়ে লও না কিছু, কর না সঞ্চয়;
নাই শোক, নাই ভয়,
পথের আনন্দবেগে অবাধে পাথেয় করো ক্ষয়।
 
যে মুহূর্তে পূর্ণ তুমি সে মুহূর্তে কিছু তব নাই,
          তুমি তাই
          পবিত্র সদাই।
তোমার চরণস্পর্শে বিশ্বধূলি
মলিনতা যায় ভুলি
          পলকে পলকে–
মৃত্যু ওঠে প্রাণ হয়ে ঝলকে ঝলকে।
যদি তুমি মুহূর্তের তরে
          ক্লান্তিভরে
          দাঁড়াও থমকি,
          তখনি চমকি
উচ্ছ্রিয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে;
পঙ্গু মুক কবন্ধ বধির আঁধা
স্থুলতনু ভয়ংকরী বাধা
সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে;
অণুতম পরমাণু আপনার ভারে
সঞ্চয়ের অচল বিকারে
বিদ্ধ হবে আকাশের মর্মমূলে
কলুষের বেদনার শূলে।
ওগো নটী, চঞ্চল অপ্সরী,
          অলক্ষ্য সুন্দরী
তব নৃত্যমন্দাকিনী নিত্য ঝরি ঝরি
          তুলিতেছে শুচি করি
          মৃত্যস্নানে বিশ্বের জীবন।
নিঃশেষে নির্মল নীলে বিকাশিছে নিখিল গগন।
 
ওরে কবি, তোরে আজ করেছে উতলা
ঝংকারমুখরা এই ভুবনমেখলা,
অলক্ষিত চরণের অকারণ অবারণ চলা।
নাড়ীতে নাড়ীতে তোর চঞ্চলের শুনি পদধ্বনি,
          বক্ষ তোর উঠে রনরনি।
নাহি জানে কেউ
রক্তে তোর নাচে আজি সমুদ্রের ঢেউ,
কাঁপে আজি অরণ্যের ব্যাকুলতা;
মনে আজি পড়ে সেই কথা–
যুগে যুগে এসেছি চলিয়া,
          স্খলিয়া স্খলিয়া
          চুপে চুপে
রূপ হতে রূপে
প্রাণ হতে প্রাণে।
নিশীথে প্রভাতে
যা কিছু পেয়েছি হাতে
এসেছি করিয়া ক্ষয় দান হতে দানে,
          গান হতে গানে।
 
ওরে দেখ্‌ সেই স্রোত হয়েছে মুখর,
তরণী কাঁপিছে থরথর।
তীরের সঞ্চয় তোর পড়ে থাক্‌ তীরে,
          তাকাস নে ফিরে।
সম্মুখের বাণী
          নিক তোরে টানি
          মহাস্রোতে
পশ্চাতের কোলাহল হতে
অতল আঁধারে — অকূল আলোতে।

                                                                                   এলাহাবাদ, ৩ পৌষ, ১৩২১

কাউকে ভালোবেসেছিলাম কবিতা – জীবনানন্দ দাশ


কাউকে ভালোবেসেছিলাম
জীবনানন্দ দাশ


কাউকে ভালোবেসেছিলাম জানি
তবুও ভালোবাসা,
দুপুরবেলার সূর্যে ভোরের শিশির
নেমে আসা,
ভোরের দিকে হৃদয় ফেরাই
যাই চলে যাই-
নীল সকালে যাই চলে যাই-
একটি নদী একটি অরূণ
শিউলি শিশির পাখি-
‘আমরা মায়ার মনের জিনিস
মায়াবিনীর বেলায় শুধু জাগি’
বলছে সে কোন্‌ ত্রিকোণ থেকে
ছায়ার পরিভাষা।
কাউকে ভালোবেসেছিলাম, জানি,
তবুও ভালোবাসা।
সে কোন্‌ সুদূর মরুর মনে চলে গেছ
হায়, যাযাবর তুমি,
সেইখানে কি মিলবে বনহংসী বাঁধা বাসা!

হায় বলিভূক, কখন ভেবেছিলে
মাটি ছেড়ে দূর আকাশের নীলে
ধূসর ডানার অগ্নি ছেড়ে দিলে
মিটে যাবে মায়াময়ী মাটির পিপাসা।


মৃত্যুর আগে কবিতা – জীবনানন্দ দাশ


মৃত্যুর আগে
জীবনানন্দ দাশ.....ধূসর পাণ্ডুলিপি


আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়,
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশার; কবেকার পাড়াগাঁর মেয়েদের মতো যেন হায়
তারা সব; আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল
জোনাকিতে ভ’রে গেছে; যে-মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ–কোনো সাধ নাই তার ফসলের তরে;

আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,
খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:
পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!
বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে-মাঠে ডানা ভাসাবার
গভীর আহ্লাদে ভরা; অশথের ডালে-ডালে ডাকিয়াছে বক;
আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এই সব নিভৃত কুহক;

আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত
এড়ায়ে উড়িয়া যায় দিগন্তের নম্র নীল জ্যোৎস্নার ভিতরে,
আমরা রেখেছি যারা ভালোবেসে ধানের গুচ্ছের ’পরে হাত,
সন্ধ্যার কাকের মতো আকাঙ্ক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে;
শিশুর মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ
আমরা পেযেছি যারা ঘুরে ফিরে ইহাদের চিহ্ন বারোমাস;

দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রাণের অন্ধকারে হয়েছে হলুদ,
হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা,
ইঁদুর শীতের রাতে রেশমের মতো রোমে মাখিয়াছে খুদ,
চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হ’য়ে ঝরেছে দু-বেলা
নির্জন মাছের চোখে; পুকুরের পারে হাঁস সন্ধ্যার আঁধারে
পেয়েছে ঘুমের ঘ্রাণ–মেয়েলি হাতের স্পর্শ ল’যে গেছে তারে;
মিনারের মতো মেঘ সোনালি চিলেরে তার জানালায় ডাকে,
বেতের লতার নিচে চড়ুয়ের ডিম যেন নীল হ‘য়ে আছে,
নরম জলের গন্ধ দিয়ে নদী বার বার তীরটিরে মাখে,
খড়ের চালের ছায়া গাঢ় রাতে জ্যোৎস্নার উঠানে পড়িয়াছে;
বাতাসে ঝিঁঝির গন্ধ—বৈশাখের প্রান্তরের সবুজ বাতাসে;
নীলাভ নোনার বুকে ঘন রস গাঢ় আকাঙ্ক্ষায় নেমে আসে;

আমরা দেখেছি যারা নিবিড় বটের নিচে লাল-লাল ফল
পড়ে আছে; নির্জন মাঠের ভিড় মুখ দেখে নদীর ভিতরে;
যত নীল আকাশেরা র’য়ে গেছে খুঁজে ফেরে আরো নীল আকাশের তল;
পথে-পথে দেখিয়াছি মৃদু চোখ ছায়া ফেলে পৃথিবীর ’পরে;
আমরা দেখেছি যারা শুপুরীর সারি বেয়ে সন্ধ্যা আসে রোজ,
প্রতিদিন ভোর আসে ধানের গুচ্ছের মতে সবুজ সহজ;

আমরা বুঝেছি যারা বহুদিন মাস ঋতু শেষ হ’লে পর
পৃথিবীর সেই কন্যা কাছে এসে অন্ধকারে নদীদের কথা
ক’য়ে গেছে; আমরা বুঝেছি যারা পথ ঘাট মাঠের ভিতর
আরো-এক আলো আছে: দেহে তার বিকালবেলার ধূসরতা;
চোখের-দেখার হাত ছেড়ে দিয়ে সেই আলো হ’য়ে আছে স্থির:
পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর;

আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর? জানি না কি আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ; একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিলো—সোনা ছিলো যাহা
নিরুত্তর শান্তি পায়; যেন কোন্ মায়াবীর প্রয়োজনে লাগে।
কি বুঝিতে চাই আর? . . . রৌদ্র নিভে গেলে পাখি পাখালির ডাক
শুনিনি কি? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক!